ঢাবির আইলেটের বেহাল দশা, পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

আতিক হাসান শুভ
১২ আগস্ট ২০২৬, ২১:১৬আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ২১:১৬

অপরিষ্কার শ্রেণিকক্ষ, নোংরা শৌচাগার, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, ল্যাবে কুকুর-বিড়ালের অবাধ প্রবেশ—এমনকি শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘদিনের মৃত ইঁদুর পড়ে থাকার অভিযোগও উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে (আইলেট)। ল্যাবের পরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশের চামড়া শিল্পের উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে আইলেটের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে পরিচালকের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও করেছেন তারা।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব নেন ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান। তার দায়িত্ব নেওয়ার পর গবেষণা, ল্যাব ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটাই ল্যাবনির্ভর হলেও প্রয়োজনীয় উপকরণ সময়মতো পাওয়া যায় না। অনেক সময় ল্যাব পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের নিজেদের অর্থে উপকরণ কিনতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় আগের তুলনায় গবেষণা কার্যক্রমও অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইলেট)।  ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

আইলেটের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহিন শেখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে পরিচালকের নিয়মিত অফিসে উপস্থিতি, ল্যাবের উপকরণ সরবরাহ এবং পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন।

তার দাবি, প্রয়োজনীয় কাজে একাধিকবার পরিচালকের কার্যালয়ে গিয়েও তাকে নিয়মিত পাওয়া যায়নি। ল্যাবের প্রয়োজনীয় উপকরণ পেতে শিক্ষার্থীদের একাধিকবার পরিচালকের কাছে যেতে হয়। এমনকি কয়েকটি ব্যবহারিক পরীক্ষায় নিজেদের অর্থে উপকরণ কিনে পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় অভিযোগ, আইলেটে ভর্তির ক্ষেত্রে আগ্রহ কমছে। শাহিন শেখের দাবি, ১৫০টি আসনের বিপরীতে ৪৪তম ব্যাচে ভর্তি হয়েছেন ৭৪ জনের মতো শিক্ষার্থী। নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কম। আগের কয়েকটি ব্যাচেও শিক্ষার্থীসংখ্যা কমেছে বলে দাবি তার।

আইলেটের ৪০তম ব্যাচের আরেক শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমানও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনস্টিটিউটের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার অভিযোগ, সেশনজট, পরিচয় সংকট এবং শিক্ষকদের একাডেমিক কার্যক্রমে অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এসআইসিআইপি নামে একটি সরকারি প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, প্রকল্পটি আইলেটের নিয়মিত একাডেমিক কোর্সের অংশ নয়। কিন্তু এর কার্যক্রমে ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের ফলে নিয়মিত শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসআইসিআইপি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকরা প্রকল্পের কাজে বেশি সময় দেওয়ায় নিয়মিত ক্লাস-ল্যাবে প্রভাব পড়ছে। এর ফলে একটি সেমিস্টার শেষ করতেও দীর্ঘ সময় লাগছে। প্রকল্পটির আয়-ব্যয় ও পরিচালনায় আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

ভেতরের বেহাল দশা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, এসআইসিআইপির আওতায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১ হাজার ২৫০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শিক্ষক মাসে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের সম্মানী বা পারিশ্রমিক পান বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অর্থের পরিমাণ ও ব্যবহারের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে লেদার-সংক্রান্ত নমুনা পরীক্ষার জন্য আইলেটে পাঠানো হয়। এসব কাজ শিক্ষকদের মধ্যে অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বণ্টনের কথা থাকলেও পরিচালক পছন্দের শিক্ষকদের দিয়ে কাজ করান বলে অভিযোগ তাদের।
এ বিষয়ে প্রতিবেদকের কাছে কিছু নথিও এসেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, নির্ধারিত ফি কাঠামোর বাইরে নমুনা পরীক্ষার অর্থ বণ্টনে অনিয়ম হয়েছে। তবে নথিগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও অর্থ লেনদেনের প্রেক্ষাপট যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পরীক্ষার দায়িত্ব পালন নিয়েও পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, গত দেড় বছরেরও কম সময়ে বেশ কিছু ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক পরীক্ষার দায়িত্বের বিপরীতে পরিচালক বিল নিয়েছেন, যদিও তিনি নিয়মিত পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন না। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক বলেন, বর্তমান পরিচালকের সময়ে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শিক্ষা কার্যক্রমেও পড়ছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে হিট ও এসআইসিআইপি প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন ওই শিক্ষক।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইনস্টিটিউটের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছেন। শিক্ষার্থীরা যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলোর কিছু বিষয়ে তিনি অবগত এবং সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যেসব অভিযোগ করেছে, তা আমি অস্বীকার করছি না। কিছু বিষয়ে আমি ইতিমধ্যে অবগত হয়েছি। তবে এসব বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেও সমাধান করা যেত।

সেশনজটের অভিযোগের বিষয়ে কামরুজ্জামান বলেন, অন্যান্য অনেক বিভাগের তুলনায় আইলেটের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে আছে। বাকি সমস্যাগুলোও সম্মিলিতভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

আইলেটে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি। কীভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইনস্টিটিউট সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান।

হিট ও এসআইসিআইপি প্রকল্পে অনিয়ম এবং নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কিছু নথি প্রতিবেদকের কাছে এসেছে—এমন তথ্য জানানো হলে পরিচালক প্রশ্ন তোলেন, এসব তথ্য শিক্ষার্থীদের হাতে কীভাবে এসেছে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের উচিত একাডেমিক পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া। কোন শিক্ষক কত বেতন পান বা কে কত আয় করেন, এ ধরনের বিষয়ে তাদের অতিরিক্ত আগ্রহ থাকা কাম্য নয়।

এদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পাশাপাশি ইনস্টিটিউটের অবকাঠামোগত দুরবস্থার বিষয়টিও সামনে এসেছে। শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, ল্যাবের পরিবেশ এবং গবেষণার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

তাদের মতে, শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগের তদন্ত নয়, আইলেটের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের সামগ্রিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

/এএইচএস/এম/
সম্পর্কিত
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে ঢাবিতে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মশাল মিছিল
ঢাবির ছাত্রী হলে রাতে চলাচলে বিধিনিষেধ বাতিলে আল্টিমেটাম
ঢাবির বিজয় একাত্তর হল থেকে শিক্ষার্থী মাহফুজকে বহিষ্কার
সর্বশেষ খবর
যন্তর মন্তর সিজন ২ শিগগিরই আসছে: সিজেপির দীপকে
যন্তর মন্তর সিজন ২ শিগগিরই আসছে: সিজেপির দীপকে
প্রধানমন্ত্রীর সই জাল করে প্রতারণা, গ্রেফতার ৬ আসামি রিমান্ডে
প্রধানমন্ত্রীর সই জাল করে প্রতারণা, গ্রেফতার ৬ আসামি রিমান্ডে
আলাস্কার এই গুহা যেন তুষারের নিচে লুকিয়ে বরফের রাজপ্রাসাদ
আলাস্কার এই গুহা যেন তুষারের নিচে লুকিয়ে বরফের রাজপ্রাসাদ
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বাধিক পঠিত
সাভারে একটি ভবন ঘিরে রেখেছে এসএসইউ, যা জানালো পুলিশ
সাভারে একটি ভবন ঘিরে রেখেছে এসএসইউ, যা জানালো পুলিশ
সাভারে বাড়ি ঘিরে অভিযান, আটক আরিফ সম্পর্কে যা জানা গেলো
সাভারে বাড়ি ঘিরে অভিযান, আটক আরিফ সম্পর্কে যা জানা গেলো
মির্জা ফখরুলকে বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বললেন জামায়াতের ১১ এমপি
মির্জা ফখরুলকে বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বললেন জামায়াতের ১১ এমপি
কাকা তুমি খালি বাইরে বাইরে থাকলে কেন: ফোনালাপে পরশকে বলেছিলেন কাদের
কাকা তুমি খালি বাইরে বাইরে থাকলে কেন: ফোনালাপে পরশকে বলেছিলেন কাদের
গভীর রাতে সরকারি ভবনে নারীসহ পাসপোর্ট কর্মকর্তা আটক
গভীর রাতে সরকারি ভবনে নারীসহ পাসপোর্ট কর্মকর্তা আটক