করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
অস্পৃশ্য প্রকৃতি ঘিরে রেখেছে আমাকে। আমার বাসাকে।আমার পরিবারকে। আমার সন্তানকে।
আমার বাসাটা বাংলাবাজার প্যারিদাস রোড। বাসায় এক ফোঁটা রোদ ঢোকেনা।আর চাঁদের আলো! সেতো অমাবস্যার মতোই কখনো সেই বাসায় ঢোকে না। রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া দশতলা বিল্ডিংয়ের তিনতলায় বাসা। বাসা থেকে জানালা খুললেই চোখে পড়ে অসংখ্য মানুষের মিছিল। তার সঙ্গে আছে রিকশা ভ্যান সাইকেল ট্রাক্টর প্রাইভেট কারের গলাফাটা ওয়াজ। এসবই আমাকে ও আমার সন্তানকে বিষিয়ে তুলেছে।আমার আড়াই বছরের সন্তান একটু রোদ পোহাবে। একটু হাঁটবে। চাঁদের আলোয় হাসবে এমন সুযোগ আর নেই।
দিন নেই রাত নেই অদৃশ্য হাওয়া থেকে ভেসে আসে রিকশার টুংটাং শব্দ। গাড়ির পিপ পিপ শব্দ। আরও কত ধরনের শব্দ। এই অজস্র শব্দ, শব্দের বলিহারি খেলা আমাকে আমার সন্তানকে ক্রমশ প্রকৃতি ও তার স্নিগ্ধ রূপকে বোঝার ক্ষেত্রে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য দেয়াল। আমার মনে হচ্ছিল আমার সন্তান যেন বয়লার মুরগির বাচ্চার মতো ঘরবন্দি হয়ে বড় হচ্ছে। তার মা তার সন্তানকে বড় করার জন্য নাওয়া-খাওয়া নেই। সারাক্ষণ লেগে আছে। যখন যা প্রয়োজন তার জন্য তাই করছে। ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময় পরপর খাওয়াচ্ছে। ঘুম পাড়াচ্ছে। স্নান করাচ্ছে। হাসি খেলা করছে, কিন্তু প্রকৃতি। মুক্ত হাওয়া। মুক্ত মাঠ এগুলো কিছুই দিতে পারছে না। আমি যেভাবে বড় হয়েছিলাম। প্রকৃতির কোলে খেলা করেছিলাম। আর কোনো টাইমে সে পাচ্ছে না। প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পর এনিয়ে আমার মনটাই বিষণ্নতায় নিমজ্জিত থাকে।
আমি ঢের বুঝতে পারছিলাম। আমার সন্তান যদি এই টুংটাং শব্দে চার দেয়ালে বড় হতে থাকে একসময় সে হয়তো পাখির সুর করা গান, প্রকৃতির সুমিষ্ট গন্ধ,বৃষ্টির রিমঝিম আওয়াজ মন থেকে মেনে নিতে পারবে না। কেননা শৈশব-কৈশোর যার শূন্য কলসি সে কেমন করে বুঝবে প্রকৃতির অমলিন নির্মল স্নিগ্ধ রূপ ও শব্দ। তাই আমি খুঁজতে থাকলাম সরকারি কোয়ার্টার। যে কোয়ার্টারে প্রাণ প্রকৃতি ও পাখিদের গান আছে। বাতাসের নাচ আছে। বৃষ্টির কাঁচা গন্ধ আছে। রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ আছে। খেলার একটা ছোট্ট মাঠ আছে।
দু-একজন কলিগকে আমার বাসা খোঁজার বিষয়টি শেয়ার করলাম। কলিগদের কেউ কেউ বলল তুমি যেমন চাচ্ছ এমন বাসা পাওয়া খুব কঠিন হবে। তবে সহজ হতে পারে তুমি যদি একটু তেল-পানি খরচ করতে পারো। আবাসনের কোনো কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করতে পারো তোমার বাসা জুটে যাবে। আমার পরিচিত এক কলিগ অতি সম্প্রতি একটি সরকারি কোয়াটারের বাসায় উঠেছে। তাকে বলে রাখলাম ওখানে যদি কোনো বাসা খালি হয় তাহলে যেন আমাকে জানায়। ইতোমধ্যে আমার পরিচিত খুব কাছের যারা সরকারি আবাসনে উঠেছে তারা কীভাবে বাসা পেল? কার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করলে ভালো হবে? কার সুপারিশে কাজ হবে? সে বিষয়ে ঢের জেনেছিলাম। জানতে জানতে হঠাৎ করে একদিন আমার জানার অবসান হলো। সুন্দর একটি বাসার সন্ধান পেলাম। যে বাসায় সকালে পুবের সূর্য উঁকি দেয়। রাতের চাঁদ আছড়ে পড়ে। রিমরিম মিহিমিহি বাতাস খেলা করে। হঠাৎ করে একদিন বউকে ফোন দিয়ে সে বাসায় নিয়ে গেলাম। বাসা দেখে মোটামুটি তার পছন্দ হলো। এইতো এভাবেই নতুন এক বাসায় আমরা উঠে পড়লাম।
আমি লক্ষ করলাম। আমার মধ্যে আগের চেয়ে চিত্তচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার মেয়ের মধ্যেও তা প্রবাহিত হয়েছে। অফিস থেকে বিকেলে ফিরলেই বলতে থাকে—বাবা, আমি নিচে যাব। আমি হাঁটব। আমি দৌড়াব। আগের চেয়ে তার মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য অনেক বেশি। মনের মধ্যে স্নিগ্ধ সমীরণের খেলা আনন্দে উদ্ভাসিত করে। এইতো আমি চেয়েছিলাম। আমার মেয়ে খেলবে। হাসবে।প্রকৃতির কোলে বড় হবে।
বাসার পেছনে একটি কাঁঠাল গাছ আছে। কাঁঠাল গাছে কাক বাসা বেঁধেছে তিনটি ছোট বাচ্চা দিয়েছে। আমার মেয়েটি এখন প্রতিদিন সকালে বায়না ধরে কাক তার বাচ্চাকে কীকীভাবে খাওয়াচ্ছে সেটা দেখবে। এক প্রকৃতি আরেক প্রকৃতিকে দেখে শিখতে চায়। এ চাওয়া অন্যায় নয়। বরংনিজেদের মধ্যে আত্মিক বন্ধনের একটা সূত্রপাত।এ বন্ধনটা যেমন মানুষে মানুষে প্রয়োজন তেমনি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের হৃদ্যতা অবিচল থাকার জন্য কার্যকরী ওষুধ। মানুষ প্রকৃতির সন্তান। তাই প্রকৃতি ব্যতীত ভালোভাবে বাঁচতে পারে না। প্রকৃতির কোলে হেসে খেলে সন্তানের বেড়ে ওঠার দৃশ্য দেখে আমি মুগ্ধ। প্রতিটি বাবা-মাই চায় তার সন্তান হাসিখুশি থাকুক। কংক্রিট ইট আর সিমেন্ট দিয়ে ঘেরা আলোকোজ্জ্বল শহর নগর হয়েছে কিন্তু প্রকৃতিকে আস্তে আস্তে গলা টিপে হত্যা করেছে।








