ধারাবাহিক উপন্যাস ।। পর্ব—৫

হিমপ্রহরী

আলম শাইন
০৩ মার্চ ২০২৬, ০২:০০আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০২:০০

পাঁচ
ভোরের আলো ফুটতেই তিলক লিম্বু অভিযাত্রীদের তাঁবুর সামনে এলো। সঙ্গে ছিল তার বিশ্বস্ত সহকারী লাকপা শেরপা। দুজনের মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখ লালচে ফোলা ফোলা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে রাতে তারা ভালোমতো ঘুমাতে পারেনি।

ইখতিয়ার হামিম তাদের দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাতে ঘুমাওনি? চোখ-মুখ এত ফোলা কেন?’

তিলক মাথা নেড়ে উত্তর দিলো, ‘ঘুমাতে পারলাম কোথায় দাই! সারারাত ভয়ে ভয়ে কাটালাম। চোখের পাতা এক মিনিটের জন্যেও জড়ো হয়নি।’

তিলক লিম্বু কথার বলার সময় লাকপা শেরপা চুপ রইল। ভাবটা এমন যে, মনে হচ্ছে ভয়ের আসল কারণটা লাকপা ভালো করেই জানে। রাতের অদৃশ্য ঘটনার সাক্ষী সে, কিন্তু মুখে কিছু বলতে ভয় পাচ্ছে; অজানা কোনো শক্তি তাকে চেপে ধরেছে; তাই সে নীরব রইল।

ইখতিয়ার হামিম বিষয়টা লক্ষ্য করলেন। তিনি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীসের ভয়? শরীরে রোগ হলে ওষুধে সারানো সম্ভব। মনের ভয়ের ওষুধ নেই, জেনে রেখো তিলক।’

তিলক লিম্বু চুপ করে বসে রইল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে ইখতিয়ার বুঝলেন, সে আর আগের অবস্থানে নেই। তার ভেতরে টানাপড়েন চলছে, বিষয়টা ভালো করেই উপলব্ধি করলেন ইখতিয়ার হামিম। পর্বতের ভয়াবহ বিপদের চেয়ে বাস্তব জীবনের চিন্তাই তাকে দুর্বল করে তুলেছে। সংসারের খরচ, রুটি-রুজির চিন্তা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

ইখতিয়ার বুঝতে পারলেন, যদি সাংসারিক চিন্তা না থাকত, তাহলে তিলকের আচরণ হতো অন্যরকম। হয়তো তখন অভিযাত্রীদের সামনে এসে এতটা নম্রতা দেখাত না। বরং নিজের অভিজ্ঞতা, সাহস আর নেতৃত্বের বড়াই করার চেষ্টা করত। অথচ এখন তার চোখে-মুখে সেই আত্মবিশ্বাস নেই; একরাতেই উধাও হয়ে গেছে সব।

ইখতিয়ার তিলকের ভেতরের দুর্বলতা খুব ভালোভাবেই টের পেলেন। মনে মনে ভাবলেন, এটাই তার জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। তিলক ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছে, তাকে রাজি করানো অনেকটাই সহজ হবে এখন। যদি তিনি নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন, তাহলে তিলক ‘না’ শব্দটা উচ্চারণ করতে পারবে না।

গতরাত ইখতিয়ার ইচ্ছে করেই তিলকের সেই স্পর্শকাতর জায়গায় টোকা দিয়েছিলেন। জীবিকার কথা, রুটি-রুজির চিন্তা তুলে এনে তিনি তিলককে আরো নরম করে ফেলেছেন। তিলক জানে, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত; তাই ইখতিয়ারের কথার বিরোধিতা করার সাহস পাচ্ছে না।

ইখতিয়ার ভালো করেই জানেন, এই অভিযানে শেরপাদের নিয়ন্ত্রণে না রাখলে সামনে এগোনো মোটেও সম্ভব নয়। কারণ পর্বতের পথে প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। পথ চিনে নেওয়া থেকে শুরু করে খাবার, অক্সিজেন, এমনকি বিপদের মুহূর্তে বাঁচার উপায়—সবকিছুতেই শেরপাদের প্রয়োজন হয়।

তাই তিলককে নিজের পাশে রাখা ছাড়া ইখতিয়ারের সামনে অন্য কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। যদিও তিলকের আচরণ মাঝে মাঝে তাকে দ্বিধায় ফেলে, তবুও তিনি জানেন শেরপাদের ছাড়া এই অভিযাত্রা সম্পন্ন করা অসম্ভব। শেরপাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতেই হবে, না হলে বিপদ অনিবার্য।

ইখতিয়ার নরম চোখে তিলকের দিকে তাকালেন জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে। তিলক মাথা নিচু করে বলল, ‘আমাদের সিদ্ধান্তটা জানাতে এসেছি দাই।’

‘জানাও।’

তিলক কথা না ঘুরিয়ে সরাসরি বলল, ‘শেরপারা তোমাদের সঙ্গেই থাকবে, তবে একটা শর্ত আছে...।’

‘শর্তটা জানাও; সম্ভব হলে মেনে নেব।’

‘তারা চূড়ার একশ মিটার নিচে থেমে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। উপরের দিকে তোমরাই সামিট করবে।’

‘শর্তটা মানার মতো। তোমাদের বিশ্বাসকে সম্মান করি। আরও কোনো শর্ত থাকলেও জানাতে পারো।’

এবার লাকপা শেরপা মুখ খুলল, ‘আর কোনো শর্ত নেই। আপাতত এই শর্তটাই মানলে তোমাদের সঙ্গে থাকতে আপত্তি নেই কারো।’

ইখতিয়ার হাসিমুখে বললেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমরা একসঙ্গে এগোবো। তোমরা আমাদের পাশে থাকলেই সাহস পাব।’

শেরপারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেও ইখতিয়ার বুঝতে পারলেন, তাদের সেই সম্মতি অন্তর থেকে নয়, শুধুই মুখের কথা। মন থেকে তারা অভিযাত্রীদের পাশে নেই; এটাই সত্যি। চোখে-মুখে অনিচ্ছার সেই ছাপ ফুটেও উঠেছে; বোঝাই যাচ্ছে, বাধ্য হয়েই রাজি হয়েছে তারা।

ইখতিয়ার তাদের সেই অনিচ্ছাটা প্রকাশ করতে দিলেন না। না জানার ভান করলেন। তিনি জানেন, এই ভয়ংকর অভিযানে শেরপাদের সহযোগিতা ছাড়া এক পা-ও এগোনো সম্ভব নয়। পর্বতের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ফাটল সম্পর্কে শেরপাদের ধারণা রয়েছে। তাই ইখতিয়ার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, যত চাপই আসুক শেরপাদের সঙ্গে নিয়েই এই অভিযাত্রাকে সফল করতে হবে।

এদিকে গত কয়েকদিন ধরে অভিযাত্রীরা তাঁবুর ভেতরে একরকম আটকেই ছিল। বাইরে আবহাওয়া এতটাই খারাপ ছিল যে, উপরের দিকে ওঠার কল্পনাও করা যায়নি। তুষারঝড় আর প্রচণ্ড ঠান্ডা অভিযাত্রীদের পথচলা থামিয়ে দিয়েছিল। টানা তিনদিন তাঁবুর ভেতরে বসে তারা শুধু অপেক্ষা করেছিল, কবে আবহাওয়া শান্ত হবে আর তারা উপরের দিকে উঠতে পারবে।

আজ আবহাওয়া অনুকূলে আসতেই অভিযাত্রীরা বুঝল আর দেরি করা যাবে না। তাই দলের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করল। বিশেষ করে অক্সিজেন, দড়ি, কুঠার আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলো তাৎক্ষণিক।

মাছাপুচ্ছ্রের শৃঙ্গে ওঠা কঠিন একটা কাজ। এখানে শুধু নামেই বেসক্যাম্প আছে, উপরের দিকে আর কোনো ক্যাম্প নেই। বেসক্যাম্প ছেড়ে একবার উঠতে শুরু করলে মাঝপথে থামার সুযোগ নেই। থামতে হলে নিজেরা তাঁবু খাটিয়ে নিতে হয়। সে অনেক কঠিন কাজ। সোজা কথা বিশ্রাম নেওয়ার মতো নিরাপদ তেমন কোনো জায়গা নেই মাছাপুচ্ছ্রের পথে।

সব প্রস্তুতি শেষে ধীরে ধীরে তারা পা ফেলল উপরের দিকে উঠতে। যতই উপরের দিকে উঠছে বাতাস ততই পাতলা হয়ে আসছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবু তারা থামছে না, একে অপরকে সাহস দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।

উপরে ওঠার পর অভিযাত্রীদের প্রথম কাজ হলো নিরাপদ জায়গা খুঁজে তাঁবু খাটানো। কাজটা খুব কঠিন না হলেও এতে অনেকটা সময় আর শক্তি নষ্ট হয়। তাছাড়া এত উঁচুতে প্রতিটি মুহূর্তই খুব মূল্যবান, তাই অযথা সময় নষ্ট করা যায় না।

এখানে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা খুবই কম। তাদের সঙ্গে আছে সীমিতসংখ্যক অক্সিজেন সিলিন্ডার, যা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই চলবে। তাই সবাই জানে যত দ্রুত সম্ভব শীর্ষে উঠে আবার নিচে ফিরতে হবে।

পর্বতারোহীদের আসল লক্ষ্য শুধু চূড়ায় ওঠা নয়, বরং নিরাপদে ফিরে আসা। কারণ চূড়ায় পৌঁছানোই শেষ কথা নয়—সত্যিকারের সফলতা হচ্ছে সুস্থভাবে আবার বেসক্যাম্পে ফেরা। ফলে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয় মাথা ঠান্ডা রেখে, আবেগের স্রোতে ভেসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেই সিদ্ধান্তের ফলাফলও ভালো হয় না; মারাত্মক কিছু ঘটতে পারে।

কয়েকদিন আগে অভিযাত্রীরা শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে তাঁবু থেকে আরও দেড়শ মিটার উপরে উঠেছিল। তারপর আবার তাঁবুতে ফিরে এসেছে। এই কাজটা পর্বতারোহীদের ইচ্ছে করেই করতে হয়। না হলে মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, এমনকি প্রাণহানিরও ঝুঁকি থাকে। এই নিয়মের মানে হলো শরীরকে ধীরে ধীরে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। তাই এই অলিখিত নিয়ম সবাইকে মানতে হয়।

এইভাবে কয়েকদিন ধরে ওঠা-নামা করেই তারা নিজেদের প্রস্তুত করবে। যাতে চূড়ান্ত দিনে যখন শীর্ষে ওঠার চেষ্টা করবে, তখন শরীর আর মন দুটোই দৃঢ় থাকে। এই কঠিন নিয়ম মানা ছাড়া পর্বতারোহিদের বেঁচে থাকার সুযোগ নেই।

গতকাল সন্ধ্যার তুলনায় আজকের আবহাওয়া অনেকটাই ভালো। চারপাশের পরিবেশ এখন শান্ত, মনে হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগই ঘটেনি। অথচ গত রাতেই তুষারঝড় পুরো পর্বতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেই ঝড়ের তাণ্ডব এতটাই প্রবল ছিল যে, তাঁবুর ভেতর থেকেও নিরাপত্তহীনতা ভুগেছে দলের সবাই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ সকালে বাইরে তাকাতেই সেই দুর্যোগের কোনো চিহ্নই চোখে পড়েনি।

আসলে পর্বতের ঝড় যতই ভয়ংকর হোক, তা বোঝা অত সহজ নয়। এখানে নেই গাছপালা, নেই পশুপাখি বা মানুষের বসতি। সমতলে ঝড়ের পর ভাঙা ডাল, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি বা আহত প্রাণী দেখে ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। পর্বতে তেমন কোনো চিহ্নই থাকে না। বরফে ঢাকা এই নির্জন জায়গায় ঝড় থেমে গেলে চারপাশ আবার আগের মতো শান্ত হয়ে যায়। তাই বাইরে তাকিয়ে বোঝাই যায় না যে, বড় ধরনের কোনো দুর্যোগ বয়ে গেছে।

তুষারঝড়ের মতো ভয়াবহ বিপদের পাশাপাশি পর্বতের আরেকটি বড় বিপদ হচ্ছে লুকিয়ে থাকা ফাটল। এই ফাটলগুলো অনেক সময় বিশাল আকারের হয়, অথচ বাইরে থেকে তা বোঝারই উপায় নেই। কারণ বরফের স্তূপ জমে গিয়ে ফাটলগুলো ঢেকে ফেলে। দূর থেকে তাকালে মনে হয় শক্ত বরফের মেঝে ছড়িয়ে আছে। আসলে সেই বরফের আবরণের নিচে লুকিয়ে থাকে গভীর গর্ত, যা চোখে ধরাই পড়ে না।

এই গর্তে যদি কেউ অসাবধানতাবশত পা দেয়, তবে মুহূর্তের মধ্যে সে গভীর খাদে পড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই পর্বতারোহীরা সবসময় কোমরে দড়ি বেঁধে দলগতভাবে এগোয়। এতে যদি কেউ ফাটলে পড়েও যায়, অন্যরা তাকে যেন টেনে তুলতে পারে। একা চললে এই কঠিন বিপদ থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকে না।

চারজন শেরপা প্রয়োজনীয় খাবারসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি নিয়ে উপরে উঠছে। দলের সামনে হাঁটছে অভিজ্ঞ নেতা তিলক লিম্বু। সে পথ দেখাচ্ছে, যদিও এই জায়গাটা তার কাছেও অচেনা। তবুও দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিলক সামনে এগোচ্ছে।

অভিযাত্রীরা কোমরে দড়ি বেঁধে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হাঁটছে। কারণ চূড়ার দিকে ওঠার পথ খুবই খাড়া আর পিচ্ছিল। তাই প্রতিটি পদক্ষেপে তারা সাবধানে পা ফেলছে।

অভিযাত্রীরা এর আগে বহু শৃঙ্গ জয় করেছে, কিন্তু মাছাপুচ্ছ্রের মতো ভয়ানক পথ তারা কখনো অতিক্রম করেনি। এখানে পা রাখতেই তারা বুঝতে পারল এই শৃঙ্গে ওঠা নাঙ্গা পর্বতের চেয়েও কঠিন। প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে আছে বিপদ, প্রতিটি বাঁকে অজানা আতঙ্ক। তবুও তারা থামেনি। সাহস নিয়ে মাথা ঠান্ডা রেখে এগিয়ে চলেছে।

বেশ কিছুক্ষণ পরিশ্রমের পর তারা উপরে উঠতে সক্ষম হয়েছে। উপরে পা রাখতেই যেন এক অচেনা জগতের দরজা খুলে গেল তাদের সামনে। চারদিকে বরফে মোড়া নির্জন ভূমি—যেখানে আজ পর্যন্ত কোনো পর্বতারোহীর পদচিহ্ন পড়েনি। সেই অস্পর্শিত শূন্যতায় দাঁড়িয়ে তাদের মনে হলো, পৃথিবীর সীমা পেরিয়ে তারা পৌঁছে গেছে এক অজানা দুনিয়ায়।

এই অজানা দুনিয়ায় শুধু একবার এসেছিলেন এক ব্রিটিশ অভিযাত্রীদল। ১৯৫৭ সালে সেই অভিযাত্রী তার দল নিয়ে একবার শীর্ষে উঠেছিলেন। তবে এ উচ্চতা পর্যন্ত উঠেছেন কিনা তা অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এরপর নেপাল সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে আর কেউ এখানে আসতে পারেনি। সেই থেকে মাছাপুচ্ছ্রের পথ, আবহাওয়া আর বরফে ঢাকা ফাটলগুলো অজানাই রয়ে গেছে। কোথায় গভীর খাদ লুকিয়ে আছে, তা কেউ-ই জানে না।

প্রায় দুই ঘণ্টা অতিক্রম করার পর অভিযাত্রীদের সামনে পড়ল বিশাল এক খাড়া বরফের দেওয়াল। দেওয়ালটা এতই উঁচু যে ওটাকে অতিক্রম করা সহজ মনে হয়নি। অথচ এই বরফের দেওয়াল বেয়েই তাদের উপরে উঠতেই হবে। তাই সবাই একসঙ্গে বসে আগে পরিকল্পনা করল এই মুহূর্তে কী করার আছে তাদের।

আলোচনার পর ঠিক হলো, প্রথমে লাকপা শেরপা ওপরে উঠবে টপ রোপ অ্যাঙ্কর বসাতে। যাতে লম্বা দড়ি বেঁধে দিতে পারে অ্যাঙ্করে। একজন উপরে উঠতে পারলে বাকিরা তার সাহায্যে নিরাপদে উঠতে পারবে।

শেরপারা বরফের দেওয়ালে নিরাপদ জায়গা খুঁজে খুঁজে অ্যাঙ্কর বসাচ্ছে। অন্যরা দড়ি গুছিয়ে নিচ্ছে। চারপাশ নীরব-নিস্তব্ধ, শুধু বরফের দেওয়ালে হাতুড়ির আঘাতের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পর্বতের গায়ে।

নবগুলো গাঁথতে গাঁথতে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। টানা পরিশ্রমে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। শরীর অসাড় হয়ে এসেছে, আর পারছে না কাজ চালিয়ে যেতে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে নব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের খাড়া বরফের দেওয়াল। দেওয়ালটা এতই খাড়া যে সেখানে উঠতে গেলে প্রচুর শক্তি আর মনোবলের দরকার। এই মুহূর্তে দুটি জিনিসেরই অভাব আছে অভিযাত্রীদের।

তিলক লিম্বু চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল, আজ আর এগোনো সম্ভব নয়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে এই বরফের দেওয়াল বেয়ে ওঠা মানে ভীষণ ঝুঁকি নেওয়া। তাছাড়া উপরে উঠে তাঁবু খাটানোও প্রায় অসম্ভব। যেখানে বরফের দেওয়ালের সামনে দাঁড়ানোই কঠিন, সেখানে তাঁবু খাটানো অকল্পনীয় বিষয়। অবশ্য উপরে উঠলে একটা ব্যবস্থা করা যাবে; তবে সেটা আজ আর সম্ভব নয়।

তিলক সিদ্ধান্ত দিলো, আজকের মতো এখানেই বিরতি নিতে হবে। নিরাপদ জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। শক্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত সামনে এগোনো অসম্ভব।

অভিযাত্রীরা তিলকের সিদ্ধান্ত মেনে নিলো। কারণ শেরপা সরদারের কথা সবার কাছে শেষ কথা, সেটাই চূড়ান্ত ধরা হয়। তাই তিলকের প্রস্তাব সবাই স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করল, এতে কেউ কোনো আপত্তি তোলেনি। ঠিক হলো, বরফের উঁচু দেওয়ালের নিচের দিকে যে সমতল জায়গাটা আছে, সেখানেই আজ তাঁবু খাটানো হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাই একে একে নিচে নেমে এলো।

নিচে নেমে শেরপারা বরফের ওপর জায়গা পরিষ্কার করে তাঁবু খাটানোর কাজে লেগে গেল। দড়ি টেনে তাঁবুগুলো শক্ত করে বাঁধল, যাতে হঠাৎ বাতাস এলেও তা উড়ে না যায়। সবাই মিলে কাজ করায় বেশি সময় লাগেনি। তাঁবু টানানো শেষ হতেই অভিযাত্রীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, যাক নিরাপদে রাত যাপন করতে পারবে তারা।

আজকের আবহাওয়া অনেকটাই শান্ত। সাধারণত পর্বতে হঠাৎ তুষারঝড় নেমে আসে, কিংবা তীব্র ঠান্ডায় শরীর জমে যায়। আজ এখনো তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। শৃঙ্গের গায়ে সূর্যের আলো ঝলমল করছে, বরফের সাদা চাদর আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দূরে পর্বতের গা বেয়ে নামা হালকা তুষারকণা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

এই শান্ত পরিবেশটাকে উপভোগ করতে অভিযাত্রীরা তাঁবুর ভেতরে বসে পড়ল তাসের প্যাকেট নিয়ে। হাসি-ঠাট্টা আর খেলায় সময় কাটতে লাগল তাদের। ওদিকে শেরপারা দ্রুত রান্নার কাজ শেষ করে ফেলল। গরম ভাত, ডাল আর সবজির গন্ধে পুরো তাঁবুর আশপাশ ভরে গেল। সেই গন্ধে সবাই আরও ক্ষুধার্ত হয়ে উঠল।

খাবার প্রস্তুত হওয়া মাত্রই সবাই তাস গুটিয়ে সামিয়ানার নিচে বসে পড়ল সারিবদ্ধ হয়ে। গরম খাবারের স্বাদ তাদের ক্লান্তি দূর করে দিলো। দিনের সব ক্লান্তি, ভয় আর চাপ সব ভুলে গেল তৃপ্তিসহকারে খাবার খেয়ে।

তারপর সবাই নিজেদের স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়ল। শরীর গরম হতেই আরামে চোখের পাতা জড়ো হয়ে এলো।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
এক অদ্ভুত আবাসিক ভবন ‘কুনশানের পিরামিড’
এক অদ্ভুত আবাসিক ভবন ‘কুনশানের পিরামিড’
ঢাকার আকাশ আজ আংশিক মেঘলা থাকলেও আবহাওয়া কেমন যাবে 
ঢাকার আকাশ আজ আংশিক মেঘলা থাকলেও আবহাওয়া কেমন যাবে 
৩-০ গোলে এগিয়ে বিরতিতে ব্রাজিল 
৩-০ গোলে এগিয়ে বিরতিতে ব্রাজিল 
যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদে মুসল্লিদের জন্য খেজুর, বিস্কুট আর পানিও আছে
যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদে মুসল্লিদের জন্য খেজুর, বিস্কুট আর পানিও আছে
সর্বাধিক পঠিত
আলোচিত প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ করায় কারাগারে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আলোচিত প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ করায় কারাগারে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনে ডিসিকে ফোন করলেন প্রধানমন্ত্রী
ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনে ডিসিকে ফোন করলেন প্রধানমন্ত্রী
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী হারুনের জানাজা অনুষ্ঠিত
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী হারুনের জানাজা অনুষ্ঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো কেমন চলছে? 
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো কেমন চলছে?