করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
মানুষ বলে মারি ও মৃত্যুর দিন, আর কতদিন, এর কি নেই শেষ…
অথচ আমরা দেখি আসছে সৃজন যজ্ঞ; উদয় রাগে প্রস্তুত হচ্ছে পৃথিবী!
জামার আস্তিনে গুটানো বেদনার মতো স্থবির একেকটি শহর, দুশর অধিক দেশ এবং গোটা পৃথিবী; মরে যাচ্ছে নিজস্বতা হারিয়ে—ওরা বলে। বলে আর বিলাপ করে। ওদের জ্ঞানচক্ষুতে প্রকৃতি অপার্থিব আলো আর দেয় না বলে ওরা জানেনা— এই স্থৈর্য, এই নৈঃশব্দ্য; এই মরে যাওয়া; এ শুধু পুনঃসৃষ্টিযজ্ঞে গভীর মনোনিবেশ মাত্র!
পরিচিত রৌদ্রে স্নান শেষে হেসে ওঠা এক আলটুসে দুপুরে দেখতে থাকি একটি ছেলে বের হয়েছে রাস্তায়। ঘরের নিরাপত্তা তুচ্ছ করা ছেলেটির চকিত ভীত পদক্ষেপ, নির্ভরতা খুঁজছে যেন।
ছেলেটা আমাদের দেখতে পায়না, যেমন পায়না পৃথিবীর আরও সাতশ কোটি মানুষ। অথচ আমরা ঠিকই ছেলেটির শ্বাসযন্ত্রে বাসা বাঁধব, বংশবিস্তার শেষে একসময় আমাদের বেশিরভাগ বন্ধু ছেলেটিকে ত্যাগ করে খুঁজে নেবে নতুন, সম্পন্ন এক পোষকের দেহ।
ছেলেটা ভয়ে ভয়ে আগায়, আমরা দেখতে থাকি। রাস্তায় টহল পুলিশের বা সেনাসদস্যের দেখা মেলে না। দেশটির সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়েছে। বিশ-শত-বিশ থেকে চলছে লড়াই, গেল তিন বছরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা বা শৃঙ্খলা সমস্ত ভেঙে পড়া দেশে চিকিৎসক বা নার্সের দারুণ সংকট। বাইরের সাহায্য বন্ধ। সামাজিক দূরত্বের ভাঙা রেকর্ড বাজাতে থাকা যন্ত্রগুলো দেখতে পেলে আশ্চর্য হতো, হাসপাতালের লম্বা লাইনে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো লোকের সারি মাইল ছাড়িয়ে যাচ্ছে, সারারাত সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেও চিকিৎসা মেলেনা—এর মাঝেই কেউ কেউ মরে পড়ে থাকে। কেউ ছুঁয়েও দেখে না সে মৃতদেহ, সৎকারের অভাবে পচে গলে দুর্গন্ধ বের হলেও কারও নাকে এখন প্রতিক্রিয়া হয় না—মরা মানুষের গন্ধ এখন খুব স্বাভাবিক!
ছেলেটা যখন বুঝতে পারে, অলি-গলি কিংবা রাজপথ, যাবার কোনো পথে তল্লাশি করবার মতো কেউ নেই, তখন সে সহজ হয়ে আসে। ভেতরের চঞ্চলতা গান হয়ে বের হয়। চোখের অনেক সতর্ক দৃষ্টির মাঝেও টের পাওয়া যায় আর্দ্র প্রেমের পরাগ ফুটে আছে। ছেলেটা ফুল খুঁজছে; রক্তের মতো রাঙা গোলাপ। দিন পনেরো হলো মেয়েটির সঙ্গে কথা হয় না ওর। মেয়েটি, যাকে ও হৃদয় দিয়েছে, তার বাবা আর মা মরেছে গত বছর, ছোট দুটো ভাই হাসপাতালে; এই অবস্থায় মেয়েটির সংবাদ নেই—দুশ্চিন্তা হবার কথা যে কারও।
অথচ ছেলেটা হাসছে, সে যেন জানে আজ প্রিয়তমার খোঁপায় বসরার গোলাপ তার সমস্ত সুবাস নিয়ে আশ্রয় নেবে আর ছেলেটা মেখে দেবে ভালোবাসার সিলমোহর—অপার্থিব প্রেমচুম্বন! ছেলেটা হেসে ওঠে, ওর হাতদুটো রক্তগোলাপের টকটকে লালে ভরে যায়। মেয়েটার বাড়ি আর দুব্লক সামনেই। ফেসবুকে আর ফোনেই যা যোগাযোগ, স্বেচ্ছা দূরত্ব আর গৃহ অমনিবাসের প্রলম্বিত দিনগুলোতে এর বেশি আশা করা যায় না, জানে ছেলেটা।
মেয়েটার বাড়িতে পৌঁছে গেছে ছেলেটা। আমরা দেখতে থাকি, কল-বেল চাপা হচ্ছে। আমাদের কিছু বন্ধু নাকের ফুটো দিয়ে ছেলেটার দেহে প্রবেশ করেছে। মেয়েটা গেট না খোলায় ছেলেটা ধাক্কা দেবার চেষ্টা করে দেখতে পায় দরজা খোলা। বাড়ির অন্য ফ্ল্যাটগুলোও খালি, ঠিক যেমন মেয়েটির। শোবার ঘরে গেলে ছেলেটা দেখতে পায়, মেয়েটির পচে যাওয়া মৃতদেহ খাটে শুয়ে আছে তার চুল বাড়াবাড়ি রকম সোজা হয়ে কোমর ছুঁয়ে আছে, ছেলেটা সেই চুলে একটা লাল গোলাপ দিয়ে দেয়।
মেয়েটার পচে যাওয়া হাত ধরে অনেকটা সময় বসে থাকে নিঃশব্দে, আর তারপর ঘরের পথে পা বাড়ায়। আর আমরা কাজে নেমে পড়ি, আধঘণ্টার বিরতি শেষে আমাদের ডাক পড়েছে গুলশান অ্যাভিনিউতে যাবার।








