সমাজ পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন লন্ডন সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, নারীদের শিক্ষাসহ দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং তাদের ক্ষমতায়নে আমাদের এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে আন্তরিক অঙ্গীকার এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব থাকতে হবে। বুধবার বিকেলে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারিতে ‘গ্লোবাল উইমেন লিডার্স ফোরাম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন নারীর জন্য একটি সুষ্ঠু বিশ্ব গড়ে তুলতে আমরা নতুন করে অঙ্গীকার করি, যেখানে আমরা মর্যাদার সঙ্গে এবং সকল প্রকার ভয়-ভীতি থেকে মুক্ত হয়ে বসবাস করতে পারি। এ সময় তিনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজিএস) অর্জনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে গত বছর নিউইয়র্কে আমরা একটি পরিবর্তনশীল এজেন্ডা ২০৩০ গ্রহণ করেছি। নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ সমতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে নতুন এজেন্ডা উপস্থাপন করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একমাত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। তিনি বলেন, আমার সরকার নারী উন্নয়নে উচ্চাভিলাষী নারী উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেখানে নারী এবং পুরুষের সমান সুযোগ সৃষ্টির নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। এই নীতিমালায় আমরা নারী শিক্ষা এবং নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশিচত করার পাশাপাশি তাদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছি। তিনি আরও বলেন, জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে আমার সরকার জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং জাতীয় বাজেটেও নারী উন্নয়নকে সম্পৃক্ত করেছে।
জিডিপি’র ২ শতাংশ নারীর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যার সুবিধাভোগী ভাগ্যবঞ্চিত অসহায় দরিদ্র নারীগোষ্ঠী। নারী শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছে এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও অবৈতনিক নারী শিক্ষা চালু করা সরকারের পরিকল্পনাধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মাধ্যমিক থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েট লেভেল পর্যন্ত দেশের প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন প্রকার মেধাবৃত্তি প্রদানের আওতায় আনা
শেখ হাসিনা বলেন, সারাদেশে হাসপাতাল স্থাপনের অংশ হিসেবে আমাদের প্রতিষ্ঠিত প্রায় ১৬ হাজার ৫শ কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে নারীদের প্রসূতি সেবাও নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার সরকার ‘মেটার্নাল হেলথ ভাউচার স্কিম’ চালু করেছে। যার মাধ্যমে গর্ভধারিণী মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে নিরাপদ সন্তান প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নেও সরকার ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশই বিশ্বে সম্ভবত একমাত্র দেশ, যেখানে সংসদ নেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের উপনেতা, বিরোধী দলীয় নেতা এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। তিনি বলেন, বর্তমান সংসদে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ৭০ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। যা মোট সদস্যদের শতকরা ২০ ভাগ। আমরা ২০২০ সাল নাগাদ সকল রাজনৈতিক দলের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি উপজেলা পরিষদে ১ জন নির্বাচিত মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৩৩ শতাংশ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার নির্বাচিত নারী সদস্য কর্মরত রয়েছেন। এই বাস্তবধর্মী পদক্ষেপের ফলে আমরা সমাজের প্রথাগত মন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছি। আগে যেখানে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে ভালো চোখে দেখা হতো না।
আরও পড়তে পারেন: ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে বিএনপি
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের নারীরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি নারী কূটনৈতিক, বিমানের বৈমানিক, শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পেশায় যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি আমাদের নারীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে কর্মরত থেকে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিরাট ভূমিকা রাখছেন।
বাল্যবিবাহ বন্ধে তার সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আভাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত শিগগিরই সম্ভব, বাংলাদেশ থেকে এই বাল্যবিবাহ চিরতরে বন্ধে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
অনুষ্ঠানে বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট রোজেন প্লেভনেলিয়েভ, উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রী ইভায়লো কালফিন, জ্বালানি মন্ত্রী টামেনুজকা প্যাটকোভা, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী লিলিয়ানা পাভলোভা, ইনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকভা, বুলগেরিয়া জাতীয় পরিষদের চেয়ারম্যান ট্যাসটাসকা টাচেভা এবং সিমেন্স বুলগেরিয়ার সিইও ও সে দেশের কাউন্সিল অব উইমেন ইন বিজনেসের চেয়ারপাসরন বুরিয়ানা ম্যানোলোভাও বক্তৃতা করেন। সূত্র: বাসস
/এমএনএইচ/








