পোলিশ আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব

কবিতায় হেমন্তের ঘ্রাণ ।। পর্ব—৪

হাসানআল আব্দুল্লাহ
১১ জুন ২০২৬, ১৭:৪০আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ১৭:৪০

ক্যাতারজিনার ছোটো বোন ভার্জিনিয়া ইউথ এ ডব্লিউ, কারণ এখানে ডব্লিউয়ের উচ্চারণ ভি।

       পোলিশ অ্যালফাবেটে বেশ কয়েকটি একসেন্টেড অক্ষর আছে। যেমন জে-এর উচ্চারণ হলো আই। ঔবংঃ–জেস্ট নয়, বরং ইয়েস্ট মানে হলো ইজ বা হয়। টো ইয়েস্ট ডোম। এটা একটা বাড়ি। ক্যাতারজিনা আমাকে আরো শিখিয়েছেন যে এল এর মাথা কাটা থাকলে উচ্চারণ উয়হ। তো, ভার্জিনিয়ার পরিবারটি বেশ বড়ো, তিন ছেলে এক মেয়ে। বড়ো ছেলে বিয়ে করেছেন, তার একটি বাচ্চাও আছে যার নাম লিলি—ওরা আদর করে বলেন লিয়ানস্কা! বয়স ছয় মাস। একজনের কোল থেকে অন্যজনের কোলে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। দ্বিতীয় ছেলেরও গার্লফ্রেন্ড এসেছে। এমনকি আজকের যে বার্থডে বেবি তারও বয়ফ্রেন্ড দেশের অন্যপ্রান্ত থেকে গাড়ি চালিয়ে এসেছে। ছেলেটির বয়স হয়ত ষোলো কি সতেরো হবে। আমেরিকাতে তো ষোলো হলে বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাওয়া যায়, এখানেও হয়ত তেমনই নিয়ম। পুরো একটি আর্টিস্টিক পরিবার। সবাই-ই কিছু না কিছু গান, গিটার বাজানো, পিয়ানো বাজাতে জানে। ভার্জিনিয়া বেশ ভালো পেইন্টার, আবার চমৎকার কিছু স্কালচার তৈরি করেছেন। এর মধ্যে একটা নির্মাণাধীন, আমাকে বললেন সেটা ক্যাতারজিনার জন্যে সারপ্রাইসড। অতএব বুঝলাম, খাবারের পরে আমাকে দোতলায় পেইন্টিং দেখাতে নিয়ে গেলে কেনো ক্যাতারজিনাকে সঙ্গে নিলেন না।

        ওদিকে ক্যাতারজিনার বাবাও এসেছেন। স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে প্রায় ত্রিশ বছর আগে। তার পরে তিনি দুটি বিয়ে করেছেন, তবে প্রত্যেকটি থেকেও ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়ে এখন একা একা থাকেন। ক্যাতারজিনা বললেন, “মা কোথাও গেলে, তার কুকুরটির দেখা শোনা এখন বাবাই করেন।”

        আমি বললাম, “তাহলে তো বেশ ভালো, অন্তত বন্ধুত্বের সম্পর্কটি পুনরুদ্ধার হয়েছে।”

        “দু’জনেরই বয়স হয়েছে।” গাড়িতে ফিরতে ফিরতে ক্যাতারজিনা বললেন, “তাছাড়া তাঁদের যে তিনটি ছেলে-মেয়ে রয়েছে একত্রে, আমি আমার বোন ও একটি ভাই, তাদের কোনো অকেশনে তো দু’জনকেই আসতে হয়। বাবা একসময় আসতেন না, কিন্তু আমরাই বছর কয়েক আগে উদ্যোগী হয়ে তাঁকেও আমাদের পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য করেছি।”

        বাসায় ঢুকে কুশল বিনিময় সেরে খাবার টেবিলে বসার আগেই ক্যাতারজিনার ছেলে তার গার্লফ্রেন্ড নিয়ে হাজির। ছেলেটি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “হাই, হাসানআল, কেমন আছেন?” গতবছরই ওর সাথে ভ্রসলোভ একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁয় আমরা একত্রে ডিনার করেছিলাম। পরে নাকি সে মাকে বলেছে, “কবি সম্পর্কে তুমি যা বলেছো তিনি তার থেকেও ভালো মানুষ!” এটা আমার সৌভাগ্যই বলতে হয়। আমি এই পরিবারের সবার বন্ধু। কবি হিসেবে এদেশে এসে অনেকেরই বন্ধু হয়ে গেছি। তবে এই পরিবারটি, ক্যাতারজিনা, আমার অনুবাদক হিসেবে, আমাকে একেবারে ঘরের ছেলের মতো আপন করে নিয়েছে। গতবছর তাঁর মায়ের বাসায়ও একদিন দুপুরে খেয়েছি। এবছরও মায়ের জন্যে চিহানোভ থেকে আমি ও ক্যাতারজিনা বাজারে ঘুরে একটি গিফট কিনে এনেছি। সেটি হলো তাঁর চশমার খাপ। ক্যাতারজিনা বলেছিলেন যে মায়ের এই খাপটি দরকার। তাঁর নিজেরটি খুঁজে পাচ্ছেন না। মাত্র ৫০ স্লটে, মানে বারো ডলার দিয়ে আমরা যে খাপটি কিনেছিলাম তার উপরে একটি টিয়ে পাখির ছবি।

        আমরা সবাই মিলে দুপুরের খাবারে বসে গেলাম। টেবিলে আমার একপাশে ক্যাতারজিনা ও অন্যপাশে তার মা, ক্যাতারজিনার পরেই বসেছেন তাঁর বাবা। এবং বিশাল টেবিলের চারপাশ ঘিরে মোট ষোলোজন বসলেন। খাবারে প্রথমেই এলো সুপ। এটা এদেশের ট্রেডিশনাল নিয়ম। সুপ দিয়ে শুরু আর ডিজার্ট দিয়ে শেষ। এরপরে পাওয়া গেল হাঁসের মাংস, পোর্ক, আলু সিদ্ধ করে ফালি ফালি কাটা, বাঁধাকপির সালাত, ও কোল্ডস্ল। আমি পোর্ক খাই না সেটা সবাই জনে। তবে আমি যে সেটি ধর্মীয় কারণে নয়, বরং স্বাস্থ্যগত কারণে খাই না সেটাও ক্যাতারজিনা জানেন। মোদ্দা কথা ছোটোবেলা থেকেই যেহেতু এই মাংসটি আমাদের খাদ্যতালিকায় ছিলো না, তাই একে আর আমরা কখনো বাড়িতে প্রবেশ করাইনি। আমার স্ত্রীও অনেকটা গুরুত্ব দিয়ে স্কুলে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ছেলেকেও যেন না দেওয়া হয়। তবে, আমি কোনো রেডমিটই খাই না। হাঁসের মাংসও যে আমার খুব একটা পছন্দ তা নয়। তবে আজকে চালিয়ে নেওয়া গেল। ওদিকে ভার্জিনিয়ার দ্বিতীয় ছেলের গার্লফ্রেন্ড ভেজিটারিয়ান। ক্যাতারজিনার ছেলে বলে উঠলো, “হাঁস কিন্তু ভেজিটেবল!” রসিকতায় সবাই হাসলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আর বিফ কোথা থেকে আসে।” সে কিছু না ভেবেই সাথে সাথে উত্তর দিলো, “গাছে ধরে!” সবাই আবারও হেসে উঠলেন। আমার মনে পড়ে গেল গতবছর নোবেল পাওয়া উপন্যাসের কথা। আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি দ্য ভেজিটারিয়ান পড়েছ?” সে বলল, “না পড়া হয়নি।”

        আমি বললাম, “একটি মেয়ে হঠাৎ করেই ভেজিটারিয়ান হয়ে যায়। তার জীবনের নানা গল্প দিয়ে সাজানো এই উপন্যাসের শেষ দিকে একটি মজার ব্যাপার ঘটে। হাসপাতাল থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই এক যোগে খুঁজতে থাকে। তার বোনকে খবর দেওয়া হয়। সে বনের মধ্যে মেয়েটিকে আবিষ্কার করে, মাথা নিচের দিকে আর পা উপরে তুলে দণ্ডায়মান। জিজ্ঞেস করে এমনভাবে আছো কেনো? সে বলে, এটাই তো আসল উপায়, দেখো না গাছেদের পাগুলো উপরে আর মাথা মাটিতে।”

        লাঞ্চের মেইন কোর্স শেষ হলে আসে ডিজার্ট। আমরা পাই বাসায় বানানো তিন প্রকার কুকিজ ও তরমুজ। সাথে আমাকে দেওয়া হয় দুধ-চা। এদের চা পরিবেশনার কায়দাটা বেশ মজার। কেতলি ও চায়ের পেয়ালা একসাথে বসানো। কেতলি তুলে নিলে চায়ের পেয়ালা বেরিয়ে আসবে। সেখানে চা ঢেলে, অন্য একটি পাত্রে দেয়া দুধ মিশিয়ে রসিয়ে রসিয়ে খাও।

        ক্যাতারজিনার অনুরোধে দুই প্রকার কুকিজ আমাকে খেতেই হলো। তবে ঘোরানো প্যাঁচানো বেশ বড়ো ধরনের কুকিজটি আমি খাইনি বলে আমাদের সাথে একটা প্যাকেটে করে দেওয়া হলো। ক্যাতারজিনার বাসায় পরের দিন সকালে চায়ের সাথে সেটা খেলাম।

        আমরা যখন চা খাচ্ছিলাম বাচ্চারা যে যার গিটার, ড্রাম, ও পিয়ানো নিয়ে বসে গেল। বার্থডে বেবির পিয়ানো বাজানো শুনে তো আমি রীতিমতো ইমপ্রেসড। ক্যাতারজিনাও বেশ ভালো পিয়ানো বাজান সেটা আমি জানি। কিন্তু এই মেয়ে একেবারে ন্যাচারাল পিয়ানো বাদক। ক্যাতারজিনা বললেন, “ও এমনভাবে বাজায় যে মনে হয়, পিয়ানো বাজানো কোনো ঘটনাই না।” এই পুরো পরিবারটিই যে মিউজিকে ভক্ত এবং ওদের বাবা বিখ্যাত গায়ক সেটা আমি ফেরার পথে জানলাম। ক্যাতারজিনা বললেন, “কেনো, চিহানোভের রেস্তোরাঁয় যখন গানের রেকর্ড বাজছিলো আমি তোমাকে বললাম না যে এটা আমার বোনের জামাই!”

        আমি বলি, “বলেছিলো, কিন্তু তিনি যে দেশে দেশে কনসার্ট করেন। আমেরিকাতেও কয়েকবার কনসার্ট করতে পুরো পরিবার নিয়ে গেছেন সেটা তো আগে বলোনি।”

        যাহোক, বার্থডে বেবির পিয়ানো শুনে তাকে আমি কাছে ডেকে নিলাম, পকেট থেকে একশ ডলারের একটি নোট বের করে বললাম, “এটা ভাঙিয়ে তোমার যা মনে চায় কিনে নিও, তোমার বার্থডেতে এটা আমার উপহার।”

        মেয়েটি প্রথম মনে করেছে যে আমি বাংলাদেশের একশ টাকা দিয়েছি। কিন্তু যখন ওর বয়ফ্রেন্ড ও অন্যান্য বাচ্চারা আবিষ্কার করল যে এটি আসলে একশ ডলারের নোট, তখন টাকার অঙ্ক চিন্তা করে সে এতটাই আবেগআপ্লুত হয়ে গেল যে তার বয়ফ্রেন্ডকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকলো। ক্যাতারজিনা বললেন, “সে এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে কী উপহার তাকে দেওয়া হয়েছে।”

        বাসায় ফেরার সময় তিনি বললেন, “আসলে, ছোটো মেয়ে তো, বাজারে যায় মা-বাবার সাথেই, আর খুব বেশি টাকারও প্রয়োজন হয় না তার। তাই এতগুলো টাকা মানে প্রায় পনে চারশো স্লটে একসাথে পেয়ে নাওমি বেশ উৎফুল্ল!”

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গ্লোবাল ফ্যাটি লিভার ডে-তে ইউনাইটেড হাসপাতালের সচেতনতা ক্যাম্পেইন
গ্লোবাল ফ্যাটি লিভার ডে-তে ইউনাইটেড হাসপাতালের সচেতনতা ক্যাম্পেইন
একাধিক গাড়ি থাকলে দিতে হবে পরিবেশ সারচার্জ
একাধিক গাড়ি থাকলে দিতে হবে পরিবেশ সারচার্জ
হাম উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু
হাম উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু
ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য বাজেটে স্বস্তির খবর
ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য বাজেটে স্বস্তির খবর
সর্বাধিক পঠিত
সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের আছে আইডি কার্ড, চিনতে পেরেছে পরিবার
সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের আছে আইডি কার্ড, চিনতে পেরেছে পরিবার
বিএসএফের পুশইনের পর সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের পরিচয় মিলেছে
বিএসএফের পুশইনের পর সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের পরিচয় মিলেছে
লাশের গোপনাঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করে তোপের মুখে নারী চিকিৎসক
লাশের গোপনাঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করে তোপের মুখে নারী চিকিৎসক
৫৪ কেজিতে এক মণের দিন শেষ
৫৪ কেজিতে এক মণের দিন শেষ
স্বর্ণের দাম আবার কমলো, ভরিতে ৪৪৩২ টাকা
স্বর্ণের দাম আবার কমলো, ভরিতে ৪৪৩২ টাকা