মসজিদের মাইকে আজান ছাড়া অন্য কোনও ঘোষণা না দেওয়াই উচিত বলে মনে করেন দেশের প্রখ্যাত ওলামা ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতারা। অন্য কোনও মাইকেও গুজব ছড়ানো, উস্কানি দিয়ে কাউকে হামলার ঘোষণা দেওয়া কোনওভাবেই ইসলাম সমর্থন করে না বলেও মত দিয়েছেন তারা।
তারা মনে করেন, জরুরি প্রয়োজনে যে কোনও ঘোষণা দেওয়ার আগে মসজিদ কমিটির লিখিত অনুমোদন নেওয়ার নীতিমালা থাকা উচিত। নীতিমালা না থাকায় শাস্তি হয় না বলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে বলেও তারা মনে করেন।
জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদের মাইকে উস্কানি বা গুজব জড়িয়ে হামলার ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালাতেও মসজিদের মাইকের অপব্যবহার হচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এমনকি আসামি ধরতে গেলে পুলিশকে ডাকাত বলে মসজিদ থেকে মাইকিং করে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন সময়।
সর্বশেষে গত ১৩ মে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার কল্যাণদি এলাকার মসজিদের মাইকে উস্কানি ছড়ানো হয়। মাইকে পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ ছড়ানো হয়। এলাকার মানুষদের জড়ো করে ওই প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করা হয়। এরপর সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ওই শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করতে বাধ্য করেন।
আরও পড়ুন: মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ক্ষেপিয়ে তোলা হয় গ্রামবাসীকে
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে এক স্কুলছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে দুই পক্ষে সংঘর্ষের পর এ বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি পাঁচটি গ্রামের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রীদের স্কুলে যেতে নিষেধ করা হয়। অভিভাবকরা ছাত্রীদের স্কুলে যেতে বাধা দেয়।
এ বছরই ১২ মার্চ বরিশালে বিএনপির এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর বাড়িতে হামলা হয়। হামলা চলার সময় গ্রামবাসী মসজিদের মাইকে হামলাকারীদের প্রতিরোধ করার ডাক দেওয়ায় গ্রামের শতাধিক নারী-পুরুষ তাৎক্ষণিক হামলাকারীদের ধাওয়া করে। এ সময় গ্রামবাসীর হাতে ছাত্রলীগের কমপক্ষে ২৫ নেতাকর্মী আহত হন। এছাড়া ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী হামলাকারীদের ২০টি মোটরসাইকেল ভাংচুর করে পুকুর ও ডোবায় ফেলে দেয়।
২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর তাকে চাঁদে দেখা গেছে বলে গুজব ছড়ানো হয় মসজিদের মাইকে। এ ঘটনায় তার বিক্ষুব্ধ সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
২০১৪ সালের ২৪ মার্চে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে পরকীয়া প্রেমে আটকের ঘটনার জের ধরে দুই গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা ও সংর্ঘষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে গ্রামের সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ অন্তত ২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়।
মসজিদের মাইক ব্যবহার করে উস্কানি দেওয়া বা গুজব ছড়িয়ে হামলার ঘটনা অপরাধ বলে মনে করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুযুল হক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মসজিদের মাইক ব্যবহারের কিছু নিয়মনীতি আছে। কেউ অপব্যবহার করলে শাস্তি হওয়া উচিত। মসজিদের মাইকের অপব্যবহার রোধে নীতিমালা থাকা উচিত। যে কোনও ঘোষণার আগে ইমাম, মসজিদ কমিটির অনুমতি নিয়ে ঘোষণার বিধান থাকলে কেউ আর অপব্যবহার করতে পারবেন না।’
বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্মীয় কাজের বাইরে মসজিদের মাইক ব্যবহার করা উচিত নয়। মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা খুবই গর্হিত কাজ। মসজিদের মাইক ব্যবহারে নীতিমালা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উচিত কোনও কোনও ক্ষেত্রে মসজিদের মাইক ব্যবহার করা যাবে তা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করে নীতিমালা করা। পাশাপাশি যারা মসজিদের মাইকের অপব্যবহার করবে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা।’
আরও পড়ুন: ‘আমি ক্ষমা চাইব না’
জাতীয় মুসল্লি কমিটি বাংলাদেশের আহবায়ক ও ইসলামী পত্রিকা পরিষদ বাংলাদেশের জয়েন্ট সেক্রেটারি শহিদুল ইসলাম কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মসজিদে আজান ছাড়া অন্য কোনও ঘোষণা না দেওয়াই উচিত। যেমন হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, কেউ মসজিদে হারানো বিজ্ঞপ্তি শুনলে সে যেন বলে আল্লাহ যেন তোমাকে জিনিসটি ফেরত না দেন। কারণ এ কাজের জন্য মসজিদ বানানো হয়নি (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত হা/৭০৬)। একইভাবে মৃত্যুসংবাদও প্রচার করতে রাসুল (স.) নিষেধ করেছেন (সহিহ তিরমিজি হা/৯৮৬)। সরকারি ঘোষণা ও চিকিৎসার ঘোষণার সঙ্গে মসজিদের কোনও সম্পর্ক নেই।’
শহিদুল ইসলাম কবির বলেন, ‘মসজিদের মাইক ব্যবহারে অবশ্যই নীতিমালা এবং বাধ্যবাধতকা থাকা জরুরি। নির্ধারিত পাঁচ ওয়াক্ত আজান ছাড়া যে কোনও ঘোষণা দেওয়ার আগে মসজিদের সম্মানিত ইমাম/খতিব, মসজিদ কমিটির সভাপতি, সেক্রেটারির সমন্বিত লিখিত সিদ্ধান্তের পরেই ঘোষণা দেওয়া প্রয়োজন। আর আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়ার কারণে হামলার ঘটনা ঘটছে। শুধু মসজিদের মাইক নয়, কোনও মাইকেই কাউকে হামলার ঘোষণা দেওয়া কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না।’
আরও পড়ুন: তাকে সবাই বলে ‘তারছেড়া মাস্টার’: সেলিম ওসমান
/সিএ/এজে








