উপন্যাস

মহাঘোরা ।। পর্ব—১২

আনিফ রুবেদ
১১ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৮:২৮আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৮:২৮

[মন ও মান হেরে যায়। হাততালি বাজিয়ে দেয় দেহ।]

আরতি উঠে দাঁড়াল। কিছুটা হাঁটতেই একটা দোকান থেকে জিলাপি ভাজার গন্ধ এসে ঢুকল নাকে। যে-ই জিলাপির গন্ধ পেল সে-ই তার জিহ্বা নড়ে চড়ে উঠল কিলবিল করে, জিহ্বা নড়েচড়ে উঠতেই পেটের ভেতরের ঘুমন্ত ক্ষুধাও আবার নড়েচড়ে উঠল। পেটের ভেতর দপদপ করে আগুন লেগে গেলো। পেটের আগুনের দপদপানি আর থামে না। বাড়ি ঘরে আগুন লাগলে লোকেরা এসে আগুন নিভায় দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি করে কিন্তু পেটের ভেতর আগুন লাগলে, মনের ভেতর আগুন লাগলে, প্রাণের ভেতর আগুন লাগলে কারো দেখা পাওয়া যায় না।

সে জিলাপির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। যে কারিগরটা ফুটন্ত তেলের ওপর জিলাপির প্যাঁচ তুলছিল সে হাতা বাগিয়ে মারার ভঙ্গিমা করে। জগতে সবাই সবাইকে মারতে চায় শুধু। আরতির চোখ ফেটে জল আসে। আরতি ভীষণ অপমানিত বোধ করে। সে চলে যেতে চায় জিলাপির জায়গা থেকে। কিন্তু তার পেটের ক্ষুধা একেবারে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে ধরে থাকল তাকে। সে নড়তেও পারল না তার দুর্বল হয়ে যাওয়া দেহের কারণে, সে মুখ ফুটে চাইতেও পারল না তার মান-অপমান বোধ করা মনের জন্য। মন আর দেহের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। মন আর শরীরের দ্বন্দ্ব। মন আর শরীরের ভেতর পক্ষে বিপক্ষে কত আপত্তি-অনাপত্তির উৎপত্তি হচ্ছে। বিপন্ন হওয়ার বিষয় উৎপন্ন হচ্ছে। মন আর শরীরের শেষহীন কুস্তি চলছে; কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাচ্ছে না। সে কি করবে বুঝতে পারে না, মন ও শরীরের এ দ্বান্দ্বনিকতার ভেতর পড়ে জেরবার হয়ে ওঠে ভেতর ভেতর। নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করে। পারে না বেশিক্ষণ। সে একসময় হাত বাড়িয়ে দেয় জিলাপি দোকানের মালিকের দিকে। তার দেহ হাততালি বাজিয়ে দেয় মনের এমন পরাজয় দেখে। চাইতেই হবে মানুষকে। চাইতেই হয়। চাইতে সে বাধ্য। আর, চেয়েছে আর চায় বলেই দুঃখগঙ্গা, রক্তগঙ্গা, আঘাতগঙ্গ, ব্যথাগঙ্গা। রমজান ডাক্তারের কাছে চেয়ে তাইতো হয়েছে তার।

তার হাত বাড়ানো দেখে মালিকের একটু মায়া বা অন্যকিছু একটা হয়। সে দুটা জিলিপি কাগজে পুরে ছুড়ে দেয় আরতির দিকে। আঁচলে ধরে নিতে চায় সে। পারে না। মাটিতে পড়ে যায়। এভাবে সে নিজেও কতবার কুকুরের দিকে খাবার ছুঁড়ে দিয়েছে। তার মন আবার তার মান বাঁচাতে সচেষ্ট হয়।

মন বলে— ‘এভাবে ছোড়া খাবার তুলো না হাতে।’

তার পেট বলে— ‘তুলে নাও এসব মান-অপমান ভাবনা কোনো কাজের নয়।’

সে কাগজে মোড়ানো জিলাপি মাটি থেকে তুলে নিল। তার দেহ আবার তালি বাজিয়ে দিল। ক্ষুধা মানুষকে যেদিকে ঘুরায় সেদিকে ঘুরে। ক্ষুধার ঘানিতে মানুষ একটা গোরু। ক্ষুধার কাছে কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। ক্ষুধার খাবার সবাই; সকল জীবন। জিলাপি দুটো খেয়ে সে বাজারের কলের দিকে হাঁটতে লাগল; সেখান থেকে পানি খেয়ে নেবে।

পানি খেয়ে সে বসে আছে আবার নদীর কোলে। বীর্যবন্ত সূর্য নেতিয়ে গেছে অনেকটা। হিঁদুর বউয়েরা সিঁদুর মাথায় জল নিয়ে যাচ্ছে; কপালের সিঁদুরে সূর্যের সিঁদুরে আলো পড়ে আরো ঝিকিয়ে উঠছে। আরতি তার সিঁথিতে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

আরতি বসেই থাকে। বসে বসে কত কী ভাবে সে।


[মানুষ যৌগিক জীব।]

সূর্যবন্ত দিন শেষ হয়ে গেল। দিনটা পার হয়ে চলে গেল নদীর ওপারে। ডুবন্ত সূর্যের সামনে দিয়ে অজস্র পাখি উড়ে চলে গেল।

সন্ধ্যাও পার হয়ে গেছে। জিলাপি বেশিক্ষণ তার শক্তি দিয়ে পেটের ক্ষুধাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সারাদিনে খাওয়া বলতে সেই জিলাপি দুটো। ক্ষুধা আবার তার পুরো শক্তি নিয়ে নতুন সূর্যের মতো তার পেটে উদয় হয়েছে। সূর্য উদয় হওয়ার পর নিদয় হতে সময় লাগে; সূর্যের দুপুর লাগতে দুপুর পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু ক্ষুধা-সূর্য উদয় হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিদয় হয়ে যায়; প্রচণ্ড দুপুর লেগে যায়। সূর্যের দুপুর বিকেল হয় তারপর সন্ধ্যা হয় কিন্তু ক্ষুধার সূর্যে দুপুর হওয়ার পর আর বেলা গড়াই না। বিকেল হওয়ার, সন্ধ্যা হওয়ার আর নাম কথা নেই। ক্ষুধা খাবার ছাড়া বা মরণ ছাড়া শান্ত হয় না।

ক্ষুধা পেটে ধরেই সে শুয়ে পড়েছে। তার পেটে বেড়ে উঠছে ক্ষুধা, যেভাবে পেটের ভেতর সন্তান বেড়ে ওঠে। মেয়েমানুষ দুদিক দিয়ে খায়। মুখ দিয়ে খায়— পেট ফুলে ওঠে; যোনি দিয়ে খায়— তাও পেট ফুলে ওঠে। পুরুষদের সুবিধা যে তারা একদিক দিয়েই শুধু খায়— মুখ দিয়ে। রমণ করে, বীর্য বমন করেই সে মুক্ত। নারীর জরায়ুতে বায়ুহীন আলোহীন অন্ধকারে আয়ুমাখা একটা সন্তান বেড়ে ওঠে। পুরুষ যেন কোকিল, নারী যেন কাক; নারীর ভেতর বিছন ছেড়ে দিয়েই খালাস।

যদি সন্তানের অর্ধেকটা পুরুষের পেটে, অর্ধেকটা নারীর পেটে হতো তাহলে পুরুষগুলো এমন করতে পারত কি?

পুরুষ যেন স্বার্থপর হতে পারে সে ব্যবস্থা তো ভগবানই দিয়ে রেখেছে। ভগবানের ওপর তার রাগ হয়, পুরুষের ওপর তার রাগ হয়। শ্রীদাম আর মাধবীর প্রতি করা অপরাধের জন্য নিজের ওপর তার রাগ হয়।

এ শরীরটাই আসলে একটা অপরাধ। অপরাধের কারখানা। নীতি, প্রীতি, মতি এগুলো সব বানানো। বানানো বলেই তো থেকে থেকে ভেঙে পড়ে নানান রঙের ভয়ংকর ক্ষুধার চাপে। কত কত নীতিবাক্য, জ্যোতিবাক্য বলে যাচ্ছে ধর্মগুলো— মানুষের কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। মানুষের দোষ নেই, মানুষকে দখল করে থাকা জীব-জন্তুগুলো মানুষকে অসহায় করে রেখেছে।

মানুষের শরীরের পেট, যৌনাঙ্গ, হৃৎপিণ্ড, চোখ, কান, ফুসফুস, জিহ্বা, রক্ত আসলে আলাদা আলাদা জীব। এসব জীব উকুনের মতো, মৎকুনের মতো, শকুনের মতো কামড়ে কেটে মানুষকে অস্থির করে রাখে।

মানুষ কোনো মৌলিক জীব নয়। মানুষ যৌগিক জীব।

মানুষের পেট মানুষেরই কোনো কথা মানে না, খাবার ব্যবস্থা না থাকলেও খেতে চায়, চুরিচামারি করে, দেহবেচে, দাসখত দিয়ে যেভাবেই হোক না কেন সে ঠিক থাকতে চায়।

এই হৃৎপিণ্ড ইচ্ছে করলেও মানুষ একা একা থামাতে বা সচল রাখতে পারে না, বুকের অন্ধকার ঘরের ভেতর একা একা টিকটিক করে চলতেই থাকে, চলতে চলতে নিজেই থেমে যায় কারো কোনো কথা মানে না।

এই যে, যৌনাঙ্গ; এ এক চরম গোঁয়ার আর আদিম দুর্মর জীব, যেকোনো জীবের চেয়ে এ জীবের জেদের রাশ ধরে থাকা হাজার হাজার গুন কঠিন। মানুষের শরীরে বাস করা যেকোনো জীবের চেয়ে এ যৌনাঙ্গজীবের জন্য বেশি হেনস্তা হতে হয় মানুষকে।

আর এই যে জীভজীব, কতকিছুর জন্য সে লকলক করে, তেঁতুলের নাম শুনলেই নড়েচড়ে উঠে কুকুরের মতো জল ঝরাতে শুরু করে। এই জীভজন্তু কথা বলার সুযোগ পেলেই তড়াক করে লাফ দিয়ে ওঠে।


[কালোর ওপর কালো দিয়ে আঁকা একটা ছবি।]

ইউনিয়ন পরিষদের পুরাতন দালানে শুয়ে শুয়ে আরতি কত কী হিসাব মিলায়। নিজেকেই নিজের বহন করতে হয় একজন মানুষকে সারাজীবন। কেউই কারো হতে পারে না। আরতি শ্রীদামের হতে পারল না যৌবনের কারণে। রমজান আরতির হতে পারল না আলগা পিপাসা মিটে যাবার কারণে। মাধবীকে তো তারা জন্ম দিয়েছে তবুও মাধবীর তারা কেউ হতে পারল না। আরতি মাধবীর হতে পারল না নিজ স্বার্থের কারণে, শ্রীদামও মাধবীর হতে পারল না অসুস্থতা আর মরণের কারণে। যৌনতার কারণে মাধবীর জন্ম, যৌনতার কারণেই আরতির সাথে মাধবীর বিচ্ছেদ। রমণের কারণে মাধবীর জন্ম আবার মরণের কারণে শ্রীদামের সাথে মাধবীর বিচ্ছেদ। এর মানে কী যৌনতা আর মৃত্যুর মান সমান। আহারে, পিতা, মাতা, সন্তান বলে জগতে কিছু নেই। বিরাট বিপুল বিশ্বের সবাই একা। স্বার্থতে জোড়া লাগিয়ে রাখে, স্বার্থ না থাকলে সম্পর্কের আঠা এমনিতেই ছুটে যায়।

আজ চাঁদ ওঠেনি। ঘন অন্ধকার চারদিকে। ক্ষুধা মিইয়ে ঝিমিয়ে পড়েছে। নিজেকে আরতির ঠান্ডা বরফের একটা বড়ো চাঁই মনে হচ্ছে। বরফ যেমন মেঝেতে পড়ে থাকলে একা একা গলে গলে জল হয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নাই হয়ে যায় তেমন হলে কত ভালোই না হতো।

খুন হওয়া লোকটার মুখ আর তার চোখে ভেসে ওঠে। আবার তার মনে হয়, ‘কেউ যদি এসে খুন করে যেত তাকে কত ভালোই না হতো’। ভাবতে ভাবতে তার শরীর ক্লান্তি ক্লমে ভরে ওঠে। তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে। এমন সময় সে কলা আর পাউরুটির গন্ধ পেল। কিছুটা দূরে আছে কলা পাউরুটির গন্ধ। কলা পাউরুটির গন্ধ হেঁটে আসছে; মানুষের মতোই এক ধাপ এক ধাপ করে এগিয়ে আসছে।

বাহ্ রে! খাবারের গন্ধ কি তবে মানুষের মতো হাঁটে?

খাবার হেঁটে আসছে না খাবার থেকে গন্ধ খুলে গিয়ে শুধু গন্ধ হেঁটে আসছে?

খাবারের আগে আগে তার গন্ধ দৌড়াতে পারে। গন্ধ না হয় চলতে পারে খাবার কি চলতে পারে?

আজ বাজারে খাবারগুলোকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল আরতি, কোনো খাবারও কি তাকে দেখেছিল?

যে খাবারগুলো তাকে দেখেছিল সে খাবারগুলো কি আরতির প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে, মায়ার্দ্র হয়ে দোকানদারের চোখ লুকিয়ে, চুরি করে আরতির দিকে চলে আসছে?

আরতির ঝিমানো চোখ আর পেট দুটোই জেগে উঠেছে। পাউরুটি আর কলা দোকানিকে ফাঁকি দিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে আসছে বুঝতে পেরে সে খুব বিস্মিত হয়। খুব কাছেই চলে এসেছে কলা পাউরুটির গন্ধ। তার জীভজীব সুড়সুড় করে কুকুরের মতো ঝোল ঝরাতে শুরু করেছে। জিভকুকুরের লালা ঝরানো সে থামাতে পারে না। খাবার যেমন হেঁটে হেঁটে আসছে তার জিভও তেমন দ্বিগুণ গতিতে খাবারকে এগিয়ে নিতে ছুটছে, যেমনভাবে অতিথির আসার খবর পেয়ে অতিথিকে এগিয়ে নিতে অতিথিপরায়ণ গৃহী এগিয়ে যায় কিছুদূর।

কলা পাউরুটি ফিসফিস করে কথা বলছে যেন। আরতি অবাক হয় আরো।

যেন কলা বলছে— হ্যাঁ। যেন পাউরুটি বলছে— না।

চারজন যুবকের একজন হুট করে তার মুখ চেপে ধরে এসে— ‘এই চুপ থাকবি একদম। একটা কথা বলবি কি চিৎকার করবি, গলা টিপে দেব।’

ভয় পেয়ে গেছে আরতি। ভয়ের ভাঁজে সে গুটিয়ে থাকে পোকার মতো। প্রথম প্রথম যে গ গ শব্দ করছিল তাও একজনের ধমকে থেমে গেছে।

নিঃশব্দে আর দ্রুত তারা তার পরনের কাপড় খুলতে থাকে। তারা নিঃশব্দ কিন্তু তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের দ্রুতি সশব্দ। আরতি নিঃশব্দ কিন্তু তার কাপড় শব্দ করে; খুলে যাওয়ার শড়শড় শব্দ, ছিঁড়ে যাওয়ার পড়পড় শব্দ।

এর মধ্যেই একজন বলে উঠে— ‘আমি আগে করব। আমিই তোদের খবরটা দিয়েছিলাম।’

সবাই মেনে নিল। সে আগে উঠে পড়ল আরতির শরীরের ওপর। তারপর আরেকজন। তারপর আরেকজন। আরতি মুখ খুলল না; গলা দিয়ে গ গ শব্দ বের করল না; যদি গলা টিপে দেয়; যদি বুকে ছোরা ঢুকিয়ে দেয়; যদি সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয় গায়ে যেমনভাবে বহুবার দিয়েছে রমজান ডাক্তার।

প্রথমজন সিগারেট ধরিয়েছে। এবার আরো একজন তার ওপরে চড়ল। ম্যাচের সামান্য আলো-আঁধারিতে আরতি তার মুখ চিনতে পারল। যুবকটি চোখ বন্ধ করে তার মাজার ওঠা নামা চালু রেখেছে দারুণ নেশায়।

আরতি বলে উঠল ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে— ‘তুমি শ্রীপতি না? তুমি ঊলুপ দিদির ছেলে? তোমার মা আমার বোন। সহজ বোন না হোক; পাতানো বোনই হোক; তবু তো বোনই।’

শ্রীপতি তার মাজা দোলানি থামায়— ‘মাসি তুমি!’

একথা বলার পর খুব দ্রুত মাজা দুলাতে থাকে; দ্রুত বীর্যপাত করার পর সুখে কিছুক্ষণ হাঁসফাঁস করে।

আরতিকে ছেড়ে তড়াক করে উঠে পড়ে, বলে— ‘মাসি আমি তোমাকে চিনতে পারিনি। এরাই আমাকে ডেকে আনল আর আমি চলে এলাম। মাফ করে দাও।’

সে আরতির পা ধরে মাফ চায়।

আরতির চোখ দিয়ে জল ঝরে, হায়রে যৌবন এভাবেও মানুষকে অপমান করে। তাকে তার বোনের ছেলের হাত দিয়ে অপমান করাল। তার বোনের ছেলেকে মাসিগামী করিয়ে নিল, যৌবনের নিদারুণ দুরন্ত ঘূর্ণিপাক শ্রীপতিকে বিরত থাকতে দিতে পারল না। যখন সে পরিচয় জানতে পারল তখনও সে বিরত থাকতে পারল না, একেবারে রেতঃপাতের পর থামল। মাফ চাইল।

শ্রীপতি অনুতাপে পুড়ে যাচ্ছে। সে কী করবে বুঝতে পারে না।

পাশে থাকা কলা-পাউরুটি ঝট করে তুলে নিয়ে শ্রীপতি তার মাসির দিকে দেয়— ‘খাও মাসি। আমি মাঝে মাঝে তোমার সাথে দেখা করে যাব। খাবার দিয়ে যাব। কিন্তু তুমি তো সমাজচ্যুত হয়েছ, নইলে তোমাকে বাড়িতেই নিয়ে চলে যেতাম।’

আরতি গপগপ করে কলা-পাউরুটি গিলে।

শ্রীপতি বলল তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে— ‘চল তোরা, এটা আমার মাসি আর কখনো এমন করিস না তার সাথে।’

সবাই মাথা ঝাঁকালো হ্যাঁ-সূচক কিন্তু একজন কোনো সাড়া দিল না। কলাপাউরুটিগুলো ছিল এই একজনের।

শ্রীপতি বলল— ‘কি রে লোকমান তুই কথা বলছিস না কেন?’

লোকমান বলল— ‘আমার কলা-পাউরুটি তুই দিয়ে দিলি কেন? আমার বউয়ের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলাম।’

শ্রীপতি বলে— ‘আজ তো দোকান বন্ধ হয়ে গেছে কালকে তোকে আমিই কিনে দেব। এখন চল।’

লোকমান শ্রীপতির কথা মানে না— ‘আমি আরেকবার করব’ বলে আরতির দিকে এগিয়ে যায়; আরতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

শ্রীপতি রাগে গরগর করতে করতে এক লাথি মারে লোকমানের মাজা বরাবর। পরপরই, একহাত ধরে এক ঝটকায় আরতির ওপর থেকে সরিয়ে তার টুঁটি টিপে ধরে— ‘খবরদার একেবারে গলা টিপে দেব।’

সবাই কিছুক্ষণের জন্য ছবির মতো স্তব্ধ হয়ে যায়। যেন অন্ধকারের গায়ে ছায়া দিয়ে আঁকা ছবি তারা; যেন গাঢ় কালো দেয়ালে আরো গাঢ় কালো দিয়ে আঁকা একটা ছবি সাঁটানো আছে। এই স্তব্ধীভূত নির্জীব ছবির ভেতর আরতির চোখের জল শুধু জীবন্ত।

তারা চলে গেল। মিশমিশে আঁধারে মিশে গেল।


[পরনের কাপড়। পরানের কাপড়।]

বেশ বেলা হয়ে আরতির ঘুম ভাঙল। একে একে আধা আধাভাবে সে রাতের কথা মনে করতে পারল। তার মন বিষাদে ভরে গেল। কলা-পাউরুটির কথা মনে পড়ল। শ্রীপতির কথা মনে পড়ল। তারা প্রথমেই তাকে গলা টিপে খুন করতে চেয়েছিল সে কথা মনে পড়ে আরো বেশি বিষণ্ন হয়ে পড়ল। কেন সে সুযোগটা গ্রহণ করল না। সে তো দিনের বেলাতেই চেয়েছিল, তাকে কেউ খুন করলে খুব ভালো হবে কিন্তু তারা যখন খুন করতে চাইল তখন দুএকবার চিৎকার করে সে সেই সুযোগটা নিল না কেন।

এসব ভাবতে ভাবতে নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা জন্মে গেল আরো বেশি। আরো বেশি ঘৃণা জন্মাল যখন তার মনে পড়ল দ্বিতীয়জন যখন সংগম করছিল তখন তার ভালো লাগছিল। শরীরের খুশি আর মনের বেদনা একই কারণে কীভাবে ঘটে! পরনের কাপড় খুলে নেবার জন্য অন্যকে দোষ দেয়া যায়, পরানের কাপড় খুলে গেলে নিজেকে ছাড়া কাকে আর দোষ দেয়া যায়। আরতির মনে হয়, বেশ্যাখানাতেও হয়তো এমন বেশ্যা আছে যারা বেশ্যা নয়, দায়ে পড়ে দেহ উদোম করে কিন্তু মন তাদের উদোম নয়। আবার গৃহে গৃহে অনেক গৃহবধূ আছে যারা মনে মনে বেশ্যা; গোপনে গোপনে বেশ্যা।

আরতি ভাবে— আরতি তুমি কী?


মাধবী

মরণশস্য। মরণপোষ্য।

ফাঁসির দড়ি নিয়ে শুয়ে আছে মাধবী। তার হাসির দড়ি ছিঁড়ে গেছে। তার জীবনে আর হাসি নেই। তার বাবা নেই। বাবা পচে গলে চলে গেছে। আঙুর থোকার থেকে দোকানি যেমনভাবে পচা আঙুরটাকে ছিঁড়ে ফেলে তেমনভাবে ছিঁড়ে ফেলেছে পৃথিবী। ঐ আকাশ-চাঁদ-তারা তো পচে না, বাতাস তো পচে না, সূর্য পচে না তার রোদ পচে না, বেদনা পচে না শুধু বাবা পচে গেল, সুখ শান্তি ভালোবাসা পচে গেল গলে গেল। জ্বলে গেল।

মাধবীকে নিয়ে ফাঁসির দড়ি শুয়ে আছে; যেমনভাবে গল্পের নাগরাজ তার মানুষী প্রেমিকাকে নিয়ে শুয়ে থাকে। মা নেই। তার স্নেহরাশির দড়ি ছিঁড়ে গেছে।

তার মা তাকে ছেড়ে কেমন করে চলে গেল?

মা কি কখনোই সন্তানকে ছেড়ে যেতে পারে?

তাহলে কি আরতি তার মা নয়?

মাধবী কি ভুল মায়ের পেটে জন্ম নিয়েছে?

তার মা কি এখনো জন্মেনি?

নাকি অন্য কোথাও জন্মেছে যার বিয়েই হয়নি এখনো?

নাকি বিয়ে হয়েছে কিন্তু সেখানে কোনো ভুল সন্তান জন্ম নিয়েছে কিন্তু মাধবী জন্ম নেয়নি?

এও কি সম্ভব! এ অসম্ভব ভাবনা আসছে কেন ভেতরে?

মাধবী ফাঁসির দড়িকে জড়িয়ে শয়ন শুয়ে আছে; যেমনভাবে রূপকথার নায়িকা অভিশাপে সাপে রূপান্তরিত রাজকুমারকে নিয়ে শুয়ে থাকে। জগন্নাথ নেই। তার বাঁশির সুরের দড়ি ছিঁড়ে গেছে।

এ জীবন রেখে কী হবে। এ জীবন বেড়ে উঠবে আর কীভাবেই বা; লোহালক্কড় পাথর কংক্রিটের স্তূপে, ফাঁকফোঁকরে বটের চারা গজায় বটে কিন্তু বেশিদিন বাঁচে না; রসের অভাবে শুকিয়ে যায়, ধুঁকে ধুঁকে মরে; মরেই। একজন মানুষের কাছে কাছের মানুষ ছাড়া অন্য মানুষের দল কংক্রিটের স্তূপের মতোই। যদিও কাছের মানুষের কাছেই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কাছের মানুষই।

আবার, মানুষের কাছে চেয়েচিন্তে খেয়ে কি আর জীবনের এতগুলো দিন যাবে? ভাবতে ভাবতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। ঝাপসা চোখে দেখে, তার বাবার কাটা পা হেঁটে হেঁটে আসছে। কাটা পা হেঁটে হেঁটে আসে কীভাবে। সে ভয় পায়। তার বাবার শরীর দাহ করা হয়ে গেছে। তার বাবার শরীর জগতের মাটি কাদা ধুলো জলে বিলীন হয়ে গেছে। এ কাটা পা পুড়ানো হয়নি। এ কাটা পায়ের কী হয়েছিল কে জানে।

কুকুর বিলাই কাক শকুনে খেয়েছে?

বনমুরগিতে খেয়েছে?

তার বাবা একদিন বলছিল, মানুষের মাংসকে মহামাংস বলে মা। মাধবী ভাবে, মানুষের মাংস যদি মহামাংস হয় তবে ইতর প্রাণীতেই মহামাংস খেতে পায় আর মহাজীব মানুষ খায় বনমুরগির মাংস; মহামাংস নয় শুধু মাংস।

মনে মনে ফাঁসে ঝুলে ঝুলে সে দেখছে দৃশ্য। দেখছে মনে মনে, তার নিজের ঝুলে থাকা, মনে মনে দেখছে মানুষের শোকাক্রান্ত মুখ; মনে মনে শুনছে মমতাক্রান্ত কথা। ভগবানের অনুতাপে পোড়া মুখও দেখছে। মনে মনে মরে এসব দেখতে দেখতে তিরতির করে তার চোখ কাঁপে, ঠোঁট কাঁপে, বুক কাঁপে আবেগে, অভিমানে।

এবার সে কাটা পায়ের বদলে একটা মুরগিকে হেঁটে আসতে দেখে। মুরগিটা আবার কাটা পা হয়। এ এক আজব। কাটা পা মুরগি হয় কোন নিয়মে, মুরগি কাটা পা হয় কোন নিয়মে। সে চোখ কচলায়। পা আর মুরগির ভেলকি থেকে বের হতে চায়। বহুবার চোখ কচলানোতেও পা আর মুরগির ভেলকিবাজি যায় না।

বাইরে লোকজনের চলাচল এখনো আছে। কেউ কেউ কথা বলছে। তাদের হাতে ছোটো ছোটো টিপবাতি। মাঝে মাঝে টিপবাতি টিপছে ফকফক করে আলো বেরুচ্ছে; যেন বমি করছে, আলো বমি। পেস্টের মতো নাকি টিপবাতিগুলো! টিপলে আলো বেরোয়।

কেউ কেউ বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে হাঁটছে। খুকখুক করে কাশছে।

কেউ কেউ তাড়ি খেয়ে নেশা জড়ানো কণ্ঠে নিজেদের মধ্যে খিস্তিখেউড় করছে, কথায় কথায় রাজা-উজির মারতে মারতে চলে যাচ্ছে। তারা এতোটাই টুপ ভুজঙ্গ হয়ে আছে যে, কখনো কখনো রাজা-উজির মারাও তুচ্ছ হয়ে যায় তাদের কাছে।

একজন মাতাল বলে— ‘হাঁস মুরগির মাংস বহু খেনু ভাইয়া এবার ভূতের মাংস খেতে চায়। আয় ভূত আয়। যেমনভাবে মুরগিকে ডাকে তেমন করে ডাকে শোনা যায়।’

তার সঙ্গী মাতাল বলে— ‘আমি ঈশ্বরের মাংস খাব। বুঝলি। ঝাল ঝাল করে রান্না করে খাব।’

কারো কণ্ঠস্বর আর শোনা যাচ্ছে না। রাত আরো রাত হয়ে উঠছে। রাত আরো রাত হয়ে উঠুক। রাত দ্বিগুণ রাত হয়ে উঠুক।

রাত নিশুতি হয়ে গেলে সে আত্মহত্যা করবে; জীবনের অসহায়ত্বহত্যা করবে। সে দড়িতে হাত বোলায় যেমনভাবে পশুকে পোষমানানোর জন্য পশুর গায়ে হাত বুলায় পশুপোষ্য মানুষ। মরণপোষ্য হবে সে।

তাদের দোচালা ঘর। দড়িকে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে চালার কড়ি বর্গার দিকে তাকায়; মনে মনে ঠিক করে নেয় চালার কোন বাঁশটাতে দড়ি বাঁধবে।

মনে মনে, ফাঁসির দড়ি বাঁধার বাঁশ ঠিক হয়। মরণ পরবর্তী অবস্থার চিত্র সে মনে মনে ভাবে। মনে মনে সে চিত্র দেখে একটা একটা করে যেমনভাবে অ্যালবামের পাতা একটা একটা করে ছবি দেখে তেমন।

প্রথম চিত্র সে দেখে— তার ফাঁস খাওয়া ঝুলছে। তার মরদেহ ঝুলে ঝুলে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। নিজের ঝুলে থাকা ছবি দেখে তার নিজেরই মায়া লাগে খুব, আহা মাধবী, মাটিতে পা রাখার মাটি পেলি না, মাটি পা রাখার মায়া পেলি না একটু।

দ্বিতীয় ছবি সে দেখে— তার ঝুলন্ত লাশের দিকে তাকিয়ে থাকা গাঁয়ের লোকের ছবি।

তৃতীয় ছবি সে দেখে— তার ঝুলন্ত লাশের দিকে তাকিয়ে থাকা পৃথিবীর সমস্ত পোকামাকড়, কুকুর মেকুর, গাছপাথরের ছবি।

তার ঝুলন্ত লাশের দিকে তাকিয়ে থাকা অন্তরিক্ষের চাঁদ-তারা-সুরুজের ছবি দেখে।

তার ঝুলন্ত লাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ভগবান; ত্রিমূর্তি— ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবের ছবি দেখে। দেবলোকে থাকা দেব-দেবতাদের ছবি।

গাঁয়ের লোকেরা যখন জানতে পেরেছে তখন তারা এসেছে; এই ছবি দেখছে সে। গাঁয়ের লোকজন খুব আফসোস করছে।

বলছে, অতিশয় ভালো ছিল গো মেয়েটা।

পৃথিবী নিজেকে খুব অপরাধী মনে করছে। তার কাছের মানুষগুলোর জীবন থমথমে হয়ে গেছে, বিষাদে ভরে গেছে; থেমে গেছে। তাদের থমথমে হয়ে যাওয়া জীবন, বিষাদে ভরে যাওয়া জীবন আর কোনোদিনও ঠিক হবে না; থেমে যাওয়া জীবন আর সচল হবে না। পাশের বাড়ির যে কাকি ভাত দিয়ে যায় কখনো কখনো সে কীভাবে আঁতকে উঠছে সে ছবি দেখছে। ভগবান খুব আফসোস করছে ব্যথা পাচ্ছে তার সৃষ্টির পরিণতি দেখে। ভগবান ভাবছে, সে আর সৃষ্টি করবে না।

মাধবী একের পর এক এমন ছবি দেখতেই থাকে মনে মনে। হঠাৎ একটা তেঁতুলে বিছা কোনদিক থেকে এসে তার পায়ে উঠে পড়লে সে চমকে ওঠে; মনে মনে ছবি দেখায় ছেদ পড়ে। সে বিছাকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। কামড়াতে পারেনি তার আগেই মাধবী ঝেড়ে ফেলে দিতে পেরেছে।

ঐ তেঁতুল গাঁটের বিছা যেন শুধু তার ছবি দেখার ধ্যান ভাঙতেই এসেছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ ভাবের ভাঙা অবস্থা থাকে না। জোড়া লাগে। একটু ভিন্নভাবে। একটু ভিন্ন মানে কিন্তু পুরোই ভিন্ন। এবার তার অনেকের মুখ মনে পড়ে। তার মনে পড়ে তার মায়ের মুখ।

সে যখন শুনবে তার মাধবী আত্মহত্যা করেছে তখন কী সে তার কাজের জন্য অনুতপ্ত হবে না?

নিশ্চয় হবে। না-ও হতে পারে। সে তো বেশ সুখেই আছে রমজান ডাক্তারের বাড়িতে, রমজান ডাক্তারের ভাতের হাঁড়িতে, রঙিন শাড়িতে।

এবার মনে পড়ে জগন্নাথের মুখ। জগন্নাথের সাথে সে স্কুলে পড়ত। জগন্নাথ তাকে ভালোবাসে বলেছিল। মাধবী তার ভালোবাসায় সাড়া দিয়েছিল। তারপর তো মাধবীর পড়াশোনায় বন্ধ হয়ে গেল। তারপরও জগন্নাথ তাকে ভালোবাসত। তাকে স্বপ্ন দেখাত, স্বপ্ন শেখাত, স্বপ্ন লেখাত চিঠিতে।

কিন্তু যেদিন গ্রামে রটে গেল, মাধবীর মা রমজান ডাক্তারকে বিয়ে করে মুসলমান হয়ে গেছে তারপর থেকে জগন্নাথের আর দেখা নেই, খবর নেই। দুএকবার খবর নেবার চেষ্টা করেছে মাধবী, জগন্নাথ দেখা করেনি। চিঠি পাঠিয়েছে, উত্তর দেয়নি। মাধবী বুঝে নিয়েছে জগন্নাথ তাকে আর ভালোবাসে না; ভালোবাসায় চিড় ধরেছে। চারদিকে শুধু চিড় আর চিড়, চিড়ের ভিড়ে অসহায় মাধবী। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কে এত চিড় থাকে তা বুঝতে পারেনি কখনো সে। চিড় আসলে থাকে সবসময়ই, সময়ের রাগে চিড়।

জগন্নাথের ব্যবহারে কেঁদেছে দুএকবার তারপরই ভেবেছে, তারই আবার দোষ কী, যার মা মুসলমান হয়ে গিয়ে মুসলমানের ঘরে উঠেছে, জাত খুইয়েছে তখন তার সাথে সম্পর্ক রাখার আর দরকার কী! যার মা এমন হতে পারে তার মেয়ে কী ভালো হতে পারে? এসব কথা মনে পড়াতে একটা কান্নার ঢেউ উথলে আসে বুক ঠেলে একেবারে। জগন্নাথের ওপর তার অভিমান হয়; অভিমানে ঠোঁট দুটো লবণমাখা কেঁচোর মতো ছটফটে মোচড় খায়; সমুদ্রের ভাঙা ঢেউয়ের মতো তার ঠোঁট এঁকিয়েবেকিয়ে ওঠে। আহা, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক আরো কত সম্পর্কের সাথে সম্পর্কিত।

মানুষের সকল কারবার অদ্ভুত। মানুষ বড়ো স্বার্থমাখা। স্বার্থপাখা; স্বার্থপাখা আছে মানুষের, ঐ পাখাতে ভর দিয়ে উড়ে উড়ে বেড়ায়; গাছ বদলায়, ডাল বদলায় থেকে থেকে। মানুষের সকলকিছুর চারপাশে কুয়াশার বেড়া। রহস্যের বেড়া। সরলিয়া কিছু নেই, সহজিয়া কিছু নেই।

তার বাবার কথা মনে পড়ে, তার বাবা শ্রীদাম রেখার জ্যামিতি বোঝাতে গিয়ে বলেছিল— সরলরেখা শুধু সরলরেখা আঁকাতে কাজে লাগে। আর বড়োজোর চেয়ার টেবিল তৈরিতে কাজে লাগে। আর বক্ররেখা ছাড়া ছবি আঁকা অসম্ভব। ভূ-জ্যামিতি বা প্রাকৃতিক জ্যামিতিতে তাই তো বলে, সরলরেখা বলে কোনোকিছু নেই। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই গো মা; মন-জ্যামিতি নানারঙা বক্ররেখা, চক্ররেখায় ভরা; মানুষের দেহেও কোথায় সরলরেখার ঠাঁই নেই। সহজতা সরলতা অলীককথা গো মা।’

বাবার কথা তখন ভালো করে ধরতে পারেনি মাধবী। এখন বুঝতে পারে বাবার কথায় ঠিক, একটা মানুষ কখনোয় সরলপথের পথিক হতে পারে না। মানুষের খুব একটা দোষ নেই; সরলপথের পথিক হওয়া আসলে সম্ভবও নয়। একটা মানুষ তার নিজের জন্য ভাবে একভাবে কিন্তু তার পাশের মানুষ তাকে নিয়ে ভাবে অন্যভাবে, তার গ্রামের মানুষ ভাবে আরেকভাবে, তার রাষ্ট্রের মানুষ ভাবে আরেকভাবে, চারপাশে সামাজিক আর প্রাকৃতিক পরিবেশ ভাবে আরেকভাবে।

তার সাথে বেশি পরিচিত মানুষ ভাবে একরকম, কম পরিচিত মানুষ ভাবে আরেক ভাবে, অপরিচিত মানুষ ভাবে আরেক ভাবে, যার সাথে কোনোদিনই দেখা হবে না সে মানুষও ভাবে তার সম্পর্কে আরেকরকমভাবে, যে লোক শ শ বছর আগে বা সহস্র সহস্র বছর আগে মারা গেছে সেও যা ভেবে গেছে তা এখনের যেকোনো লোকের ওপরেই ভালো বা মন্দ প্রভাব ফেলছে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই ব্যক্তি কোনো ভাবনা ভাবছে, যা কর্ম করছে, যা কথা বলছে তা যে কোনো প্রান্তের বর্তমান ও ভবিষ্যতের তাবৎ মানুষের পক্ষে বা বিপক্ষে যাচ্ছে। ফলে একটা মানুষ যখন নিজের ভাবনা করা পথে চলতে চায় তখন তার পাশের মানুষের ভাবনার সাথে, আরো সব মানুষের ভাবনার সাথে, অতীতের মানুষের ভাবনার সাথে বেশ সংঘর্ষ বেঁধে যায়, সংঘর্ষ বেঁধে যায় আবহাওয়া আর পরিবেশের সাথে ফলে কোনো ভাবনাই সঠিক পথ পায় না। সে নিজেকে নিয়ে যা ভেবেছিল তা হয় না, অন্যরা তাকে নিয়ে যা ভেবেছিল তা-ও হয় না। এমন কিছু হয় যা কেউই ভাবেনি।

আবার একটা মানুষও আসলে দুটা মানুষ। তাদের ভেতর যুদ্ধ চলতেই আছে। দুটা মানুষ কারণ তার দেহ আছে আর মন আছে। দেহের কারবার আর মনের কারবার এক নয়। দেহ বাঁচতে চায় যে পথে সে পথে তার মন বাঁচে না। মন যে পথে বাঁচতে চায় সে পথে দেহ বাঁচে না। দুটোর পথের মিল হওয়া সবচেয়ে কঠিন।

দেহ বলে— ‘ভিক্ষা করে হলেও, অপমানিত হয়ে হলেও খাবার সংগ্রহ করে নাও।’

মন বলে— ‘মরে যাও কিন্তু ভিক্ষা কোরো না, অপমানিত হয়ো না।’

মানুষ এক কিম্ভূত অবস্থার ভেতরে পড়ে আছে। এসব ভাবতে ভাবতে তার ভেতর ভাবনার কোলাহল ওঠে; ভাবনার মন্থনে, ভাবনার ফেনায় হলাহল বেড়ে ওঠে। নিজের ভেতরের কোলাহলে, বোলাহলে, হলাহলে ডুবে থাকতে থাকতে সে বুঝতেই পারে না, বাইরের কোলাহল ডুবে গেছে ঘুমে, পথে আর কেউই নেই; পথে শুধু পথ আছে; পথ দিয়ে শুধু চলে যাচ্ছে পথ; চলে এসেছে ফাঁসিতে ঝুলে পড়ার সময়; ঝুলতে ঝুলতে টুপ করে ঝরে পড়ার সময় চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। ফাঁসির দড়ি বাঁশি বাজিয়ে তাকে ডাকছে। কারো কাছে তার বিদায় নেবার নেই; নিজের কাছে নিজে বিদায় নিয়ে এখন চলে যেতে হবে ফাঁসির বাঁশির ডাকে। ফাঁস-কৃষ্ণ তার জন্য অপেক্ষা করছে রাসলীলার ঝুলনার মতো ঝুলতে ঝুলতে।


[পৃথিবীর সকল দৃশ্যেরই দর্শক রয়েছে।]

‘ফাঁসির সময় বয়ে যাচ্ছে লো মাধবী’ — কে যেন বলে তার কানের কাছে ফিসফিস করে। সে ধড়মড় করে ভাবনার কোলাহল থেকে বেরিয়ে উঠে দাঁড়ায় যে চেয়ারটাকে ফাঁসির মঞ্চ করেছে সেই চেয়ারে। তার কান্না আসে। অভিমানে বুক ভরে ওঠে; নিজের বুকের ভেতর নিজের মুখ লুকিয়ে কাঁদতে পারলে ভালো লাগত।

জগন্নাথ কি পারত না তাকে এসে একটু সান্ত¦না দিতে?

সে তার দড়ি বাঁধে কড়িকাঠের সাথে।

তার বাবা কি এসে বলতে পারে না— ‘এই যে রে মা, আমি মরিনি, তোকে ভয় দেখাচ্ছিলাম মাত্র; আয় আমার সোনা।’

সে টেনে দেখে, শক্ত হলো কি না। টানে চালার বাঁশ মচমচ শব্দ করে ওঠে।

তার মা কি এসে বলতে পারে না— ‘মাধবী ফাঁসির দড়ি খুলে ফেল মা, আমি আছি— ‘আমি যে নেই বলে মনে করেছিলি’ সেটা তোর স্বপ্ন ছিল মাত্র।’ বাঁশের সাথে দড়ি বাঁধা হলে এবার ফাঁস তৈরি করে। ফাঁস তৈরি হয়ে গেছে।

পৃথিবীর সকল দৃশ্যেরই দর্শক রয়েছে। মাধবীর এই ফাঁসমঞ্চেরও দর্শক আছে। ঘরের ভেতর থাকা যত টিকটিকি, তেলাপোকা, ইঁদুর, ছারপোকা মাথা বের করে পিটপিট করে মাধবীর দিকে তাকিয়ে আছে; তারাই তার মরণবরণ খেলার দর্শক। নিদারুণ খেলার সফলতা বিফলতার দর্শক।

মাধবীর মুখের সামনেই ফাঁসির দড়ির ফাঁস। সে ফাঁসের ডিম্বাকার বৃত্তের ভেতর দিয়ে তাকায়; বৃত্তের এপারে জীবিত মাধবী; ওপারে মৃত মাধবী। এপারে জীবিত ওপারেই মৃত। জীবিত মাধবী মৃত মাধবীর দিকে তাকায়। জীবিত মাধবী মৃত মাধবীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে; মৃত মাধবী কথা বলে না শুধু মিটিমিটি হাসে। এই ডিম্বাকার ফাঁসের ভেতর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিলেই মৃত মাধবীর মুখে চুমু দিতে পারবে। মাধবী মৃত মাধবীকে চুমু দেবে।

চুমু দেবার আগে মাধবী ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাঁদে। সে কাঁদছে না; কাঁদছে সে, যে তার ভেতরে থাকা একান্ত আত্মীয়; যেমনভাবে ফাঁসির আসামীর আত্মীয়রা কাঁদে তেমন। কান্না থামিয়ে সে চোখ মুছে।

সে নিজে নিজের কাছে বিদায় নেয়— বিদায় গো মাধবী।

সে মাথা ঢুকাতে যাবে, মৃত মাধবীকে চুমু দিতে যাবে এমন সময় হুড়মুড় করে কয়েকজন ঘরে ঢুকে পড়ে।


আরতি

[পাউরুটির কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকা পিঁপড়া। নির্বিচারী দাঁত।]

গতরাতে কয়েকজন যুবক আরতির সাথে যৌনতা করেছে। তাদের মধ্যে শ্রীপতিও ছিল। তার বোনপো। পাতানো বনের পো।

সে পাশ ফিরে দেখল, এখনো কিছুটা পাউরুটি আর কলা রয়ে গেছে। থাক।

কলে গিয়ে বাসিমুখ ধোয়; মুখ মুছে আঁচল দিয়ে।

কলপাড় থেকে পাউরুটির কাছে ফিরে। পাউরুটি চুপচাপ বসে আছে। পাউরুটির গায়ে প্রচুর পিঁপড়ে খুদবুদ করছে।

আহা রে পিঁপড়ারা, আহারে মন দিয়েছিস তোরা?

কিন্তু এ তো আমার খাবার, অনেক অপমানের বিনিময়ে কেনা খাবার।

একটা একটা করে পিঁপড়ারাকে সরিয়ে দেয় কলার গা থেকে, পাউরুটির গা থেকে। পাউরুটির ফাঁকে ফাঁকে পিঁপড়া ঢুকে গেছে সেসব ফাঁক থেকে পিঁপড়েদের টেনে বের করে, যেমনভাবে মানুষ মানুষের শার্টের কলার চেপে ধরে বা চুল ধরে টেনে আনে তেমন করে। টেনে বের করার সময় দুআঙুলের চাপে কোনো কোনো পিঁপড়ে পিষে যায়; কোনো কোনো পিঁপড়ের পা বা মাথা ছিঁড়ে থেকে যায় পাউরুটির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গর্তের ভেতর।

‘জগৎ নির্মম রে পিঁপড়েরা’ — বলে সে কামড় বসায় পাউরুটির গায়ে।

এই পাউরুটির ফাঁকে ফাঁকে আরো পিঁপড়ে থেকে যায়নি কি?

সে কি সবই বের করতে পেরেছে?

নিশ্চয় আছে; পিঁপড়েগুলোকে টেনে বের করার সময় কোনো কোনো পিঁপড়ে প্রাণভয়ে পাউরুটির আরো গভীরে ঢুকে যাচ্ছিল, যেমনভাবে বাঘের সিংহের তাড়ন খাওয়া হরিণ পালাতে পালাতে আরো গভীর বনে ঢুকে পড়ে; ঢুকে পড়ে লতাপাশে জড়িয়ে যায় আর পালাতে পারে না, তেমন। পাউরুটির গভীরে ঢুকে বের হওয়ার পথ হারানো পিঁপড়েদের বের করার আর খাটুনি খাটার শক্তি মনে ছিল না আরতির; সে খুব অবসন্ন।

অবসন্নভাবেই সে পাউরুটি কলা চিবুচ্ছে; খুব ধীরে সুস্থে; তার দাঁতের ফাঁকে পড়ে পাউরুটি পিষে যাচ্ছে, পাউরুটির গুহায় লুকিয়ে থাকা পিঁপড়ে পিষে যাচ্ছে, কলা গলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে সব পেটের ভেতরে।

পেটের অবস্থান যোনির ঠিক ওপরেই। শিশ্নের অবস্থান পেটের ঠিক নিচেই। যোনি মুহূর্ত সুখের গর্ত, শিশ্ন মুহূর্ত মধু উত্তোলনকারী মন্থনদণ্ড। যোনি স্থায়ী যন্ত্রণার খনি, শিশ্ন চিরকালীন সর্বনাশের কৃষ্ণ।


[ঘরবিড়ালি। খাটবিড়ালি। কাঠবিড়ালি। মাঠবিড়ালি। ঘাটবিড়ালি। হাটবিড়ালি।]

আপাতত পেট ঠান্ডা। পেট ঠিক রাখতে মাথা হেট করে বেঁচে থাকে মানুষ। আরতির মন জ্বলে যাচ্ছে। মনের পোড়া থামে না। আহা রে, মন তোর পোড় থামবে না মরণের আগে পর্যন্ত। দেহ তো খাবার পেলেই, যৌনতা পেলেই তৃপ্ত কিন্তু তপ্ত মনকে তৃপ্ত করার সহজসাধ্য কিছু নেই জগতে।

সে উঠে হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিকে যায়। স্নান করে নিলে ভালো লাগত। রাতের চার যুবকের নাড়াচাড়া ধুয়ে ফেলতে পারত। গতরাতটাকে গতর থেকে ধুয়ে ফেলতে পারত। গতরাতটা গতরের সাথে লেগে আছে; গা ঘিনঘিন করছে। স্নান করতেই হবে। কিন্তু তার তো আলাদা আর কোনো কাপড় নেই। যা দিয়ে সে ভেজা কাপড় পরিবর্তন করতে পারে।

এখন গোসল করা যাবে না। গোসল করতে হবে সন্ধ্যার পর। সন্ধ্যার পরের অন্ধকারে পোশাক পরা মানুষ আর পোশাক খোলা মানুষের মধ্যে পার্থক্য নেই। অন্ধকার পোশাক খোলার সুযোগ দেয় মানুষকে। যেহেতু এখন গোসল করা হচ্ছে না সেহেতু গতকালের সারারাতটাকে সারাদিন শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে। ভাবতেই তার মন হিসহিস করে ওঠে। এতও ঝক্কির ভেতর দিয়ে যেতে হয় মানুষকে!

সে নদীর ধারে একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে। তাকে উশকোখুশকো চুলের একটা পাগলির মতোই দেখাচ্ছে। অদূরে তিনটি মেয়ে খেলছিল। আরতিকে বসে থাকতে দেখে তারা খেলা থামিয়ে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আরতি খেয়াল করেনি এতক্ষণ। যখন খেয়াল করল তখন তারা যেতে ধরেছে। যেতে যেতে ফিরে দেখছে ঘনঘন।

আরতি তাদের হাতের ইশারায় ডাকে। তার ডাকে তারা দাঁড়ায় কিন্তু নড়ে না; এগোয় না। আরতি ডাকে আবার; তারা সন্দেহে দোলে পাগলির কাছে কি যাওয়া ঠিক হবে। যদি খামচি দেয়। আবার ছেলেধরাও তো থাকে; ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের ধরে বস্তায় ভরে নিয়ে যায়; এ যদি তেমনই ছেলেধরানী হয়। তারা সন্দেহের দোলায় দুলে।

আরতি আবার ডাকে হাত নেড়ে।

তিনজনের মধ্যে একজন তার দিকে এগোতে গেলে আরএকজন তার হাত ধরে টানে— ‘যাসনে টে, পাগলিটা নুচে নিবে।’

যে এগিয়ে আসছিল সে দমে যায়। হঠাৎ তিনজনে ঘুরে দৌড় দেয়।

আরতি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। যে মেয়েটা আসার জন্য পা বাড়িয়েছিল তার চেহারাটা কার মতো যেন মনে হচ্ছে। মনে করার চেষ্টা করছে আরতি। মনে পড়ল। শেফালির মতো। তার সাথে পড়ত শেফালি; কাঠবিড়ালী। তার নাম হয়ে গেছিল কাঠবিড়ালী। তারা তিনজন স্কুলের কমনরুমে সবসময় একসাথে থাকত; শেফালি, গোপা, আরতি। কাঠবিড়ালী, মাঠবিড়ালী আর ঘরবিড়ালী। স্কুলে তারা একসাথে থাকলেও স্কুল ছুটির পর তিনজন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

শেফালি তাদের বাড়ির পাশের জঙ্গলে গিয়ে গাছে গাছে উঠে বুনো গাছপালা থেকে আম, আমরুত, আতা, আঞ্জির, বেল, কতবেল, ডেউয়া, নোনা আরো কত কী পেড়ে বেড়াত। সেই জন্যই তো সে কাঠবিড়ালী— গাছবিড়ালী।

মাঠবিড়ালী গোপা মাঠে গিয়ে রাখাল ছেলেদের সাথে ছোটাছুটি লুটাপুটি করত, গুলি খেলত, ডাং-গুলি খেলত।

আর আরতি ঘরবিড়ালী; সহজে ঘর থেকে বের হতো না; ঘরের ভেতরেই ছিল যত তার ঞ ঞ মিঁয়ো মিয়োঁ।

আরতির ভেতর থেকে আবার দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।

শেফালি এখন আর গাছবিড়ালী আছে কি?

গোপা আর মাঠবিড়ালী হয়ে আছে কি?

না। স্বামীসংসার নিয়ে, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘরবিড়ালী হয়ে আছে। আর আরতি! ঘরবিড়ালী বাদ দিয়ে আর সব বেড়ালী হয়ে গেছে; কাঠবিড়ালী, মাঠবিড়ালী, ঘাটবিড়ালী, পথবিড়ালী, জলবিড়ালী, থলবিড়ালী, বাজারবিড়ালী— সব।

বাচ্চা তিনটিকে দেখার পর থেকে, তাদের চলে যাবার পর থেকে একরাশ নতুন বিষণ্নতা তার ভেতরে সাপের মতো কিলবিল করছে। এই যে নদীর তট। ওই যে জট নামা বট। নদীর ঢেউ কাঁপছে বাতাসে। তটের বালিতে আলো পড়ে আলো কাঁপছে চিকচিক করে। বটের পাতা কাঁপছে বাতাসে। এসবের ভেতর শিশুকালে দিদিমার সাথে জলে এসে কত খেলেছে।

সে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে; ভাবে। কোথাকার জল কোথা গিয়ে পড়ছে। নদীর এত জল কোথা থেকে আসে, কোথায় চলে যায়। মানুষও তেমনই, কোথা থেকে আসছে, শিশু হয়ে জন্মে যাচ্ছে আর বড়ো হতে হতে কতরকম কাণ্ডকারখানা করতে করতে মরে যাচ্ছে। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু যেন একজন মানুষের উঠা আর বসা। একজন মানুষ যেমন ধীরে ধীরে দাঁড়ায় আর আবার ধীরে ধীরে বসে পড়ে তেমন মনে হয় শিশু থেকে বড়ো হতে হতে বুড়ো হয়ে আবার মাজা বাঁকা হয়ে, হাড় ক্ষয়ে, মাংস ঝুলে ছোটো হতে হতে শিশুর মতো শুয়ে পড়া।

একই মানুষের দুগতির চলা। একটা ইচ্ছেকৃত গতি, আরেকটা অনিচ্ছাকৃত গতি।

ইচ্ছেমূলক গতিতে সে পায়ে হাঁটে, দৌড়ায়, বাসে ট্রেনে প্লেনে ছুটে বেড়ায়।

অনিচ্ছাকৃত গতি হলো— মাংস বৃদ্ধি, শক্তি বৃদ্ধি, হাড় বৃদ্ধি, বুদ্ধিবৃদ্ধি।

অনিচ্ছাকৃত গতি হলো— প্রথম নিশ্বাস থেকে শেষ নিঃশ্বাসের দিকে চলা, জীবনের চাবলে চর্বিত হতে হতে মৃত্যুর কবলে পড়া— মৃত্যুর পেটে পড়া। বা জন্মের কোল থেকে মৃত্যুর কোলে। ছোটো থেকে বড়ো হওয়া বাধ্যতামূলক, ইচ্ছে করলেও সে এটা করতে পারবে না যে— বড়ো হব না।

ইচ্ছে করলে ইচ্ছেমূলক গতি কেউ নাও নিতে পারে, ইচ্ছেমূলক চলা কেউ নাও চলতে পারে কিন্তু অনিচ্ছাকৃত গতি বা চলন কোনোভাবেই থামাতে পারবে না। বসে থাকলেও একটা মানুষকে বড়ো হতেই হবে মাংস হাড় বাড়বে। বসে থাকলেও একটা মানুষকে মরে যেতে হবে, মাংস হাড় ক্ষয়ে যাবে।

স্বামী শ্রীদামের কথা মনে পড়ে, বড়ো ভালো ছিল মানুষটা। দেহও তো কম সুঠাম ছিল না। রাতের পুরুষ হিসেবেও সে ছিল খুব ভালো। গতরাতের যে চারজন তাদের চাইতেও ভালো ছিল, রমজান ডাক্তারের চাইতেও ভালো ছিল। কিন্তু ঐ তো কী অসুখে পড়ল। তার চোখ গিয়ে পড়ল রমজান ডাক্তারের দিকে, রমজান ডাক্তারের চোখ পড়ল তার ওপরে। রমজান ডাক্তারের আমড়াগাছী কথার গাছে চড়ে গেল আরতি। তারপর কত কী হয়ে গেল। এখন সে পাগলির মতো পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খাবারের দোকানের দিকে তাকাতে গেলেই কুত্তা তাড়া করে তাড়া করছে। দোকানে দোকানে প্রচুর খাবার আছে কিন্তু এসব খাবারের গায়ে টাকাওয়ালাদের নাম লেখা। আরতির নাম লেখা নেই। আগে তার নাম লেখা ছিল; এখন নেই, কাটা পড়েছে তার নাম।


[নিষাদরাজ আনারস। কুকুরাবতার।]

সকালের কয়েক নলা কলা পাউরুটি পেট থেকে উধাও হয়ে গেছে। জ্বলন্ত চুলাতে ফুটতে থাকা জলের বাষ্প যেমন কিছুদূর দেখার পর আর দেখা যায় না, বাতাসে মিশে যায় তেমনভাবেই পেটচুলাতে ফুটতে ফুটতে কলা পাউরুটি উবে গেছে। এখন আবার তার ক্ষুধা দরজায় আঘাত করার মতো আঘাত করছে তার পেটে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়; যেন সে পেটের দুয়ার বন্ধ করতে যাচ্ছে।

বাজারের যেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে সেখানে শ শ রকমের হাজার হাজার জিনিস পড়ে আছে; সবকিছুই সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে; পচা-গলা শসা খিরা, বিড়ি-সিগারেটের পুচ্ছ আর চ্যাপটা হওয়া নানাকিছুর খালি প্যাকেট, ছোটো ছোটো শড়া মাছ, বড়ো বড়ো মাছের দস্তার পয়সার মতো আঁশ, লালচে কানকো ফুলকা, মাছের মুরগির হাঁসের গলা চোখ টাটকা চোখ, দরজির দোকানের টুকরো টুকরো রকমারি কাপড়ের ফালি লাল নীল বেগুনি সাদা কালো, কাপড় সেলাইয়ের রকমারি সুতা আর ভাঙা কাটিম। গুনচটের ছেঁড়া ফাঁসা ব্যাগ বস্তা বস্তানি, দড়ি সুতলি, বাদামের খোসা ঠোঙা। পিঁপড়ে ধরা মরা ব্যাং। মরচে মাখা ভাঙা তালা, দরজার শিকলি, হাতল।

ল্যাংড়া ব্যাং মাজা ছেঁচড়ে এগুনোর চেষ্টা করছে আর পোকা-পিঁপড়া জিবে আটকানোর চেষ্টা করছে; পোকা পিঁপড়ারাও তার গায়ে আঁকশি আটকে কামড়ে ছেঁড়ার চেষ্টা করছে।

পড়ে আছে দোকানদারদের ইঁদুর-ধরা কলে পড়া প্রচুর ধেড়ে ইঁদুর নেংটি ইঁদুরের লাশ— কোনো কোনোটা মরেনি এখনো, ধুক ধুক করে নড়াচড়া করছে, স্থান পরিবর্তন করে অন্য কোথায় চলে যেতে চাইছে; এখানে এ থেঁতলে যাওয়া মুমূর্ষু ইঁদুর কোথায় যেতে চায়; সে যতদূরই যাবে ভাগাড়; বিস্তীর্ণ ভাগাড়; তার চলার গতির কাছে, আয়ুর গতির কাছে এ ভাগাড় অসীম।

বেশুমার মাথা-জ্বলা ম্যাচের কাঠি; মাথা তাদের ছাই হয়ে আছে যদিও কোনো কোনো কাঠিকে মনে হতে পারে আগের মতোই আছে। পচা পালং, টকপালং, ডাঁটা, মাটির কলস খোলা হাঁড়ি ভাঙা খোলামকুচি।

মুরগির চামড়া পালক, মোটা দড়ির মতো নাড়িভুঁড়ি; পাকস্থলির ধান গম ছোলা। ডিমের খোলা।

পড়ে আছে গরুর বাঁকানো শিং যেন চাঁদ; বাঁকানো কালো চাঁদ; মাটিতে উদ্‌গীত চাঁদ। পড়ে আছে গরুর বাঁকানো দাঁতযুক্ত চোয়াল; পড়ে আছে সাদা চাঁদের মতো; সাদা দাঁতাল চাঁদ। পড়ে আছে গরুর পায়ের হাড়, খুর, কাটা লেজের লোম, অণ্ডকোশ আর তার বিচি, গাইগরুর ওলান আর তার বাঁট। শিশু গরুর ছিন্ন মাথা।

পড়ে আছে, মানুষের গু কাশ পোঁটা মুতের গাঢ় সর, হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ছোটো ছোটো ভাঙা আধভাঙা শিশি, নির্যাস নিংড়ে নেওয়া চাপাতার ভেজা গুড়া, পচা পটোল ঝিঙা বেগুন, আমের লিচুর বিচি। কোনো কোনো বিচি থেকে ছোটো ছোটো পাতার নরম চারা বের হয়েছে; তারা হাসছে; ভাগাড়ে জন্মানো শিশুচারারা হাসছে; নতুন জন্মা এই চারারা এই কচিকাঁচারা বুঝতে পারছে না এখনই কেউ একজন এসে দাঁড়িয়ে মুতে দিতে পারে তার নরম শরীরের ওপর, কেউ একজন এসে একদঙ্গল জঞ্জাল চাপা দিতে পারে তার কচি শরীরের ওপর; কোনো বুভুক্ষু ছাগল ভেড়া মুড়ে দিতে পারে।

পুরো ভাগাড় সে তীক্ষ্ণ নজরে দেখে; প্রতিটা জিনিসে চোখ ফেলে। কোনোটা কোনোটা দেখে আরো বেশিক্ষণ। তার মনে হয়, ভাগাড়ে পড়ে থাকা এসব জিনিসের ভাবও যেন একেকটার একেক রকম; একটা কম পচা শসা একটা বেশি পচা শসার দিকে মুখ বাঁকিয়ে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পচা শসাটা শুধু পচা সে পচা নয়। খাসির দুটো উপড়ানো চোখ যারা একই খুলি থেকে বের হয়ে পড়ে আছে তাদের একটা কিছুটা বেশি ধুলোমাখা আছে বলে আরেকটা চোখ সেটার দিকে তাকিয়ে আছে ঘৃণা মাখা চোখে।

ভাগাড়ের একটা ভালো জায়গাতে; ভাগাড়ের ভেতর ভালো জায়গা! ভাগাড়ের ভালো জায়গাতে পচা আনারস একটাকে পড়ে থাকতে দেখে; না, আনারসটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। আনারস একটা কোলাপুরি চটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে; আনারস একটা আধলা ইটের গায়ে হেলান দিয়ে লতাপাতার মুকুট পরা জংলি রাজার মতো দাঁড়িয়ে আছে। খুব সুন্দর নকশাদার কোলাপুরি চটি; এদিকটাতে দুএকজন বড়োলোক শুধু পরে এ চটি; রমজান ডাক্তারেরও ছিল একজোড়া; তার কোন এক বড়োলোক আত্মীয় দিয়েছিল। কিছু কিছু লোক পায়ের জন্য; পায়ের একটা আঙুলের জন্য যা ব্যবহার করে তার মূল্য কোনো কোনো পরিবারের সারাবছরের খরচ। আরতি দাঁড়িয়ে থাকা রামায়নের নিষাদ রাজার মতো মুকুট পরা আনারসের দিকে তাকায় ভালো করে; আরো ভালো করে।

এ আনারসের পুরো মাংসই কি পচা?

শড়া?

কিছুটাও কি এর খাওয়া যাবে না?

সে আনারসটার দিকে তাকিয়ে থাকে; বুনোরাজের মাথায় সবুজ পাতার মুকুট, সোনালি রং গায়ে, পুরো শরীর ভরা চোখ; চোখশরীরী আনারস, রসঅন্তরী আনারস। যার যত চোখ তার তত শোক; যার যত চোখ সে তত জ্ঞানী। সে হিসেবে মাছি, মৌমাছি, ফড়িং-ফড়িঙ্গা-উচ্চিঙ্গট জ্ঞানী, এসব পতঙ্গদের নাকি অনেকগুলো চোখ আছে। আর আতামেওয়া আর আনারস জ্ঞানী ফল, সারা গা ভরা চোখ আর চোখ।

এত চোখ দিয়ে কী করে আনারস। সেই তো তাকে বঁটির নিচে পড়ে কুচি কুচি হতে হয়, লবণে মাখামাখি হতে হয়, দাঁতের তলায় গলে যেতে হয়। বেশি চোখ থাকলেই বেশি বেদন, বেশি রোদন। মানুষের যদি পিছনে আর সামনে চোখ থাকত তবে তার কষ্ট হতো আরো বেশি। কারণ, যখন কোনো মানুষ কোনো মানুষকে ছুরির আঘাত করে তখন খুন হতে যাওয়া মানুষ তিন ধরণের ব্যথা পায়।

এক ধরনের ব্যথা হলো, কে তাকে মারছে সেটা সে দেখতে পায় ফলে সে যদি তার কাছের কেউ হয় তবে তার মনে বেদনা জাগে— ‘আহা তুই আমাকে মারার জন্য ছুরি বাগিয়ে ধরেছিস!’

আর এক ধরনের ব্যথা আছে সেটা হলো, তাকে আক্রমণ করতে আসছে, ছুরি তার ভেতরে ঢুকে যাবে আর সে রক্তাক্ত হয়ে যাবে সেই ভাবনার অগ্রিম ব্যথা।

আর একটা ব্যথা হলো, ছুরি বসে যাবার পর দৈহিক যন্ত্রণা। যদি কোনো মানুষ কোনো মানুষকে পিছন থেকে মেরে পালিয়ে যায় তবে খুন হওয়া মানুষটা তিন ব্যথার মধ্যে দুটা ব্যথা কম পায়। আনারসের সবদিকে চোখ, তাকে যেদিক থেকেই বঁটি দিয়ে কাটুক তিন ধরনের ব্যথায় পেতে হবে। সুতরাং যত চোখ তত জ্ঞানী, যত জ্ঞানী তত শোক। সুতরাং চোখ কমাতে পারলেই ভালো। সুতরাং এতো চোখের দরকার নেই। সুতরাং নির্বোধই ভালো। নির্বোধ থাকাই ভালো। অন্ধ বোবা কালা থাকা ভালো।

কিছুটা যদি খাওয়া যায় সেই আশায় সে আনারসটা কুড়ানোর জন্য আবর্জনার স্তূপের দিকে নামতে যাবে তখন দেখে, একটা কুকুর কোথা থেকে হুট করে চলে এল। এমন হুট করে এলো যেন কুকুরাবতার; যেমন মৎস্যাবতার ছিল, কূর্মাবতার ছিল, বরাহবতার ছিল, নৃসিংহাবতার ছিল তেমন কুকুরাবতার। তবে ঐসব অবতার এসেছিল গোটা পৃথিবীকে গড়তে বা বাঁচাতে কিন্তু এ কুকুরাবতার এসেছে শুধু আরতির জন্য, আরতিকে কষ্ট দেবার জন্য। প্রত্যেক মানুষের জীবনের জন্যেও আলাদা আলাদা অবতার আসে তাকে বিপদে ফেলতে বা বিপদতারক হতে।

এই কুকুরাবতার ঠ্যাং তুলে মুততে শুরু করার আগে এক ঝলকের জন্যেও দেখতে পায়নি। কোন পাতাল থেকে, কোন আকাশ থেকে চোখের পলকেরও আগে কুকুরটা এসেই ঐ আনারসের গায়ে মুততে শুরু করল।

হায় রে কপাল! কপালের নাম গোপালচন্দ্র কপালের নাম গুয়েগোবরে। তার মন ব্যথায় কুঁকড়ে গেল। সে আনারসটাকে নিয়ে ভাবছিল একভাবে, আনারসটাকে নিয়ে তার চারপাশের প্রকৃতি ভাবছিল আরেকভাবে।

কুকুরের মুত মিশ্রিত আনারস আর খাওয়া যাবে না; আনারস এখন আনাকষ হয়ে গেছে, আনামূত্ররস হয়ে গেছে। আনারসের অনেক চোখ। চারদিক সে ভালো করে দেখতে পারে। সেই আনারস দোকানে ঝুলতে ঝুলতে হয়ত আরতির দুর্দশা দেখে নিজেই মাত্র খানিকটা পচে উঠেছিল যাতে দোকানদার তাকে ফেলে দিতে বাধ্য হয়, যাতে সে আরতির খাবার হতে পারে। আনারস যদি এভাবে ভেবে থাকে, তবে আনারসের ভাবনাও কাজে লাগল না; কুকুরের মুত আনারসের চোখে চোখে এখনো টাটকা অশ্রুর মতো ঝুলছে, ঝুরছে, ঝরছে।

আবর্জনার স্তূপে সে আর নামল না, উঠে এলো। কুকুরটাও আনারসের মুখে চোখে মুতে দিয়ে কোনদিকে চলে গেল কে জানে, ওটাকে আর দেখা গেল না; যেন বাতাসের গর্ভ থেকে জন্মেছিল কুকুর বাতাসের গর্ভেই আবার আত্মগোপন করল।

দুপুর গড়িয়ে গেল। সকালের আর কোনো কাজ নেই কাজ শুধু গড়িয়ে যাওয়া। দুপুরের আর কোনো কাজ নেই কাজ শুধু গড়িয়ে যাওয়া। বিকেল সন্ধ্যা রাতের কোনো কাজ নেই গড়িয়ে যাওয়া ছাড়া, মানুষকে মাড়িয়ে যাওয়া ছাড়া।

আবর্জনার স্তূপ থেকে উঠে আসার পর এখন তার মনে হচ্ছে নিজেকে আবর্জনার ভেতর ফেলে রেখে আসতে পারলে খুব ভালো হতো। সেও তো একটা আবর্জনাই; আবর্জনা হয়ে গেছে; যেমনভাবে লিচুর থোকায় থাকতে থাকতে একেকটা লিচু ঝরে পড়ে আবর্জনার শামিল হয়ে যায়।


[এঁটো ভাত, কেঁটো ভাত, ঝেঁটো ভাত। আনারসের চোখে পেচ্ছাপ করা কুকুরের মৃত্যু।]

সে একটা ভাতের হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। কখনো কখনো নষ্ট ভাত তো ফেলে দেয় তারা; সেই বালিপূর্ণ, করালিপূর্ণ ভাতই কুড়িয়ে সে খাবে। ভাতের হোটেল তার সামনে থেকে সরে গেল। হোটেলে কাজ করা একটা তেরো চৌদ্দ বছরের পুঁচকে এসে তাকে ধাক্কিয়ে সরিয়ে দিল। উলটে পড়তে গিয়েও সামলে নেয়। তার মন ব্যথিয়ে উঠল একেবারে। তার চোখে জল টলমল করে উঠল। ভেতরে প্রচুর বাষ্প ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে কয়েক ধাপ দূরে সরে দাঁড়াল।

তার সামনেই চওড়া বড়ো পিচের রাস্তা; বর্ডার থেকে ট্রাক বাস বোঝাই মাল আর মানুষ চলে আসছে গতি তুলে। রাস্তার ওপারেও একটা ভাতের হোটেল আছে। রাস্তার এপার থেকেই দেখল, ওপারের একটা হোটেলবালক কিছু এঁটো ভাত, কেঁচো ভাত, ঝেঁটো ভাত ফেলল ডাস্টবিনে। এসময় দেখল একটা ট্রাক দুরন্ত গতিতে এগিয়ে আসছে।

ভাত ফেলা দেখেই রাস্তার এপাশ থেকে একটা কুকুর দৌড় দেয় এঁটোকাঁটার দিকে। কুকুরটা তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল; এতক্ষণ খেয়াল করেনি। সে চিনতে পারল এ কুকুর আনারসের চোখে মুখে মুতে দেওয়া সেই কুকুর; তাহলে এ কুকুরাবতার নয়; অবতার অপবাদ কুকুরটাকে দেওয়া ঠিক হয়নি।

কুকুর দৌড়াচ্ছে। আরতির বুক কেঁপে উঠল, ট্রাক তুমুল গতিতে এগিয়ে আসছে। কুকুরটা তো রাস্তা পার হতে পারবে না! কুকুরটা রাস্তা পার হতে পারল না। রাস্তার মাঝখানে যাবার আগেই দুরন্ত কুকুরের মাথা পিষে চলে গেল দুরন্ত ট্রাক।

কুকুরের রক্ত ছিটকে এসে পড়ল আরতির গায়ে, মগজ ছিটকে এসে পড়ল মাথার ওপর, একটা চোখ ছিটকে এসে পড়ল তার পায়ের ওপর। তার আত্মা আঁতকে উঠল। তার গা ঘিনঘিনিয়ে উঠল। তার ভেতর গুলিয়ে উঠল। তার আর হোটেলের দিকে যাওয়া হলো না। তার গা গোলাচ্ছে, বমি হবহব ভাব কিন্তু হচ্ছে না। জগৎ ভাসিয়ে বমি করতে পারলে ভালো লাগত কিন্তু বমি হয়ে কিছু বেরুবে এমনকিছু পেটে নেই। সে রাস্তার ধারে বসে পড়ল একটু ধাতস্থ হওয়ার জন্য।

তার মাথায় কুকুরের মগজ-হৃৎপিণ্ডের মুকুট। কুকুর মগজের মুকুট পরা রানি। কুকুরের হৃদয় রানি। দুপায়ের ওপর দুটো কুকুরের দুটো চোখ; অক্ষপাদ সে; পায়ের চোখ দিয়ে সে কিছু দেখতে পায় না যদিও পুরাণের অক্ষপাদ গৌতম ব্যাসদেবের মুখ দেখতে পেয়েছিল।

তাকে দেখে আশপাশের লোকজন হাসাহাসি করছে, টিটকার ছাড়ছে। কুকুরটার এমন নির্মম মরণ কাউকে বিচলিত করতে পারছে না, কুকুরের রক্ত মাংস লাগা আরতির জঘন্য অবস্থাই তাদের কাছে সুখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের হাসাহাসি কাঁটার মতো বিঁধে আরতির। তবু সে ওঠে না, এসব হাসিঠাট্টার কাঁটার ভেতর সে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার চুল বেয়ে, চোখ বেয়ে, গাল বেয়ে কুকুরের রক্তরস, মগজরস, মজ্জারস চুয়ে চুয়ে পড়ে। কিছুটা ধাতস্থ হলে সে গায়ে কুকুরের রক্ত নিয়ে, মাথায় কুকুরের মগজ নিয়ে নদীর দিকে হাঁটতে লাগল। স্নান করতেই হবে। ভেজা কাপড়েই থাকতে হবে। ভেজা কাপড় গায়েই শুকাতে হবে। তার আর কোনো শাড়ি নেই।

তার শাড়ির গায়েও এরমধ্যেই অজস্র চোখ বেরিয়েছে। যত চোখ তত জ্ঞানী। তার শাড়ি জ্ঞানী হয়ে উঠেছে। তার দেহ এসব ফুটো-চোখ দিয়ে উঁকি মেরে বাহির দেখে। বাহির এসব ফুটো দিয়ে আরতির দেহ দেখে। এসব ফুটো দিয়ে ভেতর-বাহির দেখাদেখি হচ্ছে, মাখামাখি হচ্ছে। লজ্জা আর লজ্জাহীনতার মাংস-মজ্জা-রস সব একাকার হয়ে গেল জগতের জিহ্বার তলে পড়ে।

জেড-এস
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম