ডাকসু সংগ্রহশালায় অননুমোদিত রদবদল ও ইতিহাস বিকৃতি: শিক্ষক নেটওয়ার্কের ক্ষোভ

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩০আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৩

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনে অবস্থিত ডাকসু সংগ্রহশালায় অননুমোদিত ও নিয়মবহির্ভূত সংস্কারের নামে ঐতিহাসিক চিত্র ও নথি সরিয়ে ফেলা এবং ইতিহাস বিকৃতির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ, উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই প্রতিবাদ জানানো হয়। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সরেজমিন অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা গেছে যে, সংগ্রহশালার দেওয়ালে আগে টাঙানো মূল্যবান ও ঐতিহাসিক অনেক আলোকচিত্র অপসারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও মুক্তিসংগ্রামের প্রধান রূপকার শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিও রয়েছে। একই সঙ্গে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর শাসন-পীড়ন চালানো পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি সেখানে স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি দল সরাসরি ডাকসু সংগ্রহশালা পরিদর্শনে গিয়ে এইসব পরিবর্তনের সত্যতা দেখতে পায়। 

ডাকসুর মতো একটি ঐতিহাসিক ও প্রতিনিধিত্বশীল প্ল্যাটফর্মে এই ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এই ঘটনা বেশ কিছু গুরুতর প্রসঙ্গের  জন্ম দেয় বলেও জানায় সংগঠনটি।  

এতে আরও বলা হয়, ডাকসু সংগ্রহশালা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংরক্ষিত সম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনও সংরক্ষিত অবকাঠামো বা সংগ্রহশালায় কোনও প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পূর্বানুমতি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দের খেয়ালখুশিমতো কিংবা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মর্জিতে বা  উগ্র ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনও সংগ্রহশালায় পরিবর্তন আনার সুযোগ নেই। আর ডাকসু সংগ্রহশালা হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আকর, যা অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় এ বিষয়ে অধিকতর সতর্কতার প্রয়োজন।  

শিক্ষক নেটওয়ার্ক জানায়, তাছাড়া মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বাধীন বাংলাদেশের কোনও নাগরিক নন; বরং তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছিলেন। সেই সঙ্গে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিকবাহিনী যে বর্বর গণহত্যা চালায়, সে জন্য তারা কখনোই কোনও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। এরকম একটি রাষ্ট্রের একজন বিতর্কিত শাসকের ছবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও সংগ্রামের স্মারকে স্থান দেওয়া তাও যথাযথ ঐতিহাসিক তথ্য ব্যবহার না করে তা বাঙালি জাতির জন্য চরম অবমাননাকর। 

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও জাতীয় মুক্তির প্রতিটি আন্দোলনের প্রধানতম নেপথ্য রূপকার ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু যেকোনও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতোনই তিনি কিন্তু বিতর্কের উর্ধ্বে নন। তবে কেবল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের ইতিহাসের গুরুত্ব মুছে দিতে, তার ছবি সরানো হয়েছে এমন একটা সময়ে যখন তার উপর আক্রোশের কারণ তার কন্যা পতিত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর ক্ষোভ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু সেই অজুহাতে  ডাকসুর  সংগ্রহশালা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আলোকচিত্র সরিয়ে ফেলা কেবল অসংবেদনশীলতাই নয়, বরং এটি ইতিহাস থেকে মূল নায়কদের মুছে ফেলার এক নিকৃষ্ট ও পরিকল্পিত অপচেষ্টা। 

একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতে এবং পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসর (রাজাকার ও আল-বদর) যৌথভাবে শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীদের ওপর যে নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছিল, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়। ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে এই সংক্রান্ত আলোকচিত্র বা নথি সরিয়ে ফেলে কোনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিরোধী নির্দিষ্ট উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর  রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না বলে জানায় সংগঠনটি। 

সংগঠনটি আরও জানায়, ডাকসুর সংগ্রহশালা কোনও বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি পুরো জাতির ঐতিহাসিক স্মারক। ইতিহাস বিকৃতির এই নগ্ন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানায়। 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি 

অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে। তাই সংগ্রহশালায় অননুমোদিত পরিবর্তন ও ইতিহাস বিকৃতির পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।

দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি ও শাস্তি: বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করে অননুমোদিতভাবে ইতিহাস বিকৃতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্মারক সরানোর পেছনে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। 

সরিয়ে ফেলা স্মারক পুনর্বহাল ও তালিকা প্রকাশ: ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে যা কিছু সরানো হয়েছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তালিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জমা দিতে হবে এবং অবিলম্বে অপহৃত-অপসারিত সব ঐতিহাসিক চিত্র ও স্মারক আগের স্থানে সসম্মানে পুনর্বহাল করতে হবে। 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে উল্লেখ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে ডাকসু সংগ্রহশালার ভাবমূর্তি ও ঐতিহাসিক সত্য সমুন্নত রাখবে।

/ইউআই/এসটি/ 
সম্পর্কিত
বাংলাদেশ বনাম বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কার স্বার্থে?
ঢাবির সাম্প্রতিক ঘটনা তদন্তে ৩ কমিটি
ডাকসু থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা মুছে ফেলার সুযোগ নেই: আ স ম রব
সর্বশেষ খবর
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের বড় উল্লম্ফন
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের বড় উল্লম্ফন
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডে নিয়োগ, দ্রুত আবেদন করুন
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডে নিয়োগ, দ্রুত আবেদন করুন
ছাত্রদল নেতার মোটরসাইকেল আটকানোয় এসপির কার্যালয় ঘেরাও  
ছাত্রদল নেতার মোটরসাইকেল আটকানোয় এসপির কার্যালয় ঘেরাও  
দুই দিনেই কেন স্কুল বদলাচ্ছে হ্যারি-মেগানের সন্তানরা?
দুই দিনেই কেন স্কুল বদলাচ্ছে হ্যারি-মেগানের সন্তানরা?
সর্বাধিক পঠিত
মদিনায় ১১০ মিলিয়ন টন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান
মদিনায় ১১০ মিলিয়ন টন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান
ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ‘ন্যক্কারজনক’, দ্রুত অপরাসরণ চায় ছাত্রদল
ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ‘ন্যক্কারজনক’, দ্রুত অপরাসরণ চায় ছাত্রদল
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে কক্সবাজারে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে কক্সবাজারে
ডোপ টেস্টে পজিটিভ আসায় পুলিশ সুপার বরখাস্ত
ডোপ টেস্টে পজিটিভ আসায় পুলিশ সুপার বরখাস্ত
পুলিশের খাবার পৌঁছানোর দৃশ্য বদলে দিলো নতুন ভ্যান
পুলিশের খাবার পৌঁছানোর দৃশ্য বদলে দিলো নতুন ভ্যান