করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
১.
সকাল হয়েছে। রিকশার টুংটুং আওয়াজে ঘুম ভেঙেছে মফিজের। মফিজের বয়স সাত-আট বছর৷ বড় বোন শেফালির কাছে সে বাংলা অক্ষর পড়তে শিখেছে৷ শেফালির বয়স পনেরো কি ষোলো। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে তাকে লেখাপড়ার ইতি টানতে হয়েছে৷ শেফালি কাজ করে গার্মেন্টসে। মফিজের বাবা রহমত মিয়া পেশায় রিকশাচালক৷ প্রতিদিনের মতো আজও সে সকাল সকাল রিকশা নিয়ে নেমেছে৷ মফিজের মা রুনু বেগম মানুষের বাসায় গৃহস্থলির কাজ করে৷ মফিজের সারাদিন বস্তিতেই কাটে। তাদের বস্তিতে ছোটছোট অনেক খেলার সাথি আছে। মফিজ প্রতিদিন সকালে উঠে শেফালির শেখানো ছড়া পড়ে৷ ছড়া পড়তে মফিজের ভালোই লাগে৷
প্রতদিনের মতো আজও রহমত মিয়া রিকশা নিয়ে নেমেছে শহরের রাজপথে৷ শেফালির মতো হাজার হাজার গার্মেন্টস কর্মীরা ছুটছে তাদের কর্মস্থলে। রুনু বেগমের মতো কত অসচ্ছল নারীরা মানুষের বাসায় গৃহস্থলির কাজ করে৷ এশহর এ রাজপথ যেন এদের কতই চেনে৷
২.
দুপুরবেলা মফিজের ক্ষুধা মেটে পান্তাভাত খেয়ে। মাঝে মধ্যে রুনু বেগম মফিজের জন্য বাসি তরকারি আনেন।
মফিজ তা দিয়ে হাপুসহুপুস করে ভাত খায়।
‘মা আইজক্যা তরকারি খুব মজা হইছে৷’ বলে মফিজ। রুনু বেগম বিষণ্নতা চেপে বলেন, ‘খা বাজান! ভালো কইরা খা।’
মফিজ ভাত মুখে দিতে দিতে বলে, ‘মা! আমি বড় হইলে তোমারে, বুবুরে আর আব্বারে নিয়া ঘুরতে যামু।’
রুনু বেগম হাসতে হাসতে বলেন, ‘কই যাবি?’
মফিজ বলে, ‘কালাপাহাড়ে৷’
‘কালাপাহাড় কোথায় তুই জানোস?’
মফিজ মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘জানি না তয় হপ্নে দেখছি।’
রুনু বেগম গলায় আহ্লাদের সুর এনে বলেন, ‘ওরে আমার পোলারে। কত হপন। তুই বড় হইলে তোর লইগ্যা একখান লালটুকটুকি বউ আনুম৷’
মফিজ লজ্জা পায়৷ মফিজের মনে হয় সে যেন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে৷
রুনু বেগম হাসে। সেই হাসি যেন ছড়িয়ে পড়ে বস্তির অলিতে গলিতে।
মাঝে মধ্যে মফিজ অনেক কিছু নিয়ে ভাবে৷ এই শহর। শহরের মানুষ; এরা প্রতিদিন ছুটছে কোথায়?
মফিজ আকাশের দিকে তাকায়। কদম গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলোর ঝলকানি দেখে তার ভালোই লাগে। শহরের বড় বড় অট্টালিকাগুলোকে যেন তার দানব মনে হয়। তবুও বড় বড় অট্টালিকাগুলোকে দেখে তার ভালোই লাগে।
৩.
রাত হয়েছে৷ শহর এখনও জেগে আছে৷ বস্তির অধিকাংশ মানুষই ঘুমিয়ে পড়েছে৷ কেউ কেউ জেগে আছে৷ তাদের মধ্যে মফিজ। মফিজের আজ ঘুম আসছে না। গরম পড়তে শুরু করেছে৷ মফিজ তার বাবার সঙ্গে ঘামে লেপটে আছে। বাবা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মফিজ টিনের ফুটো দিয়ে আকাশের দিকে তাকায়৷ আজ পূর্ণিমা। আকাশে চাঁদটা হেসে হেসে আলো ছড়াচ্ছে। টিনের ফুটো দিয়ে সেই আলো এসে পড়েছে মফিজের মুখে। আকাশ কাঁপিয়ে প্লেন যাচ্ছে। রাত গভীর হয়, মফিজ ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্ন দেখার আশায়। এই স্বপ্ন হয়তো মফিজকে আনন্দ দেয়।
প্রতিদিন খেটে খাওয়া মানুষগুলো নির্বিঘ্নে ঘুমিয়েছে প্রতিদিনের মতো৷ নতুন জন্ম নেয়া শিশু কাঁদছে। জীবনের শেষ সময়ে আসা বৃদ্ধরা নিজের সময়টুকু পার করছে তবজি হাতে ইবাদত বন্দেগির মধ্য দিয়ে।
রাত বাড়ে! আকাশের চাঁদটা হাসে। হঠাৎ চারদিকে ছোটাছুটি। মফিজের ঘুম ভেঙেছে। সে দাঁড়িয়ে আছে ঘুম ঘুম চোখে অবাক বিস্ময়ে। তার শরীর কাঁপছে। মানুষজন ছুটছে আগুন, আগুন বলতে বলতে। কেউ বালতি হাতে; কেউ হাড়িপাতিল হাতে। রাক্ষসের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন৷
আকাশের চাঁদটা হেলে পড়েছে। চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলছে। চাঁদের ওপর এসে মেঘ জমেছে৷ যেন চাঁদ এ বিভীষিকার সাক্ষী না হতে পারে৷ সময় গড়ায়৷ লেলিহান আগুনে মানুষের স্বপ্ন পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। চারদিকে কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে৷
সকাল হয়। প্রতিদিনের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর শেষ সম্বল পুড়ে গেল লেলিহান বিভৎস আগুনে। কেউ কাঁদছে; কেউ মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করছে৷ কেউ বিরসমুখে বসে আছে৷ ছোট ছোট বাচ্চাগুলো খাবারের জন্য কাঁদছে। আগুনের স্তূপ ধোঁয়া উড়ছে। উড়ছে স্বপ্নরা।
মফিজের দুচোখ ঘুমে কাঁতর। এক নিমিষেই যেন বদলে গেল সব৷ রুনু বেগম কাঁদছে।রহমত মিয়া বিরসমুখে বিড়ি ধড়িয়েছে৷ শেফালি তার মাকে ধরে কাঁদছে। মফিজের চোখ যায় বড় বড় অট্টালিকাগুলোতে, সেখানে মানুষ কৌতূহলী হয়ে দেখছে৷ পুড়ে যাওয়া স্তূপ থেকে বুনকা বুনকা ধোঁয়া উড়ছে। স্বপ্ন পোড়ার ধোঁয়া!








