করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
সন্ধ্যাকে গভীর রাত মনে হয় এখন। লকডাউনের সময়সীমা বেড়েই চলছে। বাসার সামনের কোলাহলপূর্ণ রাস্তাটিতে এখন মানুষের চলাচল নেই বললেই চলে। মাঝে মধ্যে অনতিদূর থেকে ভেসে আসে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ, পুলিশের গাড়ির সাইরেন আর ক্ষুধার্ত কুকুরদের সমন্বিত চিৎকার। ছয় বছরের নেহা আর নয় বছরের নাহিদ—দুই ভাই-বোন মিলে বারান্দার গ্রিলে বসে কথা বলছে। নাহিদ বলে আগে এ সময় টিচারের কাছে পড়তাম। এখন মনে হচ্ছে কত্ত রাত! সঙ্গে সঙ্গে নেহা বলে ওঠে—ভাইয়া মাকে বোলো না যে এখন অনেক রাত মনে হচ্ছে। তাহলে মা সত্যি অনেক রাত ভেবে ঘুম পাড়াতে নিয়ে যাবে। ভেতর থেকে মমতা শুনতে পায় কথাগুলো। গভীর যাতনার মাঝেও ছোট্ট মেয়ের কথায় তার মুখে হাসির ঝলক দেখা যায়।
হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে গত ২০ দিন বাসায় আসেনি শওকত। কারফিউ ঘোষণা হওয়ার আগের দিন বেশ কিছু বাজার সদাই কিনে আনল। নেহা আর নাহিদের জন্য চানাচুর, চিপস, নানারকম বিস্কুট আর চকোলেট আনতে ভোলেনি। এতগুলো দিন পর বাবা আর বাবার সঙ্গে এতরকম প্রিয় খাবার দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল ওরা। দরজা থেকেই রাশেদ কাউকে কাছে না আসার ইঙ্গিত দিয়ে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল—এখনই খেতে শুরু কোরো না যেন! এগুলো বিপদের দিনের জন্য। তারপর মমতাকেও কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত চলে গেল শওকত।
দেড় মাস পার হয়ে গেল। ব্যস্তহীন জীবনের বিষাক্ত ছোবল যেন আর থামবে না কখনো। অবশিষ্ট একটা চিপসের প্যাকেট হাতে নিয়ে মমতার কাছে আসে নেহা। করুণকণ্ঠে বলে—মা, এটা কি এখনও বিপদের দিনের জন্য রেখে দিব? মমতার মুখটা বেদনায় নীল হয়। কোনো কথা না বলে প্যাকেট ছিঁড়ে দুই ভাই-বোনকে চিপস ভাগ করে দেয়। ওরা জানে না কত বড় বড় বিপদ না জেনেই ওরা পার করে এসেছে।
শওকত আর ফিরে আসেনি। ডিউটিতে যাবার সাতদিন পরে করোনা ব্লাড রিপোর্ট পজিটিভ আসে। তারপর কেবল ফোনে কথা হয়েছে কয়েকবার। বাচ্চাদের জানতে দেয়নি সে। বলার সময় এখনও হয়নি বলে মনে হয় মমতার। খবর শোনার পর থেকে আড়ালে গিয়ে নিজের হাতে মুখ চেপে ধরে চিৎকারের শব্দ ঠেকিয়েছে বারবার। বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে সারারাত নীরব কান্নায় ভিজিয়েছে মাথার বালিশ। ওরা শুধু বিশ্বাস করে বিপদের দিন কেটে গেলে বাবা আসবে।
মমতা শরীর আর মনের সমস্ত শক্তি আর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে নেহা আর নাহিদকে। সৃষ্টির্কতার অপার মহিমায় বাচ্চারা সুস্থ আছে এখনও, আছে মমতা নিজেও। তাদের সেফটির জন্য হাসপাতাল থেকে একাধিক ফোন, নানারকম নিদের্শনা, বাসায় এসে ব্লাড টেস্ট আর মমতার অতি সর্তকতায় আজ দুমাস হয়ে গেল তারা টিকে আছে পৃথিবীর বুকে।
সকাল থেকেই আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। এমন মেঘলা দিনে বাসায় থাকলে শওকত মুড়িমাখা খেতে ভালোবাসত খুব। বারান্দায় কাপড় মেলতে গিয়ে এমন ভাবনা যখন আচ্ছন্ন করছিল ঠিক তখনই দুই ছেলেমেয়ের আনন্দধ্বনি শুনতে পায় মমতা। বারান্দা থেকে দ্রুত ঘরের ভেতর ঢোকে সে। খুব চেনা পারফিউমের গন্ধ তার নাকে এসে লাগে। সে পাগলের মতো ছুটে চলে সামনের দিকে। দেখতে পায় মূল দরজার কাছে দাঁড়ানো দুই ছেলেমেয়ের হাতে অনেক চিপস আর চকোলেটের প্যাকেট। মমতা অবাক হয়ে বলে—কে নিয়ে এলো? নেহা খুশিতে ঝলমল করতে করতে বলে—বাবা দিয়ে গেল মা। সেদিনের মতো মুখ ঢেকে এলো। দাঁড়াল না কিছুতেই। মমতা কোনোরকমে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল—বা—বা—!
বসার ঘরের টিভি থেকে তখন সংবাদ পাঠকের কণ্ঠে শিরোণাম শোনা যাচ্ছিল—আর এক সপ্তাহের মধ্যেই খুলে দেয়া হবে দেশের সকল স্থানের লকডাউন।








