উত্তরে একটা পাহাড়, দক্ষিণে একটা লেক, পশ্চিমে রাস্তা, পূর্বে একটা নদী ।। লাসলো ক্রাসনাহোরকাই

অনুবাদ: ওয়াহিদ কায়সার
১৩ অক্টোবর ২০২৫, ১৫:৪৫আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৫, ১৫:৪৫

এই অংশটুকু নোবেলজয়ী লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাস ‘উত্তরে একটা পাহাড়, দক্ষিণে একটা লেক, পশ্চিমে রাস্তা, পূর্বে একটা নদী’-এর সপ্তদশ ও অষ্টাদশ অধ্যায়ের অনুবাদ।


১৭
সবকিছু অক্ষত ছিল, এবং আশ্রমের সবকিছু অক্ষত বলে মনে হচ্ছিল। কোন্দোর ভেতরের নীরবতাকে কোনো কিছু ব্যাহত করতে পারেনি। বাইরে ধূপ জ্বালানোর পাত্র থেকে চন্দনের সুগন্ধি ধোঁয়া ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে আসছিল, যেটা কিছুক্ষণ আগেও জ্বলছিল। দামি কাশি-ওক (এক ধরনের গাছ) কাঠের টুকরোর ওপর বুদ্ধ মূর্তি খোদাই করা। এটা আকারে ছোটো একটা শিশুর চেয়ে বড়ো না। বেদির মাঝখানে কাঠের একটা বাক্সের ভেতরে স্থিরভাবে বুদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাক্সটার ভেতরে ও বাইরে প্রচুর পরিমাণে সোনালি রং করা একটা বিশেষ সুরক্ষার ইঙ্গিত দেয়। পেছনের দিকে বাক্সটা একটা পাতলা দেয়াল দিয়ে বন্ধ করা ছিল; এর অন্য তিনটি পার্শ্ব সূক্ষ্ম কাঠের ট্রেলিসওয়ার্ক দিয়ে তৈরি করা যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণে আলো বাক্সের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে এটার ভেতরের বাসিন্দা কিছুটা হলেও দৃশ্যমান, এবং যদি একজন বিশ্বাসী তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তাহলে সেখান থেকে সে বিশ্ব সম্পর্কে কিছুটা সচেতনতা অর্জন করতে পারবে। তিনি ছিলেন গতিহীন, তিনি কখনও বদলাননি। তিনি এক হাজার বছর ধরে একই স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সবসময় তাঁর নিজের জায়গায়, অনেক বেশি সুরক্ষিত, সোনালি কাঠের বাক্সের ঠিক মাঝখানে অবিচলভাবে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, সবসময় একই পোশাকে, সবসময় অভিজাত অঙ্গভঙ্গিতে হিমায়িত, এবং সেই এক হাজার বছরে তাঁর দেহের এই ভঙ্গিমা, সুন্দর ও বিখ্যাত এই দৃষ্টির কিছুই বদলায়নি: তাঁর এই বিষাদের মাঝে হৃদয়বিদারকভাবে পরিশীলিত কোনো কিছু একটা ছিল, বর্ণনা করা যাবে না এমন মহৎ কিছু। তাঁর চাহনি সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে পৃথিবীর দিক থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। তাঁর সম্পর্কে বলা হতো যে তিনি নিজের মাথা পেছনে ঘুরিয়েছিলেন কারণ পেছনে তিনি এইকান নামে পরিচিত এক সন্ন্যাসীর দিকে তাকাচ্ছিলেন, যার কথা এত সুন্দর ছিল যে তিনি, বুদ্ধ, জানতে চেয়েছিলেন যে কে কথা বলছে। তবে সত্যটা ছিল একেবারেই আলাদা, এবং যে কেউ তাঁকে দেখত সে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারত যে বুদ্ধ তাঁর সুন্দর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলেন যাতে তাঁকে সামনের দিকে তাকাতে না হয়, যাতে তাঁকে কোনো কিছু না দেখতে হয়, যাতে তাকে তাঁর সামনের তিন দিকে—এই দুর্বিষহ পৃথিবীতে—কী আছে সেই সম্পর্কে আর সচেতন না হতে হয়।


প্রচ্ছদ ১৮
আশ্রমটা একসময় বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল, যদিও পুড়ে যাওয়া তীর্থযাত্রীদের বাসস্থান এবং সাধারণ মানুষের অতিথিশালা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট ছিল শুধু নিলামে তোলা বাঁশের বাগান এবং ছেঁটে ফেলা লার্চ গাছের বন। এখনও আশ্রমের মাঠটাকে বিশাল বলাটা যথেষ্ট, যেমনটা ঠিক আগে ছিল। তাই আজ এই প্রশংসার যোগ্য নামকরণ সম্ভবত এর সঠিক মাত্রার কারণে সম্ভব হয়নি, যেমনটা হাজার বছরে আগে ছিল। ঠিক যেমনটা মালিকানা রেজিস্ট্রিতে রি এবং চো এবং জো পরিমাপ ব্যবহার করে উল্লেখ করা অত্যাশ্চর্য তথ্যের যোগ্য ছিল না। তবে এর নির্মাণের অস্বাভাবিক এবং বিশেষ জটিলতার কারণে এই মাঠগুলোকে শব্দের পূর্ণ অর্থে, অগণিতভাবে স্মারক হিসেবে তুলেছে: প্রধান ভবন, কোন্দো এবং শিক্ষাদান হল, বাসস্থান, অফিস এবং শোবার কক্ষ, খাবারঘর, অভ্যর্থনা কক্ষ এবং বসার জায়গা; কৃষি ভবন, কবরস্থান, সবজি বাগান, সেইসাথে রান্নাঘর, খাবার গ্রহণ করার কক্ষ, স্নানের ঘর ও শৌচস্থান। অনেক বিবেচনার পরেও বলতে হয় এটা এমন একটা ব্যবস্থা যেটা উপলব্ধি করতে পারাটা কঠিন, অথবা দৈনন্দিন চোখে পুরোপুরি অস্বচ্ছ। যদিও সম্পূর্ণ তৈরি করা অংশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা বৈধ, তারপরও এই সত্যটা চূড়ান্তভাবে সন্দেহজনক যে এই অসংখ্য ভবন এবং তাদের মাঝখানে আচ্ছাদিত হাঁটার পথগুলো একটা অভ্রান্ত পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট নির্দেশাবলির চরম এবং নিঃশর্ত আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল, যা কেউ আসলে সন্দেহ করতে পারবে না। এখানে কোনো তীর্থযাত্রী নিজের জাগতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে না, এবং অবশ্যই কোনো তীর্থযাত্রী এমনি এমনি সেটা পায়-ও না, কারণ সে নিজে দক্ষিণ গেটের কাছে পৌঁছানোর পর শুধু অভিজ্ঞতা অর্জন করে। দ্বিতীয় আরেকটা চুমন গেট ভবনের উঁচু প্রান্ত পেরিয়ে ভেতরের উঠানে প্রবেশ করলে একজন দেখে যে এক দিকে তিনতলা প্যাগোডা এবং অন্যদিকে সেই পাখিটার ঘণ্টা স্তম্ভ যা মাত্রই গান করেছে। এই ধরনের তীর্থযাত্রীকে এই আশ্রমে কোন দিকে যাওয়া উচিত তা নিয়ে ভাবতে হবে না, কারণ পথ ও পদযাত্রার দুই পাশেই মাটি ঠেলে কাঠের খুঁটি এবং দৈর্ঘ্যের প্যাঁচানো ধান-খড়ের দড়ি দিয়ে চিহ্ন দেওয়া আছে, সেটা তাদের পথ দেখায়। সবসময় তীর্থযাত্রী একদম সঠিকভাবে সেই ভবনটা খুঁজে পেত যা তার নিমজ্জনকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে অনুসরণ করবে। প্রথমে সে গোল্ডেন হলের নীরবতা, যা কোন্দো নামে পরিচিত, এবং শিক্ষাদান হলের নীরবতা, তারপর উঠান এবং বাগানগুলো একের পর এক অনুসরণ করে চিনত, যাতে সে গোল্ডেন হল থেকে আশ্রমের অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত ডোমেনের দিকে যাওয়ার দরজার শোভাময় তালাটা দেখতে পায়। সেইসাথে দর্শনার্থীদের প্রাঙ্গণেরও আভাস পেত, সে কিছুই মিস করত না। সে একটা মন্দির পরিদর্শন করতেও ভুলবে না, এমনকি যদি সে দীর্ঘ সময় ধরে অনুভব করত যে সে অবশ্যই কিছু একটা ভুলে যাবে, সম্ভবত সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মণ্ডপ, কারণ মানচিত্র হিসাবে পুরো জিনিসটার ব্যাপারে যে কেউ বিস্তারিত বলতে পারবে সেটা তখনো তার মাথায় আসেনি। কিন্তু না, মোটেও না, এখানে ভ্রমণের পথ আধ্যাত্মিক নিমজ্জনের পরামর্শে বানানো, সেই অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছিল অদ্ভুত, একটা অলৌকিক, হালকা, আমুদে, বিশেষ শক্তির একটা ইম্প্রোভাইজেশনে পরিচালিত হয়েছিল এবং তারপরও এই পথ ত্রুটিহীন। যার সৃষ্টি এই বিরাট আশ্রম। একমাত্র ভাসাভাসা এবং তাড়াহুড়ো করে বিচার করলে এটাকে বিশৃঙ্খল পাথরের মিশ্রণের মতো মনে হতে পারে, যেন এটা একটা বিশাল স্তূপের মতো কিছু। যেখানে সবকিছুই ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, সবকিছু অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয়, মূল্যবান এবং অগোছালো। কিন্তু না, মোটেও না, কারণ এই খামখেয়ালিপনা নিজেই শূন্যতার মতো ছিল, অর্থাৎ এটা ছিল সেই জিনিসের মতো যা ওপরের আকাশের উজ্জ্বল নীল তৈরি করেছিল, কুকুরকে দিয়েছিল মৃত্যুদণ্ড, কাঁটাযুক্ত ঝোপের নিচে মুক্তির জন্য কোনো পথ অনুসরণ করতে হবে তা দেখিয়েছিল, এটা ছিল সেই খামখেয়ালিপনা যা বাতাসের ধারাবাহিকতা, জিঙ্কো গাছের শিকড়ের গঠন, গর্তের মধ্যে থাকা বেল টাওয়ারের ছাদে গায়কের সুর এবং ছন্দ লিখেছিল। আর কোন্দোয় বুদ্ধের বিমুখ দৃষ্টিতে সেই হৃদয়বিদারক পরিশীলিত, অতুলনীয় বিষণ্নতা।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
একদিনে হামে আর ৪ মৃত্যু
একদিনে হামে আর ৪ মৃত্যু
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ইউজিসি-ইউএন উইমেন উদ্যোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ইউজিসি-ইউএন উইমেন উদ্যোগ
শুরু হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ড্রেস ও জুতা বিতরণ
শুরু হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ড্রেস ও জুতা বিতরণ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী