শীত শেষে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মশার উপদ্রব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আবাসিক হল, লাইব্রেরি ও ক্লাসরুমসহ ক্যাম্পাসের প্রায় সব জায়গায় মশার উপদ্রব শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে সন্ধ্যার পর কক্ষে বসে পড়াশোনা করা, আড্ডা দেওয়া যেন তাদের কাছে বিলাসীতা যেখানে দিনের বেলাতে ক্লাস-পরীক্ষা দেওয়াও যেন কষ্টকর হয়ে পড়েছে। শুধু হল নয়, লাইব্রেরি, শিক্ষাক্ষেত্র, খাবার কক্ষ ও ক্যাম্পাসের সামাজিক স্থানে বসতেও সমস্যা হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে দিনের বেলায় মশারির ভেতরে সময় কাটাচ্ছেন, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও পড়াশোনায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
কেন বাড়ছে মশা?
বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসে প্রায় ১৬ প্রজাতির মশা পাওয়া গেছে। বর্তমানে কিউলেক্স কুইনকুই ফেসসিটাস প্রজাতির মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি। এটি ফাইলেরিয়াসিস নামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শীত শেষে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে মশার ডিমপাড়া ও লার্ভা বেড়েছে। জলাবদ্ধ পানি ও আবর্জনা মশার প্রজননকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সুলতানা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ আমরা। বর্তমানে আমি যে ভবনে থাকি সেখানে দুই বছর ধরে বসবাস করছি, কিন্তু একবারও মশা মারার ওষুধ দেওয়া হয়নি। এস্টেট অফিসকে মৌখিকভাবে কয়েকবার জানিয়েছি। কিন্তু কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার উপদ্রব কমাতে লার্ভিসাইড প্রয়োগের মাধ্যমে প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা, ড্রেন ও জলাশয় পরিষ্কার রাখা যাতে পানি জমতে না পারে, নিয়মিত মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ময়লা-জলাবদ্ধতার হাত ধরে মশার রাজত্ব
ক্যাম্পাসে মশার উপদ্রব শুধু আবাসিক হল ও লাইব্রেরিতে সীমাবদ্ধ নয়; জমে থাকা আবর্জনা, ময়লা এবং নির্মাণাধীন ভবনের পাশে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের উষ্ণ আগুন হিসেবে কাজ করছে।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ড্রেন ও হলের আশপাশে পানি জমে থাকা এবং ফেলে রাখা ময়লার কারণে মশার সংখ্যা বেড়ে গেছে। কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করলেও স্থায়ী স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে কীটতত্ত্ব ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা ও আবর্জনা সরাসরি মশার ডিম পাড়া বাড়াতে সাহায্য করছে। শুধু ফগিং যথেষ্ট নয়; নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও জলাবদ্ধ পানি অপসারণ জরুরি। তা না হলে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়বে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী শবনম শুপ্রবা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি মশার প্রকোপ এতটা বেশি যে, খাবার খেতে নিলে তার সঙ্গে মুখে কয়েকটি মশা চলে আসে। তা ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিয়মত ময়লা পরিষ্কারসহ ফগিং, স্প্রে নিয়মিত করা হয় না।’
বাড়ছে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি
শুধু ভোগান্তি নয়, মশার কামড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং ফাইলেরিয়াসিস সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কীটতত্ত্ব ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘ফগিং একমাত্র স্থায়ী সমাধান নয়। লার্ভা ধ্বংস, জলাবদ্ধতা ও আবর্জনা অপসারণ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা জরুরি।’
বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের নালা, ড্রেন ও জলাশয়ে জমে থাকা পানি মশার প্রধান প্রজননকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। নির্মাণাধীন ভবনের পাশে জমে থাকা পানি ও অপরিষ্কার ড্রেনেজ সমস্যাও উপদ্রব বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের মাঝে কেউ কেউ হরহামেশাই প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে মজার ব্যঙ্গ ও ট্রল পোস্টের মাধ্যমে সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
সম্প্রতি চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত বৈষ্ণব সামাজিক মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো ব্যঙ্গ করে ‘মশাঙ্গীরনগর বিষশোবিদ্যালয়’ নামে একটি চিত্র প্রকাশ করেছেন, যা ক্যাম্পাসের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়েত মওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থী আশরাফুল হক বলেন, ‘দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর মশার উৎপাত কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কয়েল জ্বালালেও স্বস্তি নেই। আশপাশ পরিষ্কার করলে হয়তো কিছুটা কমতো।’
যা বলছে প্রশাসন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ফগিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এস্টেট অফিসের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘প্রথম ধাপের ফগিং কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে দুজন কর্মী নিয়োগ দিয়ে স্প্রে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রয়োজনে হল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ফগিং ও লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা হবে।’
হল প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবেদা সুলতানা বলেন, ‘ঝোপঝাড় ও ড্রেন পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ এবং নিয়মিত ফগিং কার্যক্রমের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হবে।’









