১৯২১ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মানুষের উচ্চশিক্ষার জন্য স্থাপন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। প্রতিষ্ঠার সময়ই বলা হয়েছিল, এটি হবে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। ভর্তির সময় শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট হলে উঠবেন এবং সেখান থেকেই সনদ নিয়ে বেরিয়ে যাবেন। তিনটি হল দিয়ে শুরু হয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা। প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পরে এসে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির হল-হোস্টেল সংখ্যা ২৩টি। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় বাড়েনি আবাসন।
অভিযোগ আছে, আবাসনের এই সংকট অনেকটাই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা। আর এর জন্য দায়ী মূলত বিভিন্ন সময় ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলগুলো। তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে তাদের ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের জন্যই কৃত্রিমভাবে এ সংকট তৈরি করে রাখেন। বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বৈধ সিট দিতে চাইলেও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর আধিপত্যের কারণে সেটি হয়ে ওঠেনি। বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল শুধু বিজ্ঞপ্তি দেওয়া পর্যন্তই। কারা ফলে সিট পাবেন, সেটা নির্ধারণ করতো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। যার ফলে হল রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের আধিপত্যের প্রভাবমুক্ত হয়। ৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ঘোষণার পর শিক্ষার্থীদের মেধার ভিত্তিতে সিট দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় বিভিন্ন হলে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যারাই হলে বৈধ সিটের জন্য আবেদন করেছেন, তারাই হলে সিট পেয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে ক্রাইটেরিয়া ছিল ঢাকা নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোর শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন না।
আবাসিক হলে উঠেই শিক্ষার্থীরা যেখানে থাকেন, এটি পরিচিত ‘গণরুম’ নামে। এই গণরুমগুলোতে মূলত প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার শিক্ষার্থীরা অবস্থান করতেন। যেখানে ৮ জন থাকার জায়গায় ৪০ জন থেকে ৪৫ জনকেও থাকতে হতো। মূলত গণরুমগুলোতে রাজনৈতিক নেতারা শিক্ষার্থীকে আশ্রয় দিতেন এবং তাদের বিভিন্ন দলীয় প্রোগ্রামে যেতে বাধ্য করতেন। অভিযোগ রয়েছে, কেউ এর ব্যত্যয় করলে সেদিন রাতে তার ওপর চালানো হতো নির্যাতন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটির বৈঠকের গণরুম বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পরপরই বিভিন্ন হল থেকে গণরুম বিলুপ্তির নোটিশ দেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের গণরুমটি সবচেয়ে বড়। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি পরিচিত ‘বঙ্গভবন’ নামে। প্রায় দুশো থেকে আড়াইশো শিক্ষার্থী এই রুমে থাকতেন। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এখন আর সেই রুমে কেউই নেই, পুরো রুমটাই ফাঁকা। এটি মূলত হলের শিক্ষার্থীদের সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত। হলের শিক্ষার্থীদের বৈধ সিট দেওয়ায় এখন আর গণরুমে কাউকে থাকতে হচ্ছে না।
বারান্দায় দাঁড়িয়েই কথা হয় ওই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শাহরিয়ার জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিজয় ৭১ হলেন যে ধারণক্ষমতা, অর্থাৎ প্রতিটি রুমে আট জন করে শিক্ষার্থী থাকার কথা। সেভাবে যদি সম্পূর্ণভাবে সিট বণ্টন করা হয় তাহলে আরও কিছু ফাঁকা থেকে যাবে।
মহসিন হলের শিক্ষার্থী কৌশিক জানান, হলে সব শিক্ষার্থী বৈধভাবে সিট পেয়েছে। এখন আমাদের হলে আবাসন সংকট নেই। কাউকে গণরুমেও থাকতে হচ্ছে না।
স্যার এএফ রহমান হলে শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে যারা আবেদন করেছে সবাই সিট পেয়েছে। কিছু কিছু রুমে এখনও কিছু সিট খালি আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত সেখানে আবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্দ দেবে।
এতদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক হলগুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়ে ছাত্রনেতাদের এক যুগ ধরেও অবস্থান করতে দেখা গেছে। কেউ হয়তো শিক্ষা জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও চাকরি পাওয়ার জন্য হলে বসে প্রস্তুতি নিতেন, কেউ আবার চাকরি পাওয়ার পরও হলে অবস্থান করতেন। প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার শিক্ষার্থীদের সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখের মধ্যেই হল ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মেয়েদের হলে ভোগান্তি
একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের হার তুলনামূলক কম হলেও বর্তমানে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট সংখ্যার অর্ধেক। তবে এই রেশিও ক্রমেই বাড়ছে। অর্থাৎ পুরো শিক্ষার্থীর তুলনায় নারী শিক্ষার্থীরা বেশি ভর্তি যোগ্যতা অর্জন করছে। কিন্তু আবাসিক হল-হোস্টেলগুলোর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে মাত্র সাতটি হল ও হোস্টেল।
যার ফলে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক সংকট এখন অনেক বেশি। বিষয়টি প্রতিকার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন জানাচ্ছেন নারী শিক্ষার্থীরা। সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী মাইশা মালিহা বলেন, আমাদের হলগুলোতে খাবারের মান ও খারাপ। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের আবাসন সমস্যা। ফলে সিট খুবই কম, আমাদের হলে ২ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী থাকতে পারে। কিন্তু সেখানে অ্যাটাসে দেওয়া শিক্ষার্থী কয়েকগুণ বেশি। আমরা খাবারের চাইতেও বর্তমানে সিট সংখ্যাটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
এরইমধ্যে গত বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) নারী হলগুলোর মধ্যে কবি সুফিয়া কমাল হলে শিক্ষার্থীদের আবাসিক সিটের জন্য আবেদন করার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সাইমা হক বিদিশা বলেন, আমাদের ছেলেদের হলগুলোতে আমরা আবার সংকট অনেকটা কমিয়ে আনতে পেরেছি। শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা হল ছেড়ে গেলে এই সংকট আরও কমবে। ইতোমধ্যেই তাদের হল ছাড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের সংখ্যার তুলনায় হল খুবই কম। সে কারণে আমরা চাইলেও তাদের এই সংকটটা উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে পারছি না। তাদের হলগুলোতেও শিক্ষা জীবন শেষ হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে আমরা নির্দেশ দিয়েছি। সেটি হলে হয়তো কিছুটা সংকট কমতে পারে। কিন্তু সেটা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাড়া ফেলানোর মতো নয়।
বড় কোনও প্রকল্প হাতে না নিলে ছাত্রীদের আবাসন সংকট কমানো সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সেটি করার জন্য প্রক্রিয়া শিগগিরই হাতে নেবো।’









