X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
প্রবন্ধ

এইচ জি ওয়েলস যদি বেঁচে থাকতেন! : মূল : এলিফ শাফাক 

অনুবাদ : অসীম নন্দন
১১ অক্টোবর ২০২১, ১৭:০৩আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২১, ১৭:০৩

যখন আমি তুরস্কে শিক্ষার্থী ছিলাম তখন এইচ জি ওয়েলসের বই আমি প্রথম হাতে পেয়েছিলাম। রাস্তার পাশের একটা পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে বইটা কিনেছিলাম। মাঝে মাঝেই আমি সেইখানে বই কিনতে কিংবা হেভি-মেটাল গানের এলবাম কিনতে যেতাম। বইটার কভার বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল, পাতাগুলো মলিন হয়ে গিয়েছিল, বইটা তার আগের মালিকের চিহ্ন বহন করছিল। বইটার নাম ‘দ্যা ফার্স্ট হিউম্যান ইন দ্যা মুন’ ছিল। পরবর্তী সময়ে আমি আবিষ্কার করেছিলাম, সেই তুর্কি অনুবাদের বইটা লিঙ্গ নিরপেক্ষ হলেও, মূল বই 'দ্যা ফার্স্ট ম্যান ইন দ্যা মুন' সেরকম নিরপেক্ষ ছিল না।

সেই সময় আমি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে তেমন আগ্রহী ছিলাম না। তবুও কেন বইটা কিনেছিলাম তা এখন ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে। কিন্তু পড়ার ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব দেইনি তখন। তারপর একসময় আমি রাশিয়ান সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। গোগল'র 'ডেড সোল' এবং দস্তয়েভস্কি'র 'নোটস ফ্রম আ ডেড হাউজ' আর 'ব্রাদার কারমাজভ' আমাকে অভিভূত করেছিল। তখন 'কঠোর সোসিও-পলিটিকাল বাস্তবতা'র বই পড়ার প্রতি আমার ঝোঁক বেড়ে গিয়েছিল। এজন্য আমি এইচ জি ওয়েলসের বইটাকে অবমূল্যায়ন করেছিলাম, এবং অনেক অনেক দিন বইটাকে অপঠিত অবস্থাতেই আমার বুকশেলফে রেখে দিয়েছিলাম। 

২০ বছর বয়সে যখন লেখক হবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমি আঙ্কারা থেকে ইস্তাম্বুল চলে আসি, তখন সেই বইটাকে ফেলে আসার অনেক কারণ থাকা সত্ত্বেও আমি কেন যেন সাথেই নিয়ে এসেছিলাম। আমি তাকসিম স্কয়ারের কাজান্চি ইয়োকোসু সড়কে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলাম। এজেন্টরা আমাকে নিশ্চয়তা দিয়েছিল যে, এই ফ্ল্যাট থেকে আমি বাইরের সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাব। যদি আপনি একটা টুল নিয়ে আমার বসার ঘরের কোনার একমাত্র জানালায় গিয়ে বসতেন, যদিও সেই ঘরটাই আমার পড়ার এবং শোবার ঘর ছিল, তাহলে সেখান থেকে ডানদিকে চোখ ফেরালেই স্বচ্ছ মুক্ত আকাশ চোখে পড়ত, যেখানে কোনো কুয়াশা ছিল না, আর চোখে পড়ত বসফোরাস সাগরের রুপালি নীল কিছু অংশ। 

'দ্যা ফার্স্ট ম্যান ইন দ্যা মুন' বইটা আমি ইস্তাম্বুলের সেই ফ্ল্যাট বাসায় থাকার সময় পড়তে শুরু করেছিলাম। ওয়েলসের সেই চাঁদের দেশের ঝলমলে গুহা আর অস্থির আবহাওয়ার সাথে আমার পুরানো মেগাসিটির কল্পনা মিলে গিয়েছিল। সেলেনাইটস, সামাজিক জটিলতা আর চাঁদের দেশে প্রযুক্তিগত বাস্তবতার জগৎকে বুঝতে পারা আমার জন্য কঠিন ছিল। পরবর্তীতে আমি এই ব্যাপারগুলা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে পেরেছিলাম, যা আর অন্য কোনো ইস্তাম্বুলের মানুষ পারেনি।

ওয়েলস এমন একজন লেখক ছিলেন, যিনি বিজ্ঞানের সাথে সাথে অন্যান্য জনরাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে গল্প লিখতে পারতেন। এই ব্যাপারটাই তাঁকে তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য লেখকের চেয়ে আলাদাভাবে পরিচিত করেছিল। তিনি যেমন আমাদের নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে পেরেছিলেন, ঠিক একইভাবে তিনি প্রযুক্তিগত অসুবিধার ব্যাপারগুলোও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

ওয়েলস তাঁর লেখায় স্পেস ট্রাভেল থেকে জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা এটম বোমা থেকে ইন্টারনেট এমন ভবিষ্যতের সকল উপাদানই ধারণ করেছিলেন। তাঁর সময়ে তাঁর মতন করে এমনভাবে ভবিষ্যৎকে আর কেউ দেখতে পারেনি।

তিনি যদি বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি তাঁর দুনিয়াকে কীভাবে সাজাতেন? আমি আসলে জানতে চাই, এই লাগামহীন আশাবাদের যুগে তিনি লিবারেল পলিটিশিয়ান, পলিটিকাল সাইন্টিস্ট আর সিলিকন ভেলির মতো বিষয় সম্পর্কে কী ভাবতেন? সকল জায়গায় পশ্চিমের গণতান্ত্রিক ধারণার এই যে এত জয়জয়কার আর ডিজিটাল টেকনোলজির যে পরিমাণ বিস্তার, তাতে পুরো পৃথিবীটা একটা ডেমোক্রেটিক গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হতে আর বেশি দেরি নেই। একটা সহজ-সরল আশাবাদী ব্যাপার হলো, আপনি যদি বর্ডার পেরিয়ে তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারেন আর সেই তথ্য জনগণ অনায়াসে পেয়ে যায় তবে সঠিক সময়েই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। যদি সংজ্ঞা অনুসারে ইতিহাস একরৈখিক এবং প্রগতিশীলই হয়, লিবারেল ডেমোক্রেসির যদি আর কোনো অন্য অর্থ বের করা না হয় তবে ভবিষ্যতের মানুষের অধিকার, আইন-কানুন, মত প্রকাশের অধিকার কিংবা মিডিয়া ডাইভার্সিটির বিষয়ে আপনাকে কেন দুশ্চিন্তা করতে হবে? পশ্চিমের বিশ্ব যেমন নিরাপদ, নিরেট, সুস্থির ছিল; যা এই গণতন্ত্রেরই অবদান তা তো ধ্বংস করা যায় না। যারা একবার গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে তারা কেমন করে গণতন্ত্রের ডানা কেটে ফেলতে চাইবে? 

প্রথমত, দ্বৈতবাদী চিন্তাভাবনা বর্তমান পৃথিবী থেকে এখন গায়েব হয়ে গেছে। আমাদের পায়ের নিচের মাটি এখন আর তেমন অটুট মনে হয় না। আমরা এখন আশঙ্কার যুগে ঢুকে পড়েছি। আমাদের সময়টা এখন হতাশার যুগ। আমাদের দুনিয়াটা এখন বেদনার জগৎ। যদি ওয়েলস আজকের দিনে বেঁচে থাকতেন তবে ডিজিটাল টেকনোলজির মাধ্যমে এই পোলারাইজেশন, স্বৈরতন্ত্রের জনপ্রিয়তা আর ভুল তথ্যের মাধ্যমে বুদ্ধিকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতন ব্যাপারগুলোকে কীভাবে দেখতেন? 

ওয়েলস তাঁর কাহিনিগুলোতে অনেক শক্তিশালী রাজনৈতিক, সামাজিক এবং বৈজ্ঞানিক মতামত লিখেছিলেন। তাঁর মতে মানব ইতিহাস আসলে ‘জ্ঞান এবং সর্বনাশের মাঝে প্রতিযোগিতা’ হয়ে উঠেছে। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন ‘মানব ইতিহাস হলো আদতে একটা ঐতিহাসিক চিন্তা’। ওয়েলস কখনো নিজের দেশ, সময় এবং নিজেকে নিয়ে সমালোচনা করতে ভয় পেতেন না। তিনি নিজেকে নিয়ে এবং নিজের ভুল-ত্রুটিগুলো নিয়েও মজা করতে পারতেন। আর ইংরেজ ভাষা-সংস্কৃতি, সমাজকে সেই সময় যেভাবে মহান ভাবা হতো; এরকম চিন্তাকেও তিনি সমালোচনা করতেন। 

নেটিভিজমকে কীভাবে মহান করে তোলা হয়েছে, তার ভুরি-ভুরি উদাহরণ ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু ওয়েল ইন্টারন্যাশনালিজমে আগ্রহী ছিলেন। এটাই একমাত্র রাস্তা যার দ্বারা দ্বি-বিভাজনকে অতিক্রম করা সম্ভব। আর বর্তমান যুগটা এমন একটা সময়, এই সময়ে আমাদেরকে আন্তর্জাতিক ঐক্য এবং সম্প্রীতি বজায় রাখতেই হবে। 

আমরা পরস্পরের সাথে কতটা গভীরভাবে সংযুক্ত কোভিড-১৯ তা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। আবহাওয়া-সংকট আরো পরিষ্কারভাবে ধারণা দিয়েছে যে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং থেকে দুনিয়ার কোনো অংশই বাঁচতে পারবে না। একসেপশনালিজম, নেটিভিজম কিংবা আইসোলেশনিজম দ্বারা ভবিষ্যতের এই বিশাল চ্যালেঞ্জগুলো কেউ মোকাবিলা করতে পারবে না। যখন আমাদের আন্তর্জাতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত ছিল, তখন আমরা অঞ্চলভিত্তিক ভ্যাকসিন দেওয়ার মতন ঘটনা ঘটিয়েছি। এই ব্যাপার আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক। আজকে যদি ওয়েলস বেঁচে থাকতেন, এইসব ব্যাপার দেখে সে নিশ্চয়ই হতাশ হতেন। 

গণতন্ত্র এমন কোনো সনদপত্র নয়, যা একবার অর্জিত হয়ে গেলে তা দিয়ে দেয়ালের ফাটল লুকানো সম্ভব হবে। এইটা একটা বাস্তুবিদ্যার মতন ব্যাপার। একে সবসময়ই যত্ন করতে হয়। ব্যালট বাক্স কোনো বহুত্ববাদী গণতন্ত্র নয়। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে কিছু বছর পরপর নির্বাচন হয়, কিন্তু সেখানে সেই অর্থে কোনো গণতন্ত্র নেই। আধিপত্যবাদ আর গণতন্ত্র এক জিনিস নয়। 

ব্যালট বাক্সের সাথে সাথে গণতন্ত্রে আইনকানুন, ক্ষমতার সুষম-বণ্টন, মিডিয়ার বৈচিত্র্য, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, নারী-অধিকার, এলজিবিটিকিউ অধিকার এসবও থাকতে হবে। যখন গণতন্ত্রের মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে, রাজনীতির ভাষা যখন সামরিক রূপকথায় পর্যবসিত হয়, তখন আমরা মারাত্মক বিপজ্জনক একটা দুনিয়ায় ঢুকে পড়ি। ক্ষমতার একক-আধিপত্য বিপজ্জনক ব্যাপার। সমাজের কোনো রাজনীতিবিদ, কোনো রাজনৈতিক দল, এবং কোনো টেক-কোম্পানিরই একক-ক্ষমতা থাকা উচিত নয়।

ইতিহাসকে যে স্থিরভাবে একরৈখিক প্রগতিশীলতার দিকেই যেতে হবে, তার কোনো মানে হয় না। আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও তাদের আগের প্রজন্মের মতন একই ভুল করতে পারে। যখনই একটা দেশ একটু পশ্চাৎপদ হয়, তখনই সেই দেশের নারী এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে দেখা যায়। 

ওয়েলস চিন্তাভিত্তিক সাহিত্যে বিশ্বাস করতেন। তিনি দুনিয়াকে প্রশ্ন করতে ভয় পেতেন না। তিনি এমন একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে ‘মেয়েরাও ছেলেদের মতন স্বাধীন’। ট্যাবু বিষয়ে লেখার সময় তিনি যে কেবল লিঙ্গ-সমতাকেই সমর্থন করতেন তা-ই নয়; তিনি মেয়েদের যৌন-অধিকারকেও সমর্থন করতেন। আমি আরো একটি বিষয় খুঁজে পেয়েছি। তিনি যে-সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করতেন সেই সময়ে এই ব্যাপারটা ততটাও সহজ বিষয় ছিল না। 

এইচ জি ওয়েলস অসমতাকে ভালোভাবে বুঝেছিলেন। তিনি জানতেন, মানুষের জীবন ও আনন্দকে এই অসমতা কীভাবে গিলে ফেলতে পারে। তিনি হতাশাকেও বুঝেছিলেন। ‘দ্যা রাইটস অব ম্যান’ নামের আইকনিক বইয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আমরা আজকের দিনের জটিলতাকে মোকাবিলা করতে না পারি, নতুন দুনিয়ার হালচাল না বুঝি, জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে না পারি, তবে সুপার-নাজিবাহিনীর মতন যুদ্ধ করতে করতেই আমাদের মানবজাতিটা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

/জেডএস/
বিএসআরএফ-ওয়ালটন স্পোর্টস ফেস্টিভ্যাল শুরু সোমবার  
বিএসআরএফ-ওয়ালটন স্পোর্টস ফেস্টিভ্যাল শুরু সোমবার  
চীনে টানা চতুর্থ দিনের মতো কোভিড শনাক্তের রেকর্ড
চীনে টানা চতুর্থ দিনের মতো কোভিড শনাক্তের রেকর্ড
সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ৩ আগস্ট
সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি ৩ আগস্ট
ঋণ খেলাপের অভিযোগে গ্রেফতার ১২ কৃষক জামিন পেয়েছেন
ঋণ খেলাপের অভিযোগে গ্রেফতার ১২ কৃষক জামিন পেয়েছেন
সর্বাধিক পঠিত
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী