গণমাধ্যমের পরিবেশ এখনও নারীবান্ধব নয়!

জাকিয়া আহমেদ
০৩ মে ২০১৬, ১৭:৪৮আপডেট : ০৩ মে ২০১৬, ১৯:০৬





গণমাধ্যমের পরিবেশ এখনও নারীবান্ধব নয়

আগের তুলনায় গণমাধ্যমে নারীর উপস্থিতি বাড়লেও সংখ্যাটা খুব বেশি নয়। সংখ্যা বাড়লেই কোয়ালিটি বাড়বে বলে মনে করেন কেউ কেউ। একইসঙ্গে গণমাধ্যমে নারীর কর্মপরিবেশ এখনও অনুকূল নয় বলে মন্তব্য করলেন কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মী। হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে প্রতিটি গণমাধ্যমে একটি সেল গঠন করার কথাও বলেন তারা, যেখানে যৌন হয়রানিসহ যেকোনও অভিযোগের কথা নারীরা জানাতে পারবেন। তবে জেন্ডার ইনসেন্সেবিলিটি একদিনে যেমন হয়নি, তেমনি একদিনে যাবেও না বলেও মতামত রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী নারী সাংবাদিকদের সংখ্যা বেড়েছে বলা হচ্ছে গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট ২০১৫ এর প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বিশ্বব্যাপী নারী সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়লেও এর হার মাত্র ৬ ভাগ।
‘গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। ১৪৪টি দেশের তথ্য সংগ্রহ করে তাতে বলা হচ্ছে যে সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে নারী সাংবাদিকের তৈরি করা প্রতিবেদন বাড়ছে না। ২০০৫ সালে নারী সাংবাদিকদের তৈরি করা প্রতিবেদন ছিল ৩১ শতাংশ, ২০১৫ সালেও এই হারের সংখ্যা একই। গ্লোবাল মিডিয়া ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিকেশনের (ডব্লিউএসিসি) গবেষণা ও অ্যাডভোকেসির উদ্যোগে গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট -এর এই প্রতিবেদন গত নভেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে।

আরও পড়ুন- গণমাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই আইন করা হচ্ছে: তথ্যমন্ত্রী

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নারী-পুরুষের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ৮৪ শতাংশ পুরুষ, আর নারী ১৬ শতাংশ।এর মধ্যে সংবাদপত্রে ৮ শতাংশ, রেডিওতে ৩৩ শতাংশ এবং টেলিভিশনে ১৯ শতাংশ নারী সাংবাদিক কাজ করেন। তবে রেডিওতে ৬৭ শতাংশ ও টেলিভিশনে ৬৬ শতাংশ উপস্থাপিকা নারী। সার্বিকভাবে এ দুই মাধ্যমে ৬৬ শতাংশ নারী ও ৩৪ শতাংশ পুরুষ উপস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন।
অপরদিকে, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গণমাধ্যম ও নারী বিষয়টিকে সামনে রেখে একটি উপপরিষদ গঠন করেছে। এই উপপরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সীমা মোসলেমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গণমাধ্যমে গত ২০ বছরে নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়েছে। তবে শব্দ চয়ন এবং উপস্থাপনে ঘাটতি রয়ে গেছে। নারীদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে।
অপরদিকে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের সঙ্গে কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, নারীর সুযোগ-সুবিধা কেমন হবে কিংবা নারী হিসেবে তার পাওনাটুকু নিয়েও রয়েছে নানা বৈরী অভিজ্ঞতা।
আমি যখন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কাজ করতাম, সেখানে নাইট ডিউটি করতে হতো ঠান্ডা একটা রুমের ভেতরে। কিন্তু একজন প্রেগনেন্ট নারীকে সেই নাইট করানো কী উচিত, যদি তার পর্যাপ্ত লোকবল থাকে!প্রতিবাদে আমি চাকুরি থেকে রিজাইন দেই, কিন্তু তারা সেটি গ্রহণ করেনি, তাদের বদনাম হবে বলে পরে তারা আমাকে ছুটিতে পাঠায় এই বলে যে, মাতৃত্বকালীন যে ছুটিটা রয়েছে, সেটা আমি আগে নিতে পারি এবং পরের ছুটিগুলো আমি অবৈতনিক নেবো।এই আটমাস আমি বাসায় বসে থাকলাম এবং ক্রনিক ডিপ্রেশনের মধ্য দিয়ে গেলাম, আটটা সাইকো থেরাপি লেগেছিল, শুধুমাত্র চাকরি না করে বাসায় বসে থাকার কারণে।এটার ক্ষতিপূরণ কে দেবে।আর জয়েন করার পরেও দেখেছি, সেখানে নানা বৈষম্য। এসব দেখেই চাকরি ছাড়লাম, এরপরে তারা আমার প্রফিডেন্ড ফান্ডের টাকাও কিছুই দেয়নি। শুধু আমি না, আরও দুজন নারীও চাকরি ছাড়ার পরে প্রফিডেন্ড ফান্ডের টাকা তারা দেননি বলেন, ১১ বছর বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করা মুনমুন শারমিন শামস।

আরও পড়ুন- টিআইবির ট্রাস্টি ও শীর্ষ কর্মকর্তারা যেভাবে সম্পদের হিসাব দিয়েছেন
আমার আরেক কলিগ প্রেগনেন্ট অবস্থায় পুরো নয়মাস নাইট ডিউটি করতে বাধ্য হয়েছে, এটা কেমন মানবিকতা, কোথায় অবস্থান মেয়েদের।হাতে বুম নিয়ে একটা মেয়ে রিপোর্ট করার পর বাই লাইনে সেই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, তার মানে গণমাধ্যমে নারীর ভালো অবস্থা, আমি তা মনে করি না, খুবই কুৎসিত অবস্থা বলেন মুনমুন শারমিন শামস।
সরকারি নির্দেশনা রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি রোধে সেল গঠন করতে হবে কিন্তু গণমাধ্যমের কোন প্রতিষ্ঠানে এ সেল রয়েছে, কোথাও নেই বলেন তিনি।
অপরদিকে নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শুরুর তুলনায় কিছুটা বাড়লেও অন্য পেশায় নারীদের সংখ্যা যতোটা বাড়ছে, সেতুলনায় বাড়ছে না সাংবাদিকতায়।তবে কর্ম পরিবেশটা খুব অনুকূল বলা যাবে না।কোথাও কোথাও সহযোগিতা পেলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই এখনও চায় না মেয়েদের নিয়োগ দিতে।মিডিয়ার অনেক প্রতিষ্ঠানের পলিসি হচ্ছে, মেয়েদের নেবো না, মেয়েরা পারবে না-এটা একটা পশ্চাদপদ মানসিকতা, যেখান থেকে নিয়োগদাতারা এখনও বেড়িয়ে আসতে পারেনি।তবে একেবারে কিছু না হলে মেয়েরা এতোদূর আসতে পারতো না।আর ছেলেদের তুলনায় এখানে মেয়েদের রিকগনিজেশনটা অনেক কম বলেন নাসিমুন আর হক।
আর সবসময় হাতে মারতে হয়না, অনেকে মৌখিকভাবেও অ্যাবিউজ হন বলেন তিনি।নিজেদের সংকোচ, সম্মানের ভয়ে অনেকে বলেও না এসব।তবে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া, পদোন্নতিসহ নানা সুযোগ সুবিধায় মেয়েদের চেয়ে পুরুষদেরকেই পছন্দ করে অফিসগুলো, নানা বৈষম্যের শিকার হয় মেয়েরা বলেন তিনি।তবে যতো বেশি, যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে,লড়াই করতে পারবে, নিজেদের সংগঠিত করতে পারবে ততোই এই জায়গাটা কমে যাবে।বর্তমান সময়ে মেয়েরা বিভিন্ন পদে গণমাধ্যমে আছেন এই সংখ্যাটা বাড়াতে হবে।সংগঠিত হতে হবে নিজেদের, নিজেদের উপস্থিতি বোঝাতে হবে।
তিনি বলেন, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমিটি থাকতে হবে বলে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে এর বাস্তবায়ন এখনও হয়নি।সব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে যেন যে কোনও ধরনের হয়রানির অভিযোগ জানাতে একটি করে সেল থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে এবং সেখানে নারী সদস্যও থাকতে হবে।

আরও পড়ুন- জঙ্গি সন্দেহে সিঙ্গাপুর ও ঢাকায় ১৩ বাংলাদেশি আটক, সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা!
ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির অ্যাসাইমেন্ট এডিটর সুলতানা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জেন্ডার ইনসেন্সেবিলিটি একদিনে হয়নি, একদিনে যাবেও না। হাজার বছর ধরে হয়ে আসছে।আবার সব পুরুষরাই একরকম না, অনেকেই তাদের সেন্সেবিলিটি বাড়িয়েছে, সব সমাজেই পজেটিভ-নেগেটিভ দুইটা ফ্লো থাকে।পজেটিভ ফ্লো সব সময় নেগেটিভিটিটাকে পজেটিভ দিকে নিয়ে আসে।ভালো একটা ফ্লো এখন তৈরি হয়েছে, আমি এটা নিয়ে আশাবাদী।নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা প্রমাণ করে নিজেকে এগিয়ে যেতে হবে।
অপরদিকে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেক্ট্রিক মিডিয়া (বিজেম) এর নির্বাহী পরিচালক মির্জা তারেকুল কাদের বলেন, নারীদের সংখ্যা খুব কম মিডিয়াতে। এটাকে অবশ্যই বাড়াতে হবে। বাড়ানোর মূল দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগকর্তাদের।নারীদের সিনসিয়ারিটি, ডেডিকেশন পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি।কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে সেটা মানা হচ্ছে না। তিনি বলেন,গণমাধ্যম নীতিমালা যেটি করছে সরকার, সেখানে নিয়োগ নিয়ে একটি বিধান থাকা উচিত। সেখানে নির্ধারিত থাকা উচিত নারীর সংখ্যা কতো হবে মিডিয়া হাউজগুলোতে।একটা সম্মানজনক অনুপাতে মেয়েদের নিয়ে আসতে হবে অবশ্যই।এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তথ্য প্রযুক্তি বিভাগে নারীদের প্রশিক্ষণ দিতে সরকার থেকে টাকা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু গণমাধ্যমে নারীদের উপস্থিতির জন্য এ ধরণের কোনও চিন্তাভাবনা তথ্য মন্ত্রণালয় করছে না।
/এপিএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম