সমকালীন বিশ্বসাহিত্য

অ্যান্টি লাইব্রেরি

রিটন খান
১৬ অক্টোবর ২০২৫, ১৩:২২আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৫, ১৩:৩১

বইয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা অনেকটা আসক্তির মতো। বইয়ের দোকানে ঘুরতে গেলে প্রায়ই কম করে হলেও তিনটি বই কিনে ফেলি, যেগুলো দোকানে ঢোকার সময় আমার কল্পনাতেও থাকে না। লাইব্রেরির পুরোনো দোকানে গেলে ব্যাগভর্তি পুরোনো বই কিনে আনি, আর পাড়ার যেকোনো বুক এক্সচেঞ্জ ইভেন্ট দেখলেই ভেতরে উঁকি দিই। পুরোনো বইয়ের সেই হালকা ভ্যানিলা-গন্ধ, পাতা উলটালেই যা মাটির মতো শ্বাস নিয়ে ওঠে—তা আমাকে অদ্ভুতভাবে বেঁধে ফেলে।

কিন্তু সমস্যা হলো, বই সংগ্রহের এই প্রবণতা আমার পড়ার ক্ষমতার চেয়েও অনেক দ্রুতগামী। ফলে বুকশেলফে অগণিত অপঠিত খণ্ড জমে থাকে, একইসঙ্গে জন্মায় অপরাধবোধও। হয়ত এই অপরাধ বোধ করাটাই ভুল। পরিসংখ্যানবিদ নাসিম নিকোলাস তালেব বলেছেন, এই অপঠিত বইগুলো আসলে এক ধরনের ‘অ্যান্টি লাইব্রেরি’—এবং তিনি মনে করেন এগুলো আলস্যের নয়, বরং জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

এই ধারণা তিনি প্রথম বিশ্লেষণ করেন তার বিখ্যাত বই ‘The Black Swan’-এ। তালেব সেখানে উমবের্তো একোর কথা টানেন—যার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ছিল প্রায় ত্রিশ হাজার বই। অতিথিরা চমকে যেতেন তাকের পর তাক বই দেখে, ধরে নিতেন একোর বিশাল জ্ঞান সঞ্চয়। কিন্তু বুদ্ধিমানরা বুঝতে পারতেন বইয়ের প্রাচুর্য আসলে তার অজানা বিষয়গুলির প্রতি আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ। একো নিজেও হিসাব কষে দেখেছিলেন—যদি দিনে একটা করে বই পড়া যায়, তবুও আশি বছরে সর্বোচ্চ পঁচিশ হাজার বইয়ের বেশি পড়া সম্ভব নয়। অথচ যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতেই রয়েছে অন্তত এক মিলিয়ন বই।

পরিসংখ্যানবিদ নাসিম নিকোলাস তালেব
তালেব বলেন, পড়া বই নয়, না-পড়া বই-ই বেশি মূল্যবান। আমাদের নিজেদের লাইব্রেরি যতটা সম্ভব আমাদের অজ্ঞতার প্রতিফলন হওয়া উচিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানের ভান্ডার বাড়বে, কিন্তু তাক ভর্তি অপঠিত বই আমাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে কতটা অজানা রয়ে গেছে।

মারিয়া পোপোভা সুন্দরভাবে বলেছিলেন, আমরা সাধারণত নিজের জ্ঞানের দাম বাড়িয়ে দেখি, অজ্ঞতার দাম কমিয়ে দিই। তালেবের ‘অ্যান্টিলাইব্রেরি’ সেই হিসেবটাই উল্টে দেয়। আমার নিজের তাকও আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় আমি সবকিছুতেই অজ্ঞ।

তালেব লিখেছেন, আমরা জ্ঞানকে অলংকারের মতো ব্যবহার করি, যা সামাজিক অবস্থান বাড়ায়। অথচ একোর লাইব্রেরির মূল শিক্ষা হলো, অজানা বিষয়গুলোই আসল সম্পদ। সেই অজানাই আমাদের পড়তে বাধ্য করে, শেখাতে থাকে, আর এক ধরনের বৌদ্ধিক বিনয় জাগিয়ে তুলে।

যারা নিজেদের সংগ্রহকে পুরোপুরি পড়ে ফেলতে পেরেছে বলে গর্ব করে, তাদের লাইব্রেরি আসলে মৃত সংগ্রহশালা—শুধু অহংকার মেটানোর জন্যই রাখা। কিন্তু অপঠিত বইয়ের সারি বেঁচে থাকে এক জীবন্ত প্রতিশ্রুতি হয়ে—আমাদের শেখার বয়স শেষ হয়নি।

তবে ‘অ্যান্টি লাইব্রেরি’ শব্দটা আমার কাছে খানিকটা কাঠখোট্টা লাগে। ড্যান ব্রাউন ধরনের কোনো উপন্যাসে মানিয়ে যায় বটে। আমার মতে, বইয়ের তাক মানেই তো অনেক অপঠিত বইয়ের ভিড়। আলাদা নামের কী প্রয়োজন? আমি বরং জাপানি শব্দ ‘ৎসুনদোকু’ ব্যবহার করতে পছন্দ করি। যার অর্থ না-পড়ে অজস্র বই কিনে রেখে দেওয়া। উনিশ শতকের শেষ দিকে এই শব্দটি তৈরি হয়েছিল ব্যঙ্গ করে, বই কিনেও যারা পড়ে না, তাদের খোঁচা দেওয়ার জন্য। যদিও তালেবের বক্তব্যের বিপরীতে তৈরি হয়েছিল, আজকের জাপানি সংস্কৃতিতে এর কোনো নেতিবাচক মানে নেই।

অ্যান্টি লাইব্রেরি
‘ৎসুনদোকু’ আর ‘বিবলিওম্যানিয়া’-এর পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো ভবিষ্যতের পড়াশোনার সম্ভাবনা, দ্বিতীয়টি কেবল সংগ্রহের নেশা। বেশিরভাগ বইপ্রেমী অবশ্যই পড়েনও। গবেষণাতেও দেখা গেছে—যেসব শিশু বই ভরা ঘরে বড় হয়, তাদের সাক্ষরতা, গণনা, প্রযুক্তি বোঝার ক্ষমতা সবই বাড়ে।

আরও নানা গবেষণা বলছে—পড়াশোনা মানসিক চাপ কমায়, সহমর্মিতা বাড়ায়, জটিল সামাজিক দক্ষতা তৈরি করে। নন-ফিকশন আবার সাফল্য ও আত্মজ্ঞান আনে। জেসিকা স্টিলম্যান এক নিবন্ধে বলেছেন—এই না-পড়া বইগুলো আসলে ‘ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট’-এর বিপরীতে কাজ করে। আমরা যত বেশি নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করতে পারি, ততই প্রকৃত শিক্ষার কাছে পৌঁছে যাই।

শেষ পর্যন্ত নাম যাই হোক—‘অ্যান্টি লাইব্রেরি’, ‘ৎসুনদোকু’, বা অন্য কিছু—অপঠিত বইয়ের আসল মূল্য হলো আমাদের পড়ার তাগিদ জাগিয়ে তোলা।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম