তুমি কি নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট?
দার্শনিক: আচ্ছা! এবার তোমার জিজ্ঞাস্যেই ফিরে যাই। তুমি ম-এর মতো প্রাণবন্ত, উচ্ছল এবং সবার নিকট গ্রহণীয় ব্যক্তি হতে চাও, ঠিক?
যুবক: কিন্তু সেটা আলোচ্যসূচিতে নেই বলে আপনি বাতিল করে দিয়েছেন। আচ্ছা, বিষয়টি ঐ রকমই। এমনিই বলেছিলাম; আপনাকে খানিকটা চিন্তায় ফেলার জন্য। আমি নিজেকে যথেষ্ট ভালোভাবে জানি এবং এও জানি যে, আমি কখনই তাঁর মতো হতে পারব না।
দার্শনিক: কেন পারবে না?
যুবক: এটি নির্ধারিত, সুনিশ্চিত। কারণ আমাদের রয়েছে আলাদা ব্যক্তিত্ব, অথবা বলতে পারেন পৃথক সহজাত বৈশিষ্ট্য।
দার্শনিক: হুম্…।
যুবক: একটি উদাহরণ দিই। আপনার বসবাস এই বইয়ের জগতে। আপনি একটি নতুন বই পড়েন… নতুন জ্ঞান অর্জন করেন… আসলে আপনি জ্ঞান অন্বেষণ অথবা বলা যায় জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছেন। যত বেশি পড়ছেন, তত বেশি জ্ঞানলাভ করছেন। আপনি মূল্যবোধের নতুন ধারণা খুঁজে পান এবং তা আপনার মাঝে পরিবর্তন নিয়ে আসে বলে মনে হয়। দেখুন, আমি আসলে বলতে চাইনি কিন্তু না বলেও পারছি না; আপনি যতই জ্ঞান অর্জন করুন না কেন, তাতে আপনার ব্যক্তিত্ব কিংবা সহজাত বৈশিষ্ট্যের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে আপনার অর্জিত সকল জ্ঞানও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। হ্যাঁ, আপনার সঞ্চিত জ্ঞানভাণ্ডার ভেঙে তছনছ হয়ে আপনার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। ফলাফল আপনি জানেন - যেখান থেকে শুরু করেছিলেন ঠিক সেখানেই ফিরে যাবেন আবার। অ্যাডলারের মতবাদের ব্যাপারেও একই ঘটনা ঘটবে। তাঁর সম্পর্কে যত তথ্য-প্রমাণ জমা করি না কেন, আমার ব্যক্তিত্বের ওপর সেগুলোর কোনো প্রভাব পড়বে না। সে জ্ঞান কেবল স্তূপীকৃত হতে থাকবে যতক্ষণ না, অবিলম্বে হোক কিংবা বিলম্বে, তা পরিত্যাগ করা হয়।
দার্শনিক: তাহলে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও…তুমি ম-এর মতো হতে চাও এমনটা কেন ভাবছ? আমার তো মনে হয়, তুমি আসলে বদলে গিয়ে নতুন মানুষ হতে চাও, হতে পারে সেটা ম কিংবা অন্য কেউ। কিন্তু এর মাঝে তোমার উদ্দেশ্যটা কী?
যুবক: আপনি আবারও লক্ষ্য সম্পর্কে কথা বলছেন? যেমনটি আগেই বলেছি, আমি ম-এর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ এবং তাঁর মতো হতে পারলে আমি সত্যিই সুখী হবো।
দার্শনিক: তুমি ম-এর মতো হতে পারলে সুখী হবে…তার মানে হলো এখন তুমি সুখী নও, তাই কি?
যুবক: কী বলছেন?
দার্শনিক: এই মুহূর্তে তুমি প্রকৃত সুখী হতে পারছ না; কারণ তুমি নিজেকে ভালোবাসতে শেখনি। তা ছাড়া, কেবল নিজেকে ভালোবাসার জন্য একজন ভিন্ন মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করতে চাও। তোমার ‘এই বর্তমান তুমি’কে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে কেবল ম-এর মতো চাও, ঠিক?
যুবক: হ্যাঁ, আপনি যথার্থই বলেছেন। সত্যটা মেনে নেওয়া যাক, আর তা হলো- আমি আমাকে অপছন্দ…আরও কঠোরভাবে বলতে গেলে, ঘৃণা করি। এই পুরোনো ধাঁচের দার্শনিক ধ্যান-ধারণা নিয়ে আর চালিয়ে যেতে পারছি না- হ্যাঁ, আমি সত্যিকার অর্থেই নিজেকে ঘৃণা করি।
দার্শনিক: ঠিক আছে…। যদি তোমাকে ‘নিজেদের পছন্দ করে’ এমন মানুষ খুঁজে বের করতে বলা হয়, তবে তোমার পক্ষে তেমন লোক পাওয়া সত্যি দুষ্কর হবে - যারা তোমার সামনে এসে গর্বে বুক ফুলিয়ে বলবে, ‘হ্যাঁ, আমি নিজেকে পছন্দ করি’।
যুবক: আপনার বেলায়? আপনি কি নিজেকে পছন্দ করেন?
দার্শনিক: আর যাই হোক অন্তত এটি মনে করি না যে, আমি ভিন্ন মানুষ হতে চাই। হ্যাঁ, আমি ‘এই আমাকে’ মেনে নিয়েছি।
যুবক: আপনি আপনাকে মেনে নিয়েছেন?
দার্শনিক: দেখ, তোমার ম-এর মতো হতে চাওয়ার ইচ্ছা যতই তীব্র হোক না কেন, পুনর্জন্ম নিয়ে কখনই তাঁর মতো হতে পারবে না। তুমি ম নও। তোমার ‘তুমি’ হওয়াটাই যথার্থ। যাহোক, আমি বলছি না যে, ‘তুমি যা আছ ঠিক তা-ই হওয়া’ তোমার জন্য ঠিক। যদি তুমি আসলেই সুখী হতে না পার, তাহলে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, সবকিছু এখন যেভাবে আছে, তা ঠিক-ঠাক মতো নেই। তোমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে এবং থামা যাবে না।
যুবক: অত্যন্ত রূঢ়ভাবে বলা হলেও আপনার বক্তব্য বুঝতে পেরেছি। আমার নিকট বিষয়টি এখন স্ফটিকের মতো পরিষ্কার; অর্থাৎ এখন যেভাবে আছি তা মোটেও সঠিক নয়; আমাকে সামনে এগোতে হবে।
দার্শনিক: অ্যাডলারকে উল্লেখ করে বলতে হয়, ‘কী কী গুণাবলি নিয়ে একজন জন্মগ্রহণ করল তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো সেগুলোর ব্যবহার’। তুমি ম অথবা অন্য কারও মতো হতে চাও কারণ তোমার সম্পূর্ণ মনোযোগ তোমার জন্মগত গুণাবলি বা বিশেষত্বের প্রতি। তোমার বরং সেগুলো থেকে কী তৈরি করতে পার, কীভাবে কাজে লাগাতে পার, সেদিকে মনোনিবেশ করা উচিত।
অসুখী থাকা তোমার নিজের সিদ্ধান্ত
যুবক: কোনভাবেই নয়…সেটা অযৌক্তিক।
দার্শনিক: অযৌক্তিক কেন?
যুবক: কেন আবার? কিছু মানুষ সচ্ছল পরিবেশে অমায়িক পিতা-মাতার ঘরে জন্মে, আর কিছু মানুষ জন্ম থেকেই দরিদ্র এবং তাঁদের পিতা-মাতাও হয় খারাপ। পৃথিবীটা এমনই এবং আমি এ নিয়ে বেশি আলোচনা করতে আগ্রহী নই। কিন্তু একটি জিনিস স্পষ্ট, তা হলো পৃথিবীর সবকিছু সমান নয়, সবার জন্য সমান নয় এবং বরাবরের মতোই বর্ণ, জাতীয়তা ও গোত্রের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভেদ বিরাজমান। এজন্য জন্মগতভাবে প্রাপ্ত যা-কিছু, সেগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়াটাই স্বাভাবিক। আপনি যা বলছেন তা কেবল তাত্ত্বিক এবং বাস্তব জগৎকে অস্বীকারের নামান্তর।
দার্শনিক: আমি নই বরং তুমি বাস্তবতাকে অস্বীকার করছ। তুমি যা-কিছু নিয়ে জন্মেছ কেবল সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিলে বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হবে কি? আমরা যন্ত্রের মতো প্রতিস্থাপনযোগ্য নই। আমাদের প্রতিস্থাপনের দরকার নেই বরং দরকার নবায়নের, নতুন অর্থ সংযোজনের।
যুবক: আমার কাছে প্রতিস্থাপন ও নবায়ন একই অর্থ বহন করে। আপনি আলোচনার মূল বিষয়বস্তু এড়িয়ে যাচ্ছেন। দেখুন, জন্ম থেকেই দুঃখ নামক একটি জিনিস তাড়া করে ফেরে। অনুগ্রহপূর্বক বিষয়টি মেনে নিন।
দার্শনিক: না, আমি তা মানছি না।
যুবক: কেন, কারণ কী?
দার্শনিক: খেয়াল কর; এই মুহূর্তে তুমি প্রকৃত সুখ অনুভব করতে পারছ না। বেঁচে থাকা তোমার নিকট অত্যন্ত কঠিন; এমনকি তোমার মধ্যে একজন ভিন্ন মানুষ হিসেবে পুনর্জন্মলাভের আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। আর তুমি অসুখী কারণ ‘শনির রাহুতে তোমার জন্ম’ নয় বরং ‘অসুখী থাকা’কে নিয়তি হিসেবে ধরে নিয়েছ।
যুবক: আমি দুঃখের জীবন বেছে নিয়েছি? এ কথা কীভাবে মেনে নিতে পারি?
দার্শনিক: এর মধ্যে অবিশ্বাস্য কিছু নেই। গ্রিক দর্শনের সেই ধ্রুপদী যুগ থেকে বিষয়টির পুনরাবৃত্তি চলে আসছে। ‘কেউই মন্দ কামনা করে না’- এই প্রবাদটি তুমি শুনেছ কি? এই প্রস্তাব ‘সক্রেটিসের বিভ্রম’ [১] (Socratic Paradox) নামে পরিচিত।
যুবক: মন্দ কামনা করা লোকের কোনো কমতি নেই, তাই নয় কি? এদের মধ্যে অবশ্যই রয়েছে অসংখ্য চোর, খুনি, অন্ধকার জগতে বিচরণ করা রাজনীতিবিদ, এবং এমনকি কর্মকর্তাদের কথাও মনে রাখতে হবে। বরং খারাপ কাজ করে না এমন একজন প্রকৃত সৎ, স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল আধুনিক মানুষ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর।
দার্শনিক: নিঃসন্দেহে! খারাপ আচরণের কোনো খামতি নেই। কিন্তু কেউই - এমনকি সবচেয়ে শক্ত, নির্মম অপরাধীও - কেবল মন্দ কাজে জড়িত হওয়ার ইচ্ছা থেকেই তাতে লিপ্ত হয় না। অপরাধে লিপ্ত হওয়ার পিছনে তাঁদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব যৌক্তিকতা বা ব্যাখ্যা থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, অর্থ সংক্রান্ত কলহ থেকেই কেউ একজন খুনের মতো অপরাধ করে থাকে। এই অপরাধের জন্য অপরাধীর কাছে এমন যৌক্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে যার দ্বারা উক্ত অপরাধকে আবার ‘ভালো’ একটি অর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। নৈতিক দিক থেকে এটি মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়, যদিও ‘কারও একজনের উপকার’ অর্থে ভালো হতেও পারে।
যুবক: কারও একজনের উপকার?
দার্শনিক: ‘ভালো’ এর গ্রিক প্রতিরূপ ‘অগাথন’ (agathon)-এর কোনো নৈতিক দিক নেই; এটি কেবল ‘উপকারী’ অর্থ নির্দেশ করে। অন্যদিকে, ‘খারাপ’ (kakon)-এর অর্থ কেবল ‘উপকারী নয় বা অপকারী’। আমাদের এই পৃথিবী সব ধরনের অন্যায় ও পাপ কাজে পরিপূর্ণ, যদিও শব্দের প্রকৃত অর্থ অনুযায়ী ‘মন্দ কামনা করা’ একজন লোকও পাওয়া যাবে না। এই অর্থে ‘খারাপ বা মন্দ’-এর পরিবর্তে ‘উপকারী নয়’ ব্যবহার করা শ্রেয়।
যুবক: তাতে কী আসে-যায়?
দার্শনিক: ধরো, জীবনের কোনো একটি পর্যায়ে তুমি অসুখী হয়ে পড়লে। এটা এজন্য নয় যে, তুমি অসুখী পারিপার্শ্বিকতায় জন্মগ্রহণ করেছ অথবা দরিদ্র পরিবেশের মধ্যে এসে পড়েছ; বরং তা এজন্য যে, তুমি অসুখী হওয়াকেই নিজের জন্য শ্রেয় সাব্যস্ত করেছ।
যুবক: কেন? কীসের জন্য?
দার্শনিক: এর ব্যাখ্যা কী? কেন তুমি অসুখী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছ? আমার নিকট এর সুনির্দিষ্ট কারণ বা বিস্তারিত জানার কোনো উপায় নেই। আমাদের বিতর্ক এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়গুলো অধিকতর স্পষ্ট হতে পারে।
যুবক: আপনি আসলে আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন। আপনি এগুলোকে দর্শন বলেন? আমি মোটেও তা গ্রহণ করতে পারছি না।
কথা বলতে বলতে নিজের অজান্তেই যুবক উঠে দাঁড়ালো এবং দার্শনিকের দিকে একদৃষ্টে তাকাল। আ…আমি অসুখী জীবন বেছে নিয়েছি? কারণ? কারণ, অসুখী জীবন আমার জন্য ভালো? কী অবিশ্বাস্য যুক্তি! আমাকে বিদ্রুপ করতে তিনি নিচে নামছেন কেন? আমি কি কিছু ভুল করেছি? যাই হোক না কেন, আমি তাঁর এই যুক্তিকে ভেঙে চুরমার করে দেব। তাঁকে আমার সামনে নতজানু হতে বাধ্য করব। যুবকের চেহারায় উত্তেজনা টগবগ করছে।
মানুষ সব সময় বিদ্যমান অবস্থাকেই পছন্দ করে
দার্শনিক: বসো। বিষয়গুলো যখন কাঠামো পেতে শুরু করে, তখন সাংঘর্ষিক মতামত আসা খুবই স্বাভাবিক। অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান মানুষের কাছে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় সে-সম্পর্কে আমি এখন খুব সাধারণ একটি ব্যাখ্যা দেব।
যুবক: ঠিক আছে; তবে, অনুগ্রহপূর্বক একটু সংক্ষিপ্ত করবেন।
দার্শনিক: তুমি বলেছিলে যে, মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য বা ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন করা যায় না। অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানে ব্যক্তিত্ব বা সহজাত বৈশিষ্ট্যকে ‘জীবনধারা’ (lifestyle) হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
যুবক: জীবনধারা?
দার্শনিক: হ্যাঁ। মানুষের জীবনের চিন্তাভাবনা ও কাজ করার ধরন বা প্রবণতাই হলো জীবনধারা।
যুবক: জীবনের চিন্তাভাবনা ও কাজ করার প্রবণতা?
দার্শনিক: যথার্থ বলেছ - অর্থাৎ একজন পৃথিবীকে এবং নিজেকে যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। জীবনধারাকে এমন একটি ধারণা হিসেবে ধরে নাও যা এই অর্থ খুঁজে নেওয়ার উপায়গুলোকে একত্রিত করে। ক্ষুদ্র অর্থে, জীবনধারাকে একজনের ব্যক্তিত্ব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। আর বৃহদাঙ্গিকে বলা যেতে পারে, এটি এমন একটি শব্দ যা ব্যক্তির বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবন সম্পর্কে মূল্যায়নকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
যুবক: তাঁর বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি?
দার্শনিক: এমন একজনের কথা ধরো যিনি নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকেন এবং বলে বেড়ান, ‘আমি একজন হতাশাবাদী’। কেউ আবার এভাবেও বলতে পারে, ‘আমার হতাশাবাদী বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে’। তোমাকে বুঝতে হবে, বিবেচ্য বিষয় এখানে ব্যক্তিত্ব নয় বরং পৃথিবীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। ‘ব্যক্তিত্ব’ শব্দটি এখানে খুব সুচিন্তিতভাবে ব্যবহার করা হয় এবং তা অপরিবর্তনীয়তার ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু আমরা যদি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আলোচনা করি, তাহলে বিষয়বস্তু পরিবর্তন করাও সম্ভব।
যুবক: হুম্…। এটি খুবই বিভ্রান্তিকর। আপনি ‘জীবনধারা’ বলতে কি ‘বেঁচে থাকার একটি উপায় বা ধরন’ (a way of living)-কে বোঝাতে চান?
দার্শনিক: হ্যাঁ, তুমি এভাবেও বলতে পার। আর একটু সঠিকভাবে বলতে হয় ‘এটি হলো একজনের জীবন যে-ধরনের হওয়া উচিত’। তোমার সহজাত বৈশিষ্ট্য বা ব্যক্তিত্বকে এমন কিছু ভাব যার দ্বারা তুমি সমৃদ্ধ হয়েছ এবং সেগুলো তোমার ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়নি। যাহোক, অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানে জীবনধারা বলতে এমন কিছুকে বোঝায় যা একজন স্বেচ্ছায় পছন্দ করে নেয়।
যুবক: যা কেউ নিজেই নিজের জন্য পছন্দ করে নেয়?
দার্শনিক: হ্যাঁ, ঠিক তাই। তুমিই তোমার জীবনধারা নির্ধারণ কর।
যুবক: তাহলে বিষয়টি দাঁড়ায় - আমি কেবল অসুখী হওয়াকে বেছে নিইনি বরং আমার এই বিকৃত [২] (warped) ব্যক্তিত্বকে বেছে নেওয়ার মত নিচে নেমে গেছি?
দার্শনিক: একদম তাই।
যুবক: হাহ্! এখন আপনি সত্যিই জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছেন। বুঝতে শেখার পরই দেখি আমি এইরূপ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে বসে আছি। এই ব্যক্তিত্বকে পছন্দ করে নেওয়ার মতো কোনো স্মৃতি আমার নেই। আপনার ক্ষেত্রেও বিষয়টি তাই নয় কি? নিজের ইচ্ছায় ব্যক্তিত্বকে পছন্দ করে নেওয়া… এখন মনে হচ্ছে আপনি মানুষ নয়, রোবটের কথা বলছেন।
দার্শনিক: অবশ্যই তুমি সচেতনভাবে ‘তোমার এই তুমি’কে পছন্দ করে নাওনি। তোমার প্রথম পছন্দটি সম্ভবত ছিল অচেতনভাবে; বর্ণ বা গোত্র, জাতীয়তা, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক পরিবেশের মতো কতিপয় বাইরের প্রভাবকের সঙ্গে মিলে। নিশ্চয়ই এই পছন্দে এগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ছিল। সে যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত এটি ছিল তোমার নিজেরই পছন্দ।
যুবক: আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না। আমি পছন্দ করে নিয়েছি, তা কী করে সম্ভব?
দার্শনিক: অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী ব্যক্তিত্ব পছন্দের এই বিষয়টি দশ বছর বয়সের দিকে ঘটে থাকে।
যুবক: আচ্ছা! তর্কের খাতিরে - হ্যাঁ, ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তর্কের খাতিরে আমি মেনে নিচ্ছি। আমার বয়স যখন দশ বছর তখন অচেতনভাবেই নিজস্ব এই জীবনধারা, বা যাই হোক, বেছে নিয়েছি। তারপরও কী এগুলোর কোনো গুরুত্ব আছে? আপনি এটাকে ব্যক্তিত্ব বলতে পারেন; বলতে পারেন সহজাত প্রবৃত্তি বা স্বভাব, জীবনধারা কিংবা যেকোন কিছু একটা নাম দেন না কেন, আমি ইতোমধ্যেই ‘আমার এই আমি’-তে পরিণত হয়েছি। তাতে আদৌ কোনোকিছুর পরিবর্তন হয় না; অর্থাৎ পরিস্থিতি যা ছিল তা-ই আছে।
দার্শনিক: তা ঠিক নয়। যদি তোমার জীবনধারা জন্মগতভাবে তোমার সহজাত না হয় বরং এমন কিছু যা পরবর্তীতে তুমি নিজেই পছন্দ করে নিয়েছ; তাহলে অবশ্যই তা আবার নতুন করে বেছে নেওয়া সম্ভব।
যুবক: তাহলে বলছেন আবার নতুন করে আমার জীবনধারা বেছে নিতে পারি?
দার্শনিক: হতে পারে এই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত তুমি তোমার জীবনধারা সম্পর্কে ভেবেই দেখনি। আবার এও হতে পারে যে, জীবনধারা বিষয়ক এই তত্ত্ব সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণাই ছিল না। অবশ্যই নিজের জন্মকে বেছে নেওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। বর্তমান যুগে, এই দেশে এবং এই বাবা-মা’র ঘরে জন্মগ্রহণ করার মধ্যে তোমার কোনো হাত ছিল না। জীবনে এই প্রত্যেকটি জিনিসের বিশাল প্রভাব রয়েছে। তুমি সম্ভবত হতাশা বোধ করবে, চারিদিকের অন্য লোকদের দিকে দেখতে শুরু করবে এবং ভাববে ‘আমি যদি এই সুন্দর পরিবেশে জন্মগ্রহণ করতে পারতাম’! কিন্তু এখানেই সব শেষ নয়। বিষয়টি অতীতে নয়; বরং এখানে এবং এই বর্তমান সময়ে। তুমি এখন জীবনধারা সম্পর্কে জেনেছ এবং এখন থেকে তুমি কী করবে তা তোমার দায়িত্ব। এখন পর্যন্ত তোমার যে জীবনধারা রয়েছে তা নিয়েই সামনে এগোবে না কি নতুন জীবনধারা বেছে নিবে তা সম্পূর্ণভাবে তোমার ওপর নির্ভর করছে।
যুবক: তাহলে, নতুন করে কীভাবে শুরু করব? আপনি বলছেন, আমার জীবনধারা নিজেই বেছে নিয়েছি। এখনই আবার বলছেন, আমার পছন্দের নতুন জীবনধারা নির্বাচন করা উচিত। কিন্তু মুহূর্তেই এটা পরিবর্তন করে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
দার্শনিক: হ্যাঁ, সম্ভব; তুমি পার। পরিবেশ-পরিস্থিতি যাই হোক না কেন মানুষ যে-কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। তুমি পরিবর্তন হতে পারছ না কারণ তেমনটিই সিদ্ধান্ত নিয়েছ।
যুবক: আপনি আসলে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?
দার্শনিক: মানুষ প্রতিমুহূর্তেই তাঁর জীবনধারা ঠিক করে নিচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে, যখন আমরা মুখোমুখি আলোচনায় ব্যস্ত, তখনও আমরা আমাদের জীবনধারা নির্বাচন করছি। তুমি তোমাকে উপস্থাপন করেছ অসুখী ব্যক্তি হিসেবে। তুমি বলেছ, ঠিক এই মুহূর্ত থেকে তুমি পরিবর্তন হতে চাও। এমনকি এও দাবি করেছ যে, তুমি একজন ভিন্ন মানুষ হিসেবে পুনর্জন্ম লাভ করতে আগ্রহী। এত কিছুর পরেও তুমি পরিবর্তন হতে পারছ না কেন? তা কেবল এই জন্য যে, তুমি ক্রমাগতভাবে তোমার জীবনধারা পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছ।
যুবক: কোনোভাবেই না, এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক? আমি সত্যিই পরিবর্তন হতে চাই- এটা আমার আন্তরিক চাওয়া। তাহলে, পরিবর্তন না হওয়ার সিদ্ধান্ত আমি কীভাবে নিলাম?
দার্শনিক: ছোটোখাটো কিছু অসুবিধা এবং সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তুমি সম্ভবত ভাবছ যে, তোমার বর্তমান জীবনধারা খুবই বাস্তবসম্মত এবং জিনিসগুলো যেখানে যেমন আছে তেমন রেখে দেওয়াই সমীচীন। তুমি ভাবছ, স্থিতাবস্থা বজায় রাখলেই কারও কর্মের ফলাফল অনুমান করার সময় অভিজ্ঞতা তোমাকে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। এটা বলা যেতে পারে, তোমার অতি পরিচিত দীর্ঘদিনের পুরোনো গাড়িটি চালানোর মতো। শুরুতে সামান্য ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হতে পারে, তবে এইটুকু মেনে নিয়ে সহজেই পরিচালনা করা সম্ভব। অন্যদিকে, কেউ যদি ‘নতুন জীবনধারা’ বেছে নেয়, তবে এই ‘নতু্নত্ব’ কেমন হবে তা অনিশ্চিত এবং সম্মুখে আসা নতুন ঘটনাগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবে সে-সম্পর্কেও তাঁর ধারণা থাকবে না। যেহেতু, পূর্বাহ্ণেই ভবিষ্যৎ দেখে নেওয়া কঠিন, তাই জীবন থাকবে উদ্বেগে ভরপুর। এজন্য সামনের জীবন অধিকতর কষ্টদায়ক ও অসুখী হতে পারে। সহজ ভাষায় বলতে হয়, মানুষের নানারকম অভিযোগ-অনুযোগ থাকলেও জিনিসগুলোকে যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দেওয়া অধিকতর সহজ ও নিরাপদ।
যুবক: একজন পরিবর্তন হতে চায় কিন্তু পরিবর্তন অত্যন্ত ভীতিকর, তাই কি?
দার্শনিক: জীবনধারা পরিবর্তন করতে যাওয়ার অর্থ হলো আমাদের অসীম সাহসিকতাকে পরীক্ষার মুখে ফেলে দেওয়া। কারণ এর মধ্যে রয়েছে পরিবর্তন হওয়ার ফলে সৃষ্ট উদ্বেগ এবং পরিবর্তন না হতে পারার হতাশা। আমি নিশ্চিত তুমি দ্বিতীয়টা বেছে নিয়েছ।
যুবক: একটু…এক মিনিট! এখন আপনি একটি নতুন শব্দ ‘সাহসিকতা বা সাহস’ ব্যবহার করলেন।
দার্শনিক: হ্যাঁ, ঠিক শুনেছ। অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান আসলে ‘সাহসিকতার মনোবিজ্ঞান’। তোমার দুঃখের জন্য তোমার অতীত অথবা পারিপার্শ্বিকতাকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয়। এমনকি তোমার যোগ্যতার অভাব রয়েছে, বিষয়টি তাও নয়। তোমার যা ঘাটতি রয়েছে তাহলো `সাহস’। হ্যাঁ, বলা যেতে পারে, তোমার ‘সুখী হওয়ার সাহসিকতা’র অভাব রয়েছে।
টীকা
১. সক্রেটিসের বিভ্রম হলো জ্ঞান, সদ্গুণ, মন্দকাজ প্রভৃতি আপাত দৃষ্টিতে একই ধরনের কিন্তু পরস্পরবিরোধী কতগুলো দাবির সমাহার। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘জেনেবুঝে কেউ অন্যায় করে না’, ‘সব সদগুণাবলিই জ্ঞান’ ইত্যাদি। ‘ভালো ও মন্দের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকেই মানুষ খারাপ কিছু করে’-এমন চিন্তা থেকে বিভ্রমের ধারণাটি এসেছে। এবং মহান সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, ‘মানুষ যদি প্রকৃত অর্থে সততা ও অসততার পার্থক্য বুঝতে পারত, তাহলে সবসময়ই সততার পথকে বেছে নিত’। একটি সরল উদাহরণ হলো, ‘আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না’। অর্থাৎ আমি যদি কিছুই না জানি তাহলে আমি যে কিছুই জানি না তা কীভাবে জানলাম।
২. বিকৃত ব্যক্তিত্ব বলতে সাধারণত স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা বা আচরণ থেকে বিচ্যুত এবং সাধারণ সামাজিক বা নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না এমন ব্যক্তিত্বকে বোঝানো হয়েছে।
আরো পড়ুন:
ধারাবাহিক উপন্যাস।। পর্ব—৩









