সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নেত্রী জয় সম্পর্কে একটি অসত্য তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। জয় সেটা চ্যালেঞ্জ করেছে। আমি আশা করি, সেই চ্যালেঞ্জের জবাব তিনি দেবেন এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবেন।
বৃহস্পতিবার দশম জাতীয় সংসদের দশম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন:
দেশ নিয়ে কাউকে খেলতে দেব না: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
বিএনপির এক নেতার এফবিআই কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার প্রসঙ্গে টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে গ্রেনেড হামলা করে বোমা পুঁতে নানাভাবে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে, এখন আমার ছেলেকে হত্যার চেষ্টা করছে। সেই ষড়যন্ত্রে তারা লিপ্ত। হত্যা- খুন করা তাদের পেশা।
বিএনপি নেত্রী ও তার দুই ছেলের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা অবৈধভাবে অর্থ বানিয়ে বিদেশে পাচার করেছে। তাদের অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিং আমাদের বলতে হবে না, আমেরিকার ফেডারেল কোর্টে প্রমাণিত হয়েছে। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কালো টাকা সাদা করেছেন। একজন প্রধানমন্ত্রীকে কালোটাকা বানাতে হবে কেন, আর সাদা করতে হবে কেন। সেই কর্মকাণ্ডও তিনি করেছেন। তাদের পরিবার শত শত কোটি টাকা লুটপাট করেছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বিএনপি নেত্রীর দুই ছেলে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। তাদের মানিলন্ডারিং সিংগাপুরের আদালতে প্রমাণিত। এটা আমাদের করা লাগেনি। সিঙ্গাপুরের আদালতে প্রমাণ হয়েছে। এফবিআইয়ের লোক এখানে এসে মানিলন্ডারিংয়ের সাক্ষী দিয়ে গেছে। বিএনপি নেত্রীর বড় ছেলেকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তারবার্তায় সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই তার বার্তায় বিএনপি নেত্রীর বড় ছেলে যে ঘুষ নিয়েছিলেন সেই তথ্য বেরিয়ে এসেছিল। সিমেন্স ও হারভিন কোম্পানির কাছ থেকে তারা যে অর্থ ঘুষ নিয়েছেন সেগুলো তো প্রমাণিত। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে একটি মামলা হয়েছে। এখানে সিমেন্সের চুক্তির সঙ্গে বিএনপি নেত্রীর পরিবার সম্পৃক্ত ছিল, তা ফেডারেল কোর্টে প্রমাণিত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে বিএনপি নেত্রীর ছেলের বন্ধুর নামে টাকা রাখা হয়েছে। সেখানে তিনি ধরা খেয়েছেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে গিয়ে এবং সেটা কোথায় ব্যবহার করতে গিয়েছিলেন সেটা বুঝতেই পারেন। এমনকি একটি হত্যা মামলায় কোটি কোটি টাকা ঘুষ বিনিময় হয়েছে। তাদেরই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, ২১ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এই ঘুষ দুর্নীতিতে তো তারা চ্যাম্পিয়ন। এতিমখানার জন্য টাকা নিয়ে সেই টাকা তারা আত্মসাৎ করেছে। লুটপাট করেছে তার প্রমাণ আছে। এতিমের টাকা কি কেউ খায়?
আরও পড়ুন:
ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ, বাস্তবে কী ঘটবে?
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিজ ডিপার্টমেন্টে ২০১২ সালের ২৯ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্নীতিবাজদের প্রোফাইল তুলে ধরা হয়। এই প্রোফাইলের মধ্যে বিএনপি নেত্রীর ছেলেদের নাম রয়েছে। আর বিশ্বসেরা অর্থ পাচারকারীদের যে নাম প্রকাশিত হয় সেখানেও তার ছেলেদের নাম উঠে আসে।
তারেক জিয়ার দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দফতর ইউএনডিসি এবং বিশ্বব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিসিয়েটিভের প্রশ্নোত্তরের একটি পুস্তিকায় সিমেন্স কোম্পানির কাছ থেকে খালেদা জিয়ার ছেলের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগকে জাতীয় মুদ্রা সরানোর উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পুস্তিকাটি ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভিয়েনায় প্রকাশ করা হয়েছে। এই বইয়ের ১৭৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলেকে ঘুষ হিসেবে বিদেশি একটি কোম্পানির দেওয়া অর্থ ২০০৯ সালে বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিভাগ। এটা ভিয়েনাতে প্রকাশিত খবর, আমার নয়। ২০০৯ সালের ৮ জানুয়ারি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পুনরুদ্ধারে ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার একটি আদালত আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগী হয়। এই অর্থ সিমেন্স থেকে বিএনপি নেত্রী তার ছেলের মাধ্যমে গ্রহণ করেন এবং সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে জমা রাখেন। এছাড়া, ওয়ারিদসহ অনেক বহুজাতিক কোম্পানির নাম এসেছে, সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ খেয়েছে। দুর্নীতি করেছে বলেই ভাঙা সুটকেসে ছেড়া গেঞ্জি থেকে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। তাদের বিলাসবহুল জীবন যাপন সকলের চোখে পড়েছে।
আরও পড়ুন-
ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায় অবৈধ: সংসদে আইনমন্ত্রী
তিনি আরও বলেন, নিজেরা যারা ঘুষ-দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত, তারা কত টাকা চুরি করেছেন। মানিলন্ডারিং করে বিদেশে রেখেছেন। এই প্রশ্নটা জাগে যখন আমরা দেখি এফবিআইয়ের অফিসারকে ঘুষ দিয়ে কিনে ফেলেছেন। এফবিআই অফিসারদের ঘুষ দিয়ে কিনে ফেলতে পারে এই পরিমাণ অর্থ বিএনপির নেতাদের কাছে রয়েছে। এটা আমেরিকায়ই ধরা পড়েছে। আমেরিকার সরকার ও এফবিআই তার অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, সেখানে বিএনপি নেতার নামও এসেছে। তার সাজাও হয়েছে। সেখানে বেরিয়েছে জয়কে তারা অপহরণ করবেন। অর্থাৎ তাকে হত্যা করে ফেলবেন। তাকে জীবন থেকে সরিয়ে দেবেন। এই ধরনের তথ্য কিন্তু বেরিয়ে এসেছে। ওই মামলা চলাকালীন সময়ে বিএনপি নেত্রীর দুই উপদেষ্টা শফিক রেহমান ও মাহমুদুর রহমানের নাম বেরিয়ে এসেছে। এটা আমেরিকার দেওয়া তথ্য, এখানে আমাদের কিছু নেই। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তারা জড়িত। বিএনপির নেতা আমেরিকার কোর্টে সাজা পেয়েছেন, এটা বাস্তব কথা।
বাংলাদেশের আদালতে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলের সাজার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মানিলন্ডারিং মামলায় ২৩ জুন ২০১১ তে বাংলাদেশে তার ছেলের ৬ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। বিএনপি নেত্রীর ছেলের সেই্ টাকা আমরা ফেরত আনতে পেরেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংসদের মাধ্যমে জানাতে চাই, আমরা ছেলে মেয়েদের মানুষ করেছি। জীবনে কোনও কিছু চাইনি। আমরা ছেলে মেয়েদের একটাই বলেছি, একটা মাত্র জিনিস তোমাদের দিতে পারবো, সেটা হলো শিক্ষা। আমরা ছেলে মেয়েকে শিক্ষা দিয়েছি। আমার ছেলে জয় বাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েট। পরে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েট। এরপর কিছুদিন ব্যবসা করে নিজে অর্থ সংগ্রহ করেছে। তারপর স্টুডেন্ট লোন নিয়ে হার্ভার্ড থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি করেছে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়েছে। তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছি আমরা, চোর চোট্টা বানাইনি। সে চোর চোট্টা হতে এখানে আসেনি। ক্ষমতার অব্যবহার করে টাকা বানাতেও আসেনি। তারা দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করছে বিনিময় কিছু নেয়নি। নিজেরটা নিজেই করে খাচ্ছে।
ইএইচএস/ এপিএইচ/








