সিনুহের প্রত্যাবর্তন ।। নাগিব মাহফুজ

অনুবাদ: ফজল হাসান
২১ জুলাই ২০২৩, ০৯:০০আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩, ০৯:০০

অবিশ্বাস্য খবরটি ফারাওয়ের রাজপ্রাসাদের প্রতিটি অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে প্রত্যেকের জিহ্বা গল্প বলা শুরু করে, সবার কান উৎসাহ নিয়ে শ্রবণ করে এবং বারবার চমকপ্রদ খোশগল্প উচ্চারিত হয়—যে অ্যামোরাইট থেকে আসা মিশরে একজনের আবির্ভাব হয়েছে। সে রাজপুত্র সিনুহের কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে ফারাওয়ের কাছে এসেছে, যে কিনা চল্লিশ বছর আগে কোনো জানান না দিয়ে বেমালুম গায়েব হয়ে গিয়েছেন—এবং যার অন্তর্ধান জনগণের মনে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। কথিত আছে যে, যা-ই ঘটেছে, তা ক্ষমা করার জন্য রাজপুত্র রাজার কাছে অনুরোধ করেছিলেন এবং তাকে যেন তার জন্মভূমিতে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়। সেখানে অবসর নিয়ে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশে দিন গুজরান করবেন এবং তার শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ মৃত্যুর জন্য অপেক্ষায় থাকবেন। সবাই যত শীঘ্রই তাদের নায়কদের স্মরণ করতে পারে—যারা এখন বৃদ্ধ এবং দুর্বল, বয়সের ধ্বংসপ্রাপ্ত চিহ্ন তাদের ওপর কঠোরভাবে খোদাই করা হয়েছে, তারচেয়ে বেশি তাড়াতাড়ি তারা রাজপুত্র সিনুহের অন্তর্ধান হওয়ার পুরাতন কাহিনি স্মরণ করে।

অনেকদিন আগে, রানী ছিলেন যুবতী রাজকন্যা—দীর্ঘ বৃক্ষের চূড়ায় প্রস্ফুটিত দীপ্তিমান গোলাপ—এবং ফারাও প্রথম আমেনেমহাতের রাজপ্রাসাদে বাস করতেন। যৌবনের গাউন এবং সৌন্দর্য্যের শাল দিয়ে তার প্রাণবন্ত শরীর আবৃত থাকত। নম্রতা তার আত্মাকে আলোকিত করেছিল, তার বোধশক্তি ছিল জ্বলন্ত, তার বুদ্ধি ছিল উজ্জ্বল। বিশ্বের দুই শ্রেষ্ঠ রাজপুত্র তার প্রতি নিবেদিত ছিল: তৎকালীন যুবরাজ (এবং বর্তমান রাজা) প্রথম সেনওয়োসরেত এবং রাজপুত্র সিনুহে। দুই রাজপুত্রই ছিলেন শক্তি ও যৌবন, সাহস ও সম্পদ, স্নেহ ও বিশ্বস্ততার সবচেয়ে নিখুঁত আদর্শ। তাদের হৃদয় ছিল প্রেম-ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং তাদের আত্মায় ছিল আনুগত্য, যতক্ষণ না তারা একজন আরেকজনের প্রতি মন খারাপ করেছে—ক্রোধ এবং নির্মম পর্যায়ে। যখন ফারাও জানতে পারলেন যে, তাদের সংবেদনশীল বন্ধন এবং পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অবস্থায়, তখন তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি রাজকুমারীকে ডেকে পাঠান—দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর—তিনি রাজকুমারীকে প্রাসাদের ভেতর নিজের গণ্ডির মধ্যে থাকার হুকুম করেন এবং সে যেন অন্য কোথাও না যায়।

এছাড়া রাজা দুই রাজকুমারকে বলিষ্ঠ গলায় এবং দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, “তোমরা দু’জনেই দুঃখজনক, বেপোয়ারা ও মূর্খতার জন্য তোমরা নিজেদের অন্ধ আত্মত্যাগের অভিশপ্ত শিকার—অন্যসব রাজকুমারদের হাসির পাত্র এবং জনগণের কাছে কৌতুক। ঋষিরা বলেছেন যে, একজন লোক তার কামনা এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না হওয়া পর্যন্ত ঐশ্বরিক শব্দটি ‘মানব’-এর যোগ্য নয়। তোমরা কী বোকা পশু এবং নির্বোধ প্রেমিকের মতো আচরণ করোনি? তোমাদের জানা উচিত যে, তোমাদের দু’জনকে নিয়ে রাজকুমারী এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে এবং সে দ্বিধাদ্বন্দ্বেই থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত একজনকে বেছে নিতে উৎসাহিত হয়। কিন্তু আমি তোমাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যে, এমন একটি চুক্তির মাধ্যমে তোমরা তোমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিহার করো, যা তোমরা ভাঙতে পারবে না। এছাড়া তোমরা রাজকুমারীর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকবে, তা যাই হোক না কেন, এবং ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের স্নেহ এবং আনুগত্য ছাড়া অন্যকিছু মনে রাখবে না—মনের মধ্যে এবং বাইরে উভয়ই। এখন এ বিষয়ে আমার কথা শেষ হয়েছে।

তার কন্ঠস্বর দ্বিধাদ্বন্দ্বের কোনো ফাঁক রাখেনি। দুই রাজকুমার নিঃশব্দে মাথা নত করে থাকে, যখন ফারাও তাদেরকে তাদের চুক্তির জন্য শপথ নিতে এবং হাত মেলাতে বললেন। তারা তাই করে—তারপর সবচেয়ে পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে স্থান ত্যাগ করে।

এই সময়ে লিবিয়ার আদিবাসী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের দমন করে শাস্তি দেওয়ার জন্য ফারাও রাজা সৈন্যবাহিনী পাঠান, উত্তরাধিকারী রাজকুমার সেনওয়োসরেতের নেতৃত্বে, যিনি রাজকুমার সিনুহেকে এক বিগ্রেড সৈনিককে নির্দেশ দেওয়ার জন্য দল নেতা নির্বাচন করেন। সৈনিকরা বিভিন্ন স্থানে লিবিয়াবাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা পিছু হটে পালিয়ে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে লড়াই করে। দুই রাজকুমার তাদের দুঃসাহস এবং নির্ভীকতা প্রদর্শন করে, যা তাদের চরিত্রের সঙ্গে মানানসই। তারা তাদের উদ্দেশ্য প্রায় শেষ করার সময় হঠাৎ করে উত্তরাধিকারী রাজকুমার ঘোষণা করে যে, তার পিতা রাজা আমেনেমহাত মারা গেছেন। যখন এই মর্মান্তিক দুঃসংবাদ রাজকুমার সিনুহের কাছে পৌঁছে, তখন তার মনে সন্দেহের দানা বাঁধে যে, নতুন রাজা তার প্রতি কী ধরনের আচরণ করবে। সন্দেহ তাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে এবং তাকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয়—সুতরাং তিনি কোনো সতর্কবাণী ছাড়াই হাওয়া হয়ে যান, যেন মরুভূমির বালি তাকে গ্রাস করে।

সিনুহের ভাগ্য নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিছু সংখ্যক মানুষ বলাবলি করে যে, তিনি অনেক দূরের কোনো এক গ্রামে পালিয়ে গেছেন। অন্যরা মনে করে যে, তিনি জীবন এবং ভালোবাসা নিয়ে হতাশায় আত্মঘাতী হয়েছেন। তার সম্পর্কে বিভিন্ন কিচ্ছা-কাহিনী অনেকদিন মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের জিহ্বা ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কিচ্ছা-কাহিনী সময়ের ধ্বংসস্তূপের নিচে বিস্মৃতির সমাধিতে চাপা পড়ে যায়। চল্লিশ বছর সেসব কিচ্ছা-কাহিনীকে অন্ধকার ঢেকে রাখে—যতদিন না পর্যন্ত অ্যামোরিটদের দেশ থেকে রাজকুমার সিনুহের পত্র নিয়ে দূত আগমন করে—যা অমনোযোগী লোকজনকে সজাগ করে এবং ভুলে যাওয়া ব্যক্তিদের স্মরণ করিয়ে দেয়।

রাজা সেনওয়োসরেত অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে চিঠিটা বারবার দেখেন। তিনি রানীর সঙ্গে, এখন তার বয়স পঁয়ষট্টি বছর, চিঠির বিষয়ে পরামর্শ করেন। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, মূল্যবান উপহার সামগ্রী দিয়ে অ্যামোরায় রাজকুমার সিনুহের কাছে দূত পাঠাবেন এবং আমন্ত্রণ জানাবেন যেন তিনি মিশরে নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে ফিরে আসেন।

ফারাও রাজার দূতরা দক্ষিণাঞ্চলের মরুভূমি অতিক্রম করে এবং রাজকীয় উপহার বহন করে সরাসরি অ্যামোরিটদের দেশে নিয়ে যায়। তারপর তারা পঁচাত্তর বছর বয়সী একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে সঙ্গে করে ফিরে আসে। পিরামিড পেরিয়ে যাওয়ার সময় বৃদ্ধ লোকটির পা কাঁপছিল এবং তার চোখ দুটি ক্লান্তিতে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। তার পড়নে ছিল বেদুঈনের পোশাক—মোটা পশমের জামা এবং পাদুকা। তার কোমড়ে ছিল তলোয়ার; বুকের ওপর ঝুলে ছিল শুভ্র দীর্ঘ দাড়ি। তিনি যে মেমফিসের রাজপ্রাসাদে বেড়ে ওঠা মিশরীয় ছিলেন, তা দেখানোর জন্য অনেক কিছুই তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই, কেবল যখন নীলনদের মাঝিদের গানের সুর তার কানে পৌঁছে, তার চোখজোড়া তীব্র স্বপ্নে পরিণত হয়, তার শুকনো ঠোঁট কাঁপতে থাকে, বুকের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে ধড়ফড় করে—এবং তিনি কাঁদতে থাকেন। দূতরা কিছুই জানত না, তবে বৃদ্ধ লোকটি নদীর পাড়ে আছড়ে পড়ে এবং চুম্বন করে, যেন তিনি কোনো প্রিয়তমার গালে চুমো খাচ্ছেন, যার কাছ থেকে অনেক দিন ধরে বিচ্ছিন্ন আছেন।

দূতরা বৃদ্ধকে ফারাওয়ের রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসে। তাকে রাজা প্রথম সেনওয়োসরেতে সম্মুখে এনে হাজির করে, যিনি তার মুখোমুখি বসে আছেন, এবং তিনি বললেন, “ঈশ্বর আপনাকে আশীর্বাদ করুন, হে মহারাজা, আমাকে ক্ষমা করার জন্য—এবং অনুগ্রহ করে আমাকে মিশরের পবিত্র মাটিতে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়ার জন্য।”
ফারাও খুব কাছে থেকে আশ্চর্যান্বিত দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকালেন এবং গলা উঁচুতে তোলার সময় বললেন, “এটা কী আসলেই তুমি? তুমি কী আমার ভাই এবং আমার শৈশব ও যৌবনের সঙ্গী—রাজকুমার সিনুহে?”
“আপনার সম্মুখে, আমার প্রভু, রাজকুমার সিনুহে—মরুভূমি এবং চল্লিশ বছর তাকে এরকম করেছে।”
রাজা মাথা নাড়েন এবং তিনি তার ভাইকে নরম কণ্ঠে ও সম্মানের সঙ্গে কাছে ডাকেন, এবং জিজ্ঞেস করেন, “ঈশ্বর এই চল্লিশ বছর তোমাকে কী করেছে?”
রাজকুমার সোজা হয়ে আসনে বসেন এবং তার কাহিনী বলা শুরু করেন।

“প্রভু, আমার কাহিনী শুরু হয়েছে পশ্চিমাঞ্চল মরুভূমিতে, যখন আপনি আমাদের ক্ষমতাধর পিতার মৃত্যু সংবাদ জানিয়েছেন। সেখানে শয়তান আমাকে অন্ধ করে রেখেছিল এবং দুষ্টুরা আমার কানে ফিসফিস করে আমাকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। সুতরাং আমি বাতাসে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলাম, যা আমাকে মরুভূমি, গ্রাম এবং নদীর ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যায়, যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি পাগলামি এবং উন্মাদনার সীমানা অতিক্রম করি। কিন্তু সেই নির্বাসনের দেশে তিনি, যে নামের মুখ দেখে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম এবং যিনি তার খ্যাতি দিয়ে আমাকে বিস্মিত করেছিলেন, আমাকে সম্মান দিয়েছিলেন। আমি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম, আমি আমার চিন্তা ফারাওয়ের দিকে নিয়োজিত করেছিলাম—এবং উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তবুও আমি আমার ভাবনায় হারিয়ে গিয়েছিলাম, যতক্ষণ না অ্যামোরার তনু উপজাতির নেতা আমার দুর্দশার কথা জানতে পেরেছিলেন এবং আমাকে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন মহৎ প্রধান, যিনি মিশর এবং তার প্রজাদের সম্ভ্রম ও স্নেহের সঙ্গে দেখতেন। তিনি আমার সঙ্গে একজন ক্ষমতাশীল ব্যক্তির মতো কথা বলতেন এবং আমার মাতৃভূমির কথা জিজ্ঞেস করতেন। আমি যা জানতাম, তাই বলেছি। তবে তার কাছে আমি আমার কথা গোপন রেখেছি। তিনি আমাকে তার মেয়েদের মধ্যে একজনকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি—এবং তখন থেকেই হতাশায় ভুগেছি যে, আমি আমার স্বদেশকে আর কখনই দেখতে পারব না। অল্প সময় পরে, আমি—একসময় যে ফারাওয়ের বিখ্যাত রথে চড়ে লালিত-পালিত হয়েছে এবং লিবিয়া ও নুবিয়ার যুদ্ধের সময় বড় হয়েছে—তনুর সমস্ত শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছি। তাদের মধ্য থেকে আমি যুদ্ধবন্দীদের নিয়েছি, তাদের নারী ও জিনিসপত্র, তাদের অস্ত্র-বারুদ ও লুটের মালামাল এবং তাদের স্ত্রীদের, এবং আমার সম্মান আরো বেশি উঁচুতে স্থান লাভ করে। প্রধান আমাকে তার সৈন্যবাহিনীর সেনাপ্রধানের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং আমাকে তার প্রত্যাশিত উত্তরসূরি নিযুক্ত করেন।

“সবচেয়ে বড় বাঁধা যার মুখোমুখি আমি হয়েছিলাম, তা ছিল মরুভূমির দুর্ধর্ষ চোর, দৈত্য শয়তান —যে আমার অসীম সাহসকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। সে আমার বাড়িঘর, আমার স্ত্রী এবং সম্পত্তি দখল করার জন্য এসেছিল। দুই পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ দেখার জন্য পুরুষ, মহিলা এবং ছেলেমেয়েরা তড়িঘড়ি করে চত্বরে এসে জমায়েত হয়েছিল। তুমুল হর্ষধ্বনি এবং করতালির মধ্য দিয়ে আমি তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম এবং অনেকক্ষণ লড়াই করেছি। তার কুড়ালের শক্তিশালী আঘাত এড়িয়ে আমি আমার সুচালো তীর ছুঁড়েছিলাম এবং তীরটি তার ঘাড়ে আঘাত করেছিল। আহত হয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল, মৃত্যু তার গলায় এসে কাঁপতে শুরু করেছিল। সেদিন থেকেই আমি মন্দ দেশগুলোর অবিসংবাদিত প্রভু ছিলাম।

“তারপর আমি আমার শ্বশুরের মৃত্যুর পর ক্ষমতা লাভ করি, তলোয়ার দিয়ে উপজাতিদের শাসন করি, মরুভূমির ঐতিহ্য এবং আচার-প্রথা প্রয়োগ করি। আর একের পর এক গড়িয়ে যায় দিন, ঋতু এবং বছর। আমার ছেলেরা বড় হয়ে শক্তিশালী পুরুষ হয়, যারা তাদের জন্মস্থান মরুভূমির জীবন, মহিমা এবং মৃত্যু সম্পর্কে কিছুই জানত না। আমার প্রভু, আপনি কী দেখছেন না যে, আমি মিশর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জন্য কতটা কষ্ট সহ্য করেছি? আমি আতঙ্ক এবং দুশ্চিন্তার দোলাচলে দুলেছি এবং দুর্যোগে ভুগেছি, যদিও আমি ভালোবাসা এবং সন্তানদের জন্মদাতা হিসেবে পিতৃত্ব উপভোগ করেছি, জীবন চলার পথে গৌরব ও সুখ উপভোগ করেছি। কিন্তু বৃদ্ধ বয়স এবং দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত আমাকে কাবু করেছে এবং আমি আমার ছেলেদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করি। তারপর আমি আমার তাবুতে ফিরে যাই এবং বিদায়ের জন্য অপেক্ষা করি।

“নির্বাসনে থাকার সময় আমার হৃদয়ের যন্ত্রণা আমাকে অভিভূত করেছিল এবং বেদনা আমাকে জয় করেছিল, যখন আমার মনে পড়েছিল আড়ম্বরপূর্ণ মিশরের কথা—আমার শৈশব এবং যৌবনের উর্বর খেলার মাঠ। আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাকে বিচলিত করেছিল এবং আমার হৃদয়কে দীর্ঘ সময় ইশারা করেছিল। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত নীলনদ ও মনোরম সবুজ প্রান্তর এবং স্বর্গীয় নীল আকাশ, বিস্ময়কর পিরামিড এবং উঁচু ওবেলিস্কের দৃশ্যাবলী। আমি ভয় পেয়েছিলাম যে, মিশর ছাড়া হয়তো অন্য কোনো দেশে থাকাকালীন সময় মৃত্যু আমাকে গ্রাস করবে।

“সুতরাং হে ঈশ্বর, আমার প্রভু আমাকে যেন ক্ষমা করেন এবং সাদরে আমার আতিথেয়তা গ্রহণ করেন—এই আশা নিয়ে আমি একজন পত্রবাহক পাঠিয়েছি আপনার দরবারে। আমি আমার শেষ জীবনের বাকি সময়, যতক্ষণ সিনুহের নির্ধারিত সময় এসে হাজির না হয়, কাটানোর জন্য নিরিবিলি একটা ছোটো জায়গা ছাড়া অন্য আর কিছুই কামনা করি না। তারপর তাকে প্রতীক চিহ্নিত গোপন আস্তানায় স্থাপন করা হবে এবং তার কফিনে খচিত থাকবে মৃতদের কিতাব—পরকালের পথপ্রদর্শক।

ফারাও উত্তেজনা এবং আনন্দচিত্তে সিনুহের কথা শোনেন। সিনুহের কাঁধে আলতো চাপড় দেওয়ার সময় বললেন, “তুমি যা চাইবে, সবই তোমার হবে।” তারপর রাজা তার রাজপ্রাসাদের কর্মীদের মধ্যে একজনকে ডেকে পাঠালেন এবং সে সিনুহেকে প্রাসাদের অভ্যন্তরে তার থাকার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়।
অপরাহ্নের ঠিক আগে একজন সংবাদবাহক সিনুহের কাছে আসে এবং বলে যে, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে রানী খুবই খুশি হবেন। তৎক্ষণাৎ তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সিনুহে উঠে দাঁড়ান। তখন তার বৃদ্ধ হৃদপিণ্ড প্রচণ্ড জোরে ধুকপুক করছিল। তিনি সংবাদবাহককে অনুসরণ করেন, নার্ভাস এবং বিভ্রান্ত। তিনি বিড়বিড় করে নিজেকে বললেন, “হে প্রভু! এ-কি সম্ভব যে, আমি পুনরায় তাকে আরো একবার দেখতে পারব? সে কী সত্যি আমাকে মনে রেখেছে? সে কী সিনুহেকে মনে রেখেছে—যুবক রাজকুমার এবং প্রেমিক।

তিনি রানীর ঘরের সীমানা অতিক্রম করেন, যেন ঘুমের মধ্যে হেঁটে যাওয়া একজন মানুষ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি রানীর সিংহাসনে পৌঁছেন। তিনি চোখ তুলে রানীর দিকে তাকান এবং তার সহচরীর মুখমন্ডল দেখতে পেলেন, দীর্ঘ সময়ে যার যৌবনের প্রস্ফুটিত সৌন্দর্য শুকিয়ে গেছে। এখনো রানীর আগের দিনের সৌন্দর্যের কিঞ্চিৎ রয়ে গেছে। তিনি শ্রদ্ধায় কুর্নিশ করেন এবং রানীর পোশাকের একপাশে আলতো করে চুম্বন করেন। তারপর রানী তার বিস্ময় গোপন না করে বললেন, “হায় ঈশ্বর, এ কী সত্যি, আমাদের রাজকুমার সিনুহে?”

একটি শব্দও উচ্চারণ না করে রাজকুমার হাসলেন। তিনি তখনো নিজেকে উদ্ধার করতে পারেননি, যখন রানী বললেন, “আমার ঈশ্বর তোমার কথোপকথন বলে দিয়েছেন। আমি তোমার কীর্তিকলাপ এবং কঠিন সংগ্রামের কথা শুনে অভিভূত হয়েছি, যদিও আমাকে একটু থমকে দিয়েছিল যে, তুমি তোমার স্ত্রী ও সন্তানদের ফেলে আসার সাহস করেছ।”

“আপনার অনুকম্পা, আমার রানী,” জবাবে সিনুহে বললেন। “আমার জীবনে বাকি যা আছে, তা কেবল আমার দুঃখ-দুর্দশাকে দীর্ঘায়িত করবে, যখন আমার মতো লোকজন প্রিয় মিশরের বাইরে কবর দেওয়াকে অসহনীয় বলে মনে করবে।”

এক মুহূর্তের জন্য রানী তার দৃষ্টি নিচু করেন। তারপর তিনি স্বপ্নে বিভোর চোখ তুলে সিনুহের দিকে তাকান এবং নরম গলায় বললেন, “রাজকুমার সিনুহে, তুমি তোমার কাহিনী আমাদের বলেছ, কিন্তু তুমি কী আমাদের কাহিনী জানো? ফারাওয়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তুমি পালিয়ে গিয়েছ। তুমি সন্দেহ করেছিলে যে, তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী, যিনি ক্ষমতার দিক থেকে শক্তিশালী ছিলেন, তোমার জীবন রক্ষা করবেন না। তুমি বাতাসের সাহায্য নিয়েছিলে এবং অ্যমোরার মরুভূমি ছাড়িয়ে চলে গিয়েছিলে। তুমি কী জানতে না যে, সেই যাত্রা তোমার নিজেকে এবং তোমাকে যারা ভালোবাসত, তাদের কতটুকু জখম করেছে?”

সিনুহের চোখেমুখে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে, কিন্তু তিনি তার নীরবতা ভাঙেননি। রানী বলতে থাকেন, “তথাপি তুমি কীভাবে জানতে পেরেছিলে যে, লিবিয়ায় প্রচারাভিযানের প্রধান হিসেবে তোমার যাওয়ার ঠিক আগে উত্তরাধিকারী আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন: ‘রাজকুমারী, আমার মন বলছে যে তুমি যাকে চাইবে, তাকেই পছন্দ করেছ। দয়া করে আমাকে সত্য কথা বলো। আমি সত্যি করে ঠিক একইভাবে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আমি সন্তুষ্ট এবং বিশ্বস্ত থাকব। আমি কখনই এই প্রতিশ্রুতি ভাঙব না।’ ”

মহামান্য রানী চুপ করে থাকেন। সিনুহে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তাকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কী তার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছিলেন, হে আমার রানী?”
রানী মাথা নেড়ে জবাব দেন। তার নিঃশ্বাস প্রচণ্ডভাবে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। সিনুহে, যে চল্লিশ বছরের যাত্রা শেষ করে তার শৈশবের পুরুষত্বে ফিরে এসেছে, তার মন আরো বেশি ভারী করে তুলেছে।
“আর আপনি তাকে কী বলেছিলেন?”
“তুমি কী সত্যিই আমার উত্তর জানতে আগ্রহী? চল্লিশ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর? আর তোমার সন্তানরা বড় হয়ে তনু গোত্রের প্রধান হয়ে যাবে?”
সিনুহের ক্লান্ত চোখে বিভ্রান্তির ছাপ ফুটে ওঠে। তারপর তিনি তিক্ত কণ্ঠে বললেন, “পবিত্র প্রভুর শপথ, আমার ফিরে আসা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”

রানী আনন্দ আর উদ্বেগের সঙ্গে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং হাসি মুখে বললেন, “কী অদ্ভুত, ওহ্ সিনুহে! কিন্তু তুমি যা চাইবে, তাই পাবে। চল্লিশ বছর আগে তোমার যে উত্তর শোনা উচিত ছিল, তা আমি নিজের মধ্যে আটকে রাখব না। সেনওয়োসরেত আন্তরিকভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। সুতরাং আমি তাকে বলেছিলাম যে, আমার কাছে ভালবাসা এবং বন্ধুত্বের যা কিছু আছে, তা আমি তাকে দেব। কিন্তু আমার হৃদয়ের কথা...”

রানী এক মুহূর্তের জন্য থামলেন, যখন সিনুহে আবার উপরের দিকে দৃষ্টি তুলে ধরেন, তার দাড়ি কুঁচকে যায় এবং মুখে হতাশা ও আতঙ্ক ফুটে ওঠে। তারপর তিনি পুনরায় বললেন, “আমার মনের কথা বলতে গেলে বলতে হয়—আমি তা নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম।”
“আমার প্রভু,” তিনি বিড়বিড় করেন।
“হ্যাঁ, আমি সেনওয়োসরেতকে তাই বলেছি। তিনি আমাকে বিদায় জানিয়ে অঙ্গীকার করেন যে, তিনি যতদিন নিঃশ্বাস নেবেন, ততদিন তুমি তার ভাই হিসেবে থাকবে।”
“কিন্তু তোমার তাড়া ছিল, সিনুহে এবং তুমি বাতাসে গা ভাসিয়ে পালিয়ে গেলে। তুমি আমাদের উচ্চ আশাকে শ্বাসরোধ করেছিলে এবং আমাদের সুখকে জ্যান্ত কবর দিয়েছিলে। যখন তোমার নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর আসে, আমার বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হয়েছিল—আমি শোকে প্রায় মরতে যাচ্ছিলাম। পরবর্তীতে আমি নিরালায় অনেক বছর জীবন অতিবাহিত করেছি। আমার দুঃখ নিয়ে জীবন উপহাস করেছে; অবশেষে জীবনের প্রতি ভালোবাসা আমাকে বেদনা এবং হতাশার অসুস্থতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। আমি আমার স্বামী হিসেবে রাজাকে নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছি। এই আমার কাহিনী, ওহ্ সিনুহে।”

রানী সিনুহের মুখের দিকে তাকালেন এবং দেখলেন যে, তিনি শোকে তার দৃষ্টি নিচু করেন; আবেগে তার আঙ্গুলগুলো কেঁপে ওঠে। তিনি সহানুভূতি ও আনন্দের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করেন: “এমনও কি হতে পারে যে, আমাদের দীর্ঘদিনের প্রেমের বেদনা এখনো মৃত্যুর এত কাছাকাছি আসা এই বৃদ্ধ হৃদয়ের সঙ্গে খেলা করছে?”

গল্পসূত্র: ‘সিনুহের প্রত্যাবর্তন’ নাগিব মাহফুজের ‘দ্য রিটার্ন অব সিনুহে’ ছোটোগল্পের অনুবাদ। আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন রেমন্ড স্টক। আরবিতে গল্পটি ‘ভয়েসেজ ফ্রম দ্য আদার ওয়ার্ল্ড: অ্যান্সিয়েন্ট ঈজিপশিয়ান টেইলস্’ ছোটোগল্প সংকলনে অন্তর্ভুক্ত। ইংরেজিতে গল্পটি ডেনিস জনসন-ডেভিস সম্পাদিত ‘দ্য এসেন্সিয়াল নাগিব মাহফুজ: নভেলস্, শর্ট স্টোরিজ, অটোবায়োগ্রাফি’ গ্রন্থে প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম