করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
‘শোন রে গোপাল, সামনে কালীপুজো আসছে, একটা ভালো কামানোর উপায় বের করেছি।’—সাইকেলটা দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে রাখতে রাখতে বলে নকুদা।
গোপাল তখন রাস্তায় বসে, একটা ভাঙা প্লাস্টিকের বালতি মেরামত করছিল। কথাটা শুনে, সে তাকাল মাথা তুলে।
সিরিটির কাছে যে বস্তিটা আছে, সেখানেই থাকে গোপাল। বহুকাল আগে মা ভালোবেসে নাম রেখেছিল, কিন্তু এখন নামের সঙ্গে তার চেহারায় কোনো মিল নেই। শ্যামবর্ণ, মাঝারি উচ্চতা, বছর চল্লিশ বয়স, ক্ষয় হয়ে যাওয়া চেহারা... যেখানে বুকের পাঁজরগুলো গুনে নেয়া যায়। বস্তির একটা দশ ফুট বাই আট ফুটের টালির চালের ঘরে থাকে সে। বাপটা ছোটবেলাতেই মা-বেটাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবার পরে, মায়ের সঙ্গে এই ঘরেই আছে সে। মা বছরখানেক বিছানায় পড়েছিল, গতবছরের শীতে সে বুড়িও পটল তুলেছে।
পাড়ার লোক বলে, এমন কোনো বড় অসুখ নেই, যা গোপালের হয়নি। ছোট থেকেই টাইফয়েড, জন্ডিস, ম্যালেরিয়া... সবকিছুতেই ভোগা হয়ে গেছে তার। রঙের মিস্তিরির কাজ শিখেছিল পাড়ার মন্টুকাকার কাছ থেকে। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছিল ভালোই। গতবছর রং করতে গিয়ে কার্নিশ থেকে পড়ে, ডান পায়ের হাড়টা যে ভাঙল, সে আর জোড়া লাগল না ঠিক করে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে এখন। আর টুকটাক কাজ করে, কোনোভাবে দিন চলে যায়।
নকুদা আবার বলতে শুরু করল।
‘শ্যামবাজারের একটা ক্লাবের থেকে খবর পেলাম, ওরা এবার কালীপুজোতে একদম অন্য জ্যান্ত ভূতের থিম করছে, মানে হেঁটে চলে বেড়ানো ভূত! অনেক লোক নেবে রে! আমি তোর আর আমার নাম লিখে দিয়েছি!’
গোপাল হতভম্ব! অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল—
‘কিন্তু করতে হবেটা কী?’
‘আরে অতি সামান্য কাজ! সকাল-সন্ধ্যা জোকার সেজে প্যান্ডালের ঠাকুর দেখতে আসা পাবলিককে চমকে দেয়া! এরকম পাতি কাজের জন্য পয়সা পাওয়া যাবে, এটা তো ভাবাই যায় না! আরে চল না, আমিও তো আছি!’
গোপালের এই চল্লিশ বছরের জীবনে, ফ্রেন্ড-ফিলোসফার-গাইড বলে যদি কেউ থেকে থাকে, তবে সে হলো এই নকুলেশ্বর ধর, ওরফে নকুদা। গোলগাল মহাদেবের মতোই চেহারা, শুধু মাথায় জটার বদলে মস্ত একটা টাক! একটা ছেলের খুব বাসনা ছিল ওনার। তাই ছেলে ছেলে করে, পরপর তিনটে মেয়ে হবার পর থেকে, রোজগারের চিন্তায় সবসময় মগ্ন থাকে সে।
মাঝেমধ্যে বাড়তি কটা টাকা রোজগার হলে, নকুদা একটা দেশির বোতল নিয়ে চলে আসে গোপালের ঝুপড়িতে। তারপর কোনো কোনো দিন, নেশার ঘোরে বেরিয়ে আসে তার বুকে জমে থাকা কষ্টের কথা।
‘শালা...! সংসার করিসনি গোপাল, তাই বেঁচে গেছিস। আমার এই বেঁচে থাকাটা একটা লাইফ? চুতিয়ার মতো জীবন! এই চুতিয়া জীবনের শেষ দেখে ছাড়ব... কোনোদিন কান্নাকাটি করবে না এই নকু...।’
গোপাল কিছু বলে না, শুধু ঘষা কাচের মতো ভাবলেশহীন চোখে দেখতে থাকে।
পরেরদিনই নকুদার সঙ্গে গিয়ে, ক্লাবে নাম লিখে এল সে। সারাদিন খাওয়া, এক প্যাকেট বিড়ি আর তিনশ টাকা পাওয়া যাবে প্রতিদিন। লোক ফিটিং করা আছে, এলেই তারা সাজিয়ে দেবে। সব মিলিয়ে, তিন দিনের কাজ, আর পেমেন্ট ডেইলি।
প্রথমদিন একটু নার্ভাস ছিল গোপাল। তাকে বেশ রং-চঙে করে সাজানো হয়েছে, যার মাথায় রয়েছে একটা বিরাট ঝাঁকড়া চুলের টুপি, আর নাকে একটা লাল বল। তার ওপরে সে হাঁটেও একটু খুঁড়িয়ে। তাই সব মিলিয়ে তাকে অনেকেই বলতে লাগল‘খোঁড়া জোকার’!
প্রথমদিনই বেশ অন্যরকম অনুভূতি হলো গোপালের। এখানে সেই হেরে যাওয়া গোপালকে কেউ চেনে না। যারা ঠাকুর দেখতে আসছে, তাদের মধ্যে অনেকেই তার সঙ্গে সেলফি তুলছে, আবার কেউ কেউ বেশ চমকে গিয়ে ভয়ে ‘বাবা গো... মা গো...’ করছে! রাতে বাড়ি ফেরার পথে, নিজেকে বেশ শক্তিশালী মনে হতে লাগল তার। নকুদা সেজেছে কিং কং, সেও খুব প্রশংসা করতে লাগল গোপালের কাজের।
দ্বিতীয় দিনে, মেকআপের পরে গোপাল যেন সত্যিই এক জোকারে পরিণত হলো। মণ্ডপের চারপাশ দাপিয়ে বেড়াতে লাগল সে।
সমস্যাটা হলো তৃতীয়দিনের সন্ধ্যায়। ভিড় একটু কম দেখে, এক ফাঁকে একটু বিড়ি টানতে মণ্ডপের পেছনের দিকটা গেছিল সে। হঠাৎ লক্ষ করল, একটা বছর পাঁচেকের মেয়ে, তার দিকে গোল গোল চোখ করে দেখছে। গোপাল একটু অঙ্গভঙ্গি করতেই, সে হাউমাউ করে চিৎকার করে ছুটে পালাল।
এরপরেই যে অবস্থাটার সম্মুখীন হলো গোপাল, সেটা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনজন মাস্তানগোছের লোক, গোপালকে ঘিরে ফেলল।
‘হারামজাদা, আমাদের বিশুদার মেয়েকে ভয় দেখানো? তোর বেশি পাকামি ঘুচিয়ে দিচ্ছি!’
এই বলতে বলতেই, একটা প্রচণ্ড ঘুসি এসে পড়ল গোপালের মুখে। নাক দিয়ে একটা গরম স্রোত নামছে, অনুভব করতে পারল সে। হাত দিয়ে দেখল, রক্ত ঝরছে। পরের ঘুসিটা চোয়াল লাগার পড়ে, ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল গোপাল। বুঝতে পারল, চারদিক থেকে এলোপাথাড়ি লাথি এসে লাগছে বুকে ও পিঠে। অসহ্য যন্ত্রণার চোটে, জ্ঞান হারাল সে।
চোখ যখন খুলল, নিজেকে হসপিটালের খাটে আবিষ্কার করল সে। পাশে নকুদা বসে ঝরঝর করে কাঁদছে। খাট থেকে নেমে এসে সেনকুদার পাশে দাঁড়াল।
‘কী রে নকুদা! তুই না বলেছিলি... তুই কখনো কাঁদিস না!তাও কাঁদছিস! আরে আমি তো ঠিক আছি!’
নকুদা যেন শুনতেই পাচ্ছে না,দেখতেও পাচ্ছে না,অঝোরে কেঁদেই চলেছে!
ভাবতে ভাবতে চোখ পড়ল পেছনে...
বিছানায় পড়ে আছে ওর ব্যান্ডেজ বাঁধা নিথর দেহটা!
সঙ্গে সঙ্গে নিজের নাকে হাত চলে গেল গোপালের...
সেই লাল বলটা এখনও লেগে আছে নাকের সঙ্গে!








