মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকুন কিংবা সূর্যকান্ত মিশ্র-অধীর চৌধুরীরা আসুন, পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা এই মাসেই যাবে এক নতুন সরকারের হাতে। সেই সরকার তৃণমূলেরই হোক বা বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোটের, নতুন প্রশাসনকে নতুন পরিস্থিতিতে নতুন অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতে হবে বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী। আর এখানেই ফের এসে পড়ছে সেই প্রশ্ন, ভারত-বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি নিয়ে নতুন সরকারের অবস্থান কী হবে?
কূটনৈতিক মহলের খবর, রাজ্যে যে সরকারই হোক না কেন, তারা তিস্তা চুক্তি নিয়ে অন্তত নেতিবাচক মনোভাব নেবে না। ওই পানিবণ্টন চুক্তি হলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও ভাল হবে, বোঝাপড়া আরও সুদৃঢ় হবে, সেটা মাথায় রেখেই নতুন সরকার এই ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান নেবে। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিচারে অর্থাৎ জিও-পলিটিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গকেই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাধার কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ভারত সরকার সম্পাদন করতে পারেনি। তখন তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও বাংলাদেশ সফর করার কথা ছিল। কিন্তু মমতা শেষ লগ্নে সেই সফর বাতিল করে দেন।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ নাকচ সুইফটের
সেই সময়ে ভারতে কংগ্রেস সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন। এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে ক্ষমতা হারালে যে সরকার আসবে, তাতে কিন্তু কংগ্রেসও হবে অংশীদার। অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সদস্য, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র বলছেন, ‘‘এটা মূলত দু’দেশের ব্যাপার। তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করতে উদ্যোগী হতে হবে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেই। এটুকু বলতে পারি, আমরা ক্ষমতায় এলে যদি কেন্দ্রের তরফে এই উদ্যোগ ফের নেওয়া হয়, আমাদের অবস্থান ইতিবাচকই থাকবে।’’ কিন্তু এখানে ইতিবাচক কথার মানে কী? ভারত সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সাবেক সদস্য ওমপ্রকাশবাবুর কথায়, ‘‘সন্ত্রাসী দমন, জাল নোটের প্রসার প্রতিরোধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে বোঝাপড়া অনেকটাই বেড়েছে। আমরা মনে করি, তিস্তা চুক্তি হলে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি আরও সুদৃঢ় হবে। আমরা সেই মনোভাব নিয়েই এগোব। ইতোমধ্যেই এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের রিপোর্ট আছে। আমরা সেগুলো নতুনভাবে পর্যালোচনা করবো।’’
একটা জল্পনা আছে যে, নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের রিপোর্টের ভিত্তিতেই নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তিতে বাধ সেধেছিলেন। কল্যাণবাবুর উপর মমতা আস্থা রাখেন, মমতার বিশেষ অনুরোধেই পরিবেশবিদ কল্যাণবাবু পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন।
কল্যাণবাবুর কিন্তু সাফ বক্তব্য, ‘‘এটা একটা মিথ যে, আমি রিপোর্টে বলেছি, তিস্তার পানি বাংলাদেশকে দেওয়া যাবে না। এ কথা কারা রটালো, কী স্বার্থে রটালো আমার জানা নেই। কিন্তু জাতিসংঘের নির্দেশিকা অনুযায়ী, পড়শি দেশকে নদীর পানি থেকে এমনভাবে বঞ্চিত করা যায় না।’’ তা হলে তার মত কী?
আরও পড়ুন:
নিজামীকে রায় পড়ে শোনানো হয়েছে
কল্যাণ রুদ্র বলছেন, ‘‘নদীটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সে কথা মাথায় রেখেই তিস্তার পানির ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত ও বাংলাদেশের চাহিদার পরিমাণ যুক্তিসম্মত হতে হবে। নদীতে একটা ন্যূনতম পরিমাণ পানির প্রবাহ সারা বছর থাকা দরকার। সেটা নিশ্চিত করে তবেই সেচের জন্য তিস্তা থেকে পানি নেওয়ার কথা দু’দেশ ভাবতে পারে।’’ ওই নদী বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা, ‘‘সেচটাই সব নয়, নদীকে বাঁচানো ও পরিবেশ বাঁচানো আসল কথা। একটা নদী বাঁচলে তবেই পরিবেশ বাঁচবে, তাকে কেন্দ্র করে জীববৈচিত্র্য অব্যাহত থাকবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ বাড়বে। কেবল সেচের জন্য নদীকে আধমরা করে ফেললে বা মেরে ফেললে এগুলো সব শেষ হয়ে যাবে। সেচের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি পরিবেশ রক্ষা।’’ কল্যাণবাবুর কথায়, ‘‘আমি পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ বলতে নদীটিকে বাঁচানোর কথা বলেছি। সেচের জন্য পানি নিয়ে নদীটিকে শেষ করে দেওয়ার কথা বলিনি। এটারই ভুল ব্যাখ্যা করছেন কেউ কেউ। এর সঙ্গে তিস্তা চুক্তি হওয়া, না হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।’’
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনও কোনও মহল থেকে এটাও বলা হয়েছিল, তিস্তা চুক্তি করলে উত্তরবঙ্গের ছ’টি জেলায় সেচের অভাবে কৃষিকাজ বড়সড় ধাক্কা খাবে। কিন্তু কল্যাণ রুদ্রর মতে, ‘‘উত্তরবঙ্গে বছরে ২৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। সেখানে চাষবাস কি তিস্তার উপর আদৌ খুব বেশি নির্ভরশীল?’’
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ-নেপাল সচিব পর্যায়ের বৈঠক শুরু
রাজ্য সরকারের একটি সূত্রের খবর, তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তার অনড় মনোভাব থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরবর্তীকালে সরে আসেন। তাকে বোঝানোর ব্যাপারে সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বলে সূত্রের খবর। গত বছর জুনে মমতার বাংলাদেশ সফর অনেকটা সেই উপলব্ধির জায়গা থেকেই। সেবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দু’জনেই হাল্কা মেজাজে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ তিস্তার পানি দিলে বাংলাদেশও ইলিশ পাঠাবে, এমন কথা উঠে এসেছিল রসিকতামূলক কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনায়।
নবান্নের এক কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, তিস্তা চুক্তি হলে যে উত্তরবঙ্গের কৃষকদের কোনও ক্ষতি হবে না, সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝে গিয়েছেন। তা হলে এত দিনে তিস্তা চুক্তি হল না কেন? ওই কর্মকর্তার কথায়, ‘‘প্রথম কথা, উদ্যোগী হতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকে। আর মমতা এটা নিয়ে দরদস্তুর করছেন। কারণ, তিস্তা চুক্তি তো করবে কেন্দ্রীয় সরকার। তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। পশ্চিমবঙ্গের কী লাভ? মমতা সম্ভবত চেয়েছিলেন, যাতে কেন্দ্রীয় সরকার ঋণের সুদ মওকুফ ও কিছু আর্থিক সুবিধে পশ্চিমবঙ্গকে দেয়। তবে সেই ফয়সালা হওয়ার আগেই রাজ্যে বিধানসভার ভোট চলে এলো।’’
অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে যান, তা হলেও তিস্তা চুক্তি নিয়ে মেঘের আড়ালে রূপোলি রেখাই উঁকি দিচ্ছে।
এপিএইচ/








