দিলীপের বৌ বিষ্ণুর প্রেমে আকুল হলো তরুণ কারবারি রিংকু আকনের দেহ-মন-প্রাণ। দৌলতখান থেকে ব্যবসায়ের ছুতায় এই দফায় সে মোবারেক মোল্লার চাতালে ছুটে এলো। প্রথমবার বাবা জয়নাল আকনের অনুরোধ রক্ষার তাগিদ তাকে এখানে টেনে এনেছিল। সেবার বাবা তাকে বুঝিয়েছিল পারিবারিক ব্যবসায়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। সে যদি হাল না ধরে তবে কারবারি লাটে উঠবে। রাজার হালে এতদিন চলেছে যে পরিবার চলেছে সেই পরিবার এবার পথে বসবে। প্রথমবার রিংকুকে কারবারিতে পাঠিয়ে তার বাবা মনে মনে প্রার্থনা করেছে—ছেলের যেন কারবারিতে মন বসে। সে যেন বিফল না হয়। তার মা-ও জায়নামাজে বসে আল্লাহকে ডেকে ডেকে পেরেশান হয়েছে, বলেছে— খোদা, তুমি তার সহায় হও। প্রথমবার রিংকু আকন কারবারিতে যেতে গড়িমসি করলেও এবার সে বাবাকে বুঝিয়েছে—কারবারি এক দারুণ পেশা। তার খুব মনে ধরেছে। কারকারিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞ জয়নাল আকন নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েও ছেলের এই কথার পিছনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ধরতে পারেনি। তার মা মনে মনে ভাবছে—খোদা-তায়ালা তার ডাক শুনেছে। পরিবারের অন্য লোকেরাও রিংকুর কথায় মহাখুশি। এবার পরিবারের ব্যবসায়ের হাল ধরতে একজন যোগ্য উত্তরাধিকার তৈরি হওয়ায় তাদের বহুদিনের দুশ্চিন্তা কাটলো। সকলকে ভরসা দিয়ে মালামাল বোঝাই করে নাও ভাসাতে এক লহমা বিলম্ব করেনি রিংকু আকন। তবে রিংকু নিজে জানে চাতালে তার ছুটে আসার কারণ। সে যেখানে ছুটে এসেছে সেখানে সে ভালোবাসার মানুষের সন্ধান পেয়েছে। এভাবে ছুটে আসতে হলে অবশ্যই প্রেমের বাঁধন আবিষ্কার করতে হয়। প্রেমের মানুষ ছাড়া কীসের নেশায় ছুটে মানুষ। প্রেমের মানুষের সন্ধান পেলেই তবে মানুষ নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যে ছুটে যেতে উদ্যত হয়। সেটা শহর হোক বা বন্দর। টান না থাকলে মানুষকে টানবে কিসে। তবে এই টান সোজাসাপটা রিংকুকে চতুর বানিয়েছে। বিষ্ণুর প্রেমকে মূল্য দিতে গিয়ে নয়া নাগর রিংকু প্রায় সকলের চোখে ধুলা ছিটিয়ে চাতালে এসে থিতু হয়েছে। নাও বোঝাই ফসল হলো তার ধুলা—যে ধুলা সে পরিবার ও স্থানীয় কারবারিদের চোখে ছিটিয়েছে। সে ভেবেছে কেউ কিছু আন্দাজ করতে পারবে না।
প্রেমে আকুল হয়ে শেষকালে প্রেমের মানুষের কাছে এসে থিতু হয়ে তাকে জয় করতে চেষ্টার কমতি করেনি রিংকু। তার সত্য প্রেমে বহুদিনের বিরতির পর বিষ্ণুর হৃদয়ের বরফও গলে জল হয়েছে। এতদিন পতিবিরহে বিষ্ণু কেমন নিশ্চুপ পাথরের বেশ ধরে দিনযাপন করেছে। রিংকু সেই পাথরের গায়ে পাথার সমান ঢেউ হয়ে আঘাত করে নির্বাক শরীরে কথার ফোয়ারা বইয়ে দিয়েছে। তবে প্রেমের পথ কোনো সরলরেখা দিয়ে প্রবাহিত হয় না সেকথা প্রেমিক মাত্রেরই অজানা নয়। বাড়ির বাঁধন ছিড়ে যে রিংকু তরতর করে নাও ভাসালো সেই নাও এত সহজে হৃদয়ের বন্দরে পৌঁছতে পারবে না বলেই মনে হলো রিংকু আকনের। চাতালে ফিরে সে দেখলো একদল লোক লৌহবর্ম শরীরে জড়িয়ে তার প্রেমের পথে কাঁটা বিছাতে চাইছে। পিতার বয়সী কারবারিদের কাছে সে জানলো, বিষ্ণু আসলে এক দস্যি নারী। স্বামীর সঙ্গে মিলেমিশে সে একসময় ব্যবসায়ী জোতদারের সম্পদ লুটে নিয়েছে। রাতে অস্ত্র হাতে ডাকাতের বেশে অভিযান চালিয়েছে বাড়ি বাড়ি। বস্তাবন্দি অর্থকড়ি এনে অনাথের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। এসব কথা যারা বলেছে তারা রিংকুকে বিষ্ণুর কাছ থেকে তাকে ফেরাতে চেয়েছে। ভেবেছে স্বামী হারা মেয়েটি বিত্তশালী ছেলেটির মাথা নষ্ট করছে। তাকে এই মেয়ের কবল থেকে ফেরাতে হবে। যেন তারা রিংকুর আপনজন। বিপথগামী ছেলেটিকে বাঁচানো তাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তাদের হিতোপদেশে রিংকু বিরক্ত হলেও তারা নিবৃত্ত না হয়ে বরং নিজেরদের তৎপরতাকে আরো জোরদার করেছে।
রিংকু বিষ্ণুর প্রেমে পড়েছিল বিষ্ণুর চোখ দেখে। চোখের ভিতরের গহনা-নির্জনতা দেখে। তার চাওনি দেখে। বিষ্ণুর চোখে অনেক কথা আছে, সেই চোখ কিছু না কিছু বলতে চায়। কেউ যদি সেই চোখের ভাষা বোঝে—সেখানে হাজারো মহাকাব্যের বর্ণিল পঙক্তির সন্ধান লাভ তেমন কঠিন বিষয় নয়। তবে যে ব্যক্তি সেই চোখ পড়তে জানে না তার কাছে বিষ্ণুর চোখ যেন কেবলই মাছের চোখ। কেমন নিস্তরঙ্গ, নিথর। সেখানে কোনো কথা নেই। যে অল্প কিছু মানুষ বিষ্ণুর চোখের ভাষা বুঝতে পেরেছে রিংকু সম্ভবত তাদেরই একজন। যে চোখ তাকে দৌলতখানের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করতে উৎসাহ দিয়েছে। কারবারির জটিল কর্ম ও তত্ত্বকে সে মাথা পেতে নিয়েছে বিষ্ণুর প্রেমের নামে। প্রেমের পড়ার কালে রিংকু না দেখেছে বিষ্ণুর শরীর, শরীরের রং, না জেনেছে বংশের পূর্ব বৃত্তান্ত। রিংকুর স্বল্প বয়স ও অভিজ্ঞতা তাকে বলেছে—বিষ্ণুর চোখে অনেক কথা জমা হয়ে আছে। সেই অনুচ্চারিত কথার প্রেমে পড়েছে বড় কারবারি পরিবারের আদরের সন্তান রিংকু। শৈশব থেকে যা চেয়েছে তার সবটুকু পেয়ে অভ্যস্ত রিংকু। অপ্রাপ্তি তার যতটুকু তা মনে রাখবার মতো নয়। তার নাদুস-নুদুস গোলগাল লম্বা শরীর। মনও তার যথেষ্ট স্বাস্থ্যসম্পন্ন। সবকিছু পেয়ে যে অভ্যস্ত তার প্রেমের পথে বাঁধাকে সে যে তুচ্ছজ্ঞান করতে পারে তা অনুমান করা যায়। তবে প্রেমকে জয় করতে হলে কেবল বাঁধাকে তুচ্ছ করলে চলে না। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন তার শক্ত বুদ্ধি-বিবেচনা ও পদক্ষেপ।
মোবারেক মোল্লার চাতালের যে-সকল কারবারি রিংকু আকনের প্রেমের বিরোধিতায় নেমেছে এই প্রেম সফল বা বিফল হলে তাদের বিশেষ কোনো স্বার্থ নেই। তারা কেবল দুই মেরুর দুইজন মানুষকে এক হতে দেখে বিস্মিত বদনে বলছে—এ আবার কেমন কথা। তেলে আর জলে মেলে নাকি কোনো দিন। দিলীপের বৌ বিষ্ণুর সঙ্গে যে নাম জড়িয়েছে তা কোনো সরল গল্প নয়। বিষ্ণু দরিদ্র পরিবারের মেয়ে পরে নিম্নবিত্ত পাল পরিবারের বৌ। স্বামীর সঙ্গে মিলে রাষ্ট্রদ্রোহের মত অপরাধে দোষী এবং পরে স্বামীহারা এক অনাথ মেয়ে। তার বিরল সৌভাগ্য যে তাকে স্বামীর সঙ্গে প্রাণ দিতে হয়নি, জেলের ভাতও খেতে হয়নি। কিছুদিন পালিয়ে থেকে ফের নিজস্ব লোকালয়ে ফিরতে পেরেছে। লোকে তার পিছনের গল্প ভুলে তাকে নিজ সমাজে তুলে নিয়েছে। মোবারেক মোল্লার চাতালে কাজ করে এখন সে নিজের পেট চালাতে পারছে—এই এক বড় ঘটনা। তার সঙ্গে নয়া কারবারি রিংকু আকন যদি ভালোবাসার বন্ধন সৃষ্টি করে তবে তা বিত্তবান সমাজে অচ্ছুতদের প্রবেশ করাবে না ঘৃণ্য উদাহরণও সৃষ্টি করবে।
প্রেমের মানুষ সম্পর্কে মানুষ জানতে চায়। রিংকুও বিষ্ণু সম্পর্কে যে-সব কথা হয়ত পরে জানতে চাইত লোকেরা উপযাজক হয়ে সেসব কথা আগেই তাকে জানাতে চাইছে। তাতে সত্য-মিথ্যার রং মিশিয়ে। তারা বিষ্ণুকে একইসঙ্গে ভয়ংকর, হতদরিদ্র ও অসহায় নারী হিসেবে রিংকুর কাছে উপস্থাপন করতে গিয়ে নিজেরাই রিংকুর চোখে নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আর রিংকুর চোখে বিষ্ণু হয়ে উঠছে ফিল্মের এক আকর্ষণীয় নায়িকা। যাকে নিয়ে লোকমুখে চর্চা হয়। যার সবটুকু লোকে জানে না। কিছু জানে কিছু থেকে যায় অগোচোরে। আর এই দোটানা পরিস্থিতিতে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে অবস্থান করে সেই নায়িকা। রিংকু নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতে থাকে এই ভেবে যে, সে এমন একজন মানুষকে ভালোবেসেছে যার বিরুদ্ধে সকলে একজোট হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাকে সকলে মূল্য দিতে চাইছে। কেবল মূল্যবানদের পিছনেই মানুষ নিজের মূল্যবান সময় খরচ করে। এমন বিরোধিতা তো শক্তিমানদের নিয়েই করে মানুষ। তুচ্ছ হলে তো তার জন্য কেবল উপেক্ষাই যথেষ্ট। বিষ্ণুর নামটি অন্যদের কানে যতই বিষ ঢালছে রিংকু আকন দিনে দিনে বিষ্ণু প্রেমে আকুল হয়ে উঠছে। অন্যদিকে এত কথা, এত আলাপের মুখেও চুপ থেকে রিংকু আকনের দায় বাড়িয়ে চলেছে বিষ্ণু। সে তো এসব নিয়ে কাউকে কোনো প্রতিবাদও করতে বলছে না, নিজেও করছে না। অবশ্য নিজে প্রতিবাদ করার সাধ্য ও আগ্রহ কোনোটিই নেই তার। বিষ্ণুর এই নীরবতা কেবল হিরন্ময় হয়ে উঠছে। প্রতি মুহূর্তে। প্রতিক্ষণে।
কারবারি রিংকু আকন বুঝতে পারলো দিলীপ পাল ও বিষ্ণুর পূর্ব বৃত্তান্ত জানতে অন্য কারবারিদের কথায় নির্ভর করা চলবে না। সে নিজেই দিলীপদের বৌ বিষ্ণুর দ্বারস্থ হলে বিষ্ণু এইসব নিয়ে কথা বলতে আগ্রহ দেখালো না। বিষ্ণু কেবল বলল, এসব আমার আগের জন্মের ঘটনা। এসব নিয়ে আমি কতা কইতে চাইনা। রিংকু বলল, আমি তোমার জন্য দেওয়ানা অইছি। আল্লার কসম, আমারে তুমি সব ঘটনা কও। মানুষ আমার কান ঝালাপালা কইরা দিচ্ছে। রিংকুর কথায় পাত্তা দেয়না বিষ্ণু। সে কেবল বলে, মানুষের কতা শুনতে গেছেন যহন তহন আবার আমার কাছে আইছেন ক্যান। রিংকু সোজা-সরল ছেলে। যেকোনো বিষয়ে সে উদগ্রীবও। কোনো কিছুতে তার বিলম্ব সয় না। কোনো কিছু জানতে বা পেতে চাইলে যেন এখনই সব হতে হবে—এই নেশা তাকে ডুবিয়ে মারে। সে বিষ্ণুকে বলে, তুমি যদি তোমার মনে আমার জন্যি এতটুকু প্রেম রাহো তাইলে কও কি অইছিলো হেই সময়। রিংকুর দিকে চেয়ে বিষ্ণু বলল, এহন ডাওর। বৃষ্টির শব্দে কোনো কিছু ঠাওর অয় না। হেইডাও বর্ষাকাল আছিল। আমরা প্রেমে পড়ছিলাম। দিলীপ পাল আর আমি। বর্ষাকালীন রণনীতির প্রেমে। দিলীপ একদিন আমারে আইসা কইলো, এই সমাজ বদলাইতে অইব। মহাজন আর মজুতদারগো হাতে সব ধান থাকলে চলবো না। যারা অনাথ, তিনবেলা খাইতে পায় না—তাগো জন্যি কিছু করতে অইব।
রিংকু বিষ্ণুর কথায় অবাক হলো। এসব কথা সে কোনোকালে শুনেছে বলে মনে করতে পারল না। সে অবাক বিস্ময়ে কেবল বলল, দিলীপ পাল এসব কতা কোথায় পেল। বিষ্ণু ফের বলতে শুরু করল, দিলীপ ছিল সৎ প্রতিবাদী। সিনিয়ার লোকজন তারে খুঁইজা বাইর করছে—এই এলাকায় সৎ প্রতিবাদী কারা আছে। বিষ্ণু ফের একাই ধীরে ধীরে বলে গেল—ডাওর আমাগো প্রেমের কাল। এই ডাওর আমারে আর দিলীপরে প্রেমের জোয়ারে ভাসায় নিছে।
রিংকু আর দিলীপের মধ্যে বিরাট ব্যবধান। দিলীপ পাল শক্ত মানুষ। কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই মানুষের জন্যই সে প্রাণ দিয়েছে। নিজের স্ত্রীকে নিয়ে বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর দিলীপ পাল সাধ্যমতো ছুটে গেছে বনে-জঙ্গলে। শেষ পর্যন্ত সে লড়াকু। অন্যদিকে রিংকু আকন জীবন সম্পর্কে উদাসীন এক ছেলে। পিতৃ আদেশ তাকে এখানে টেনে এনেছে। দিলীপের লড়াই যাদের বিরুদ্ধে ছিল—রিংকু তাদেরই একজন। বাইরের পৃথিবী তার কাছে খেলার বস্তুমাত্র। তবু অল্প কিছুদিনের চেনাজানায় বিষ্ণু তাকে ঘোরের মধ্যে ফেলেছে। রিংকু বিষ্ণুকে বলল, এই বৃষ্টির কালে চলো, তুমি আর আমি ফের অভিযানে যাই, যে অভিযান এহনো শ্যাষ অয় নাই। তার চোখে-মুখে সিরিয়াস ভঙ্গি। কণ্ঠে বিপুল শক্তি। বিষ্ণু বুঝতে পারল না, রিংকু কার প্রেমে পড়েছে—বিষ্ণুর না বিপ্লবের।
চলবে









