সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হত্যার হুমকিসহ নানা ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যত কোনও উদ্যোগ নেই। এসব ঘটনায় হুমকিদাতার পেজ বা আইডি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া তেমন কোনও কিছুই করতে পারে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে একটি পেজ বন্ধ করে দিলে নতুন করে পেজ খুলে আবার হুমকির কাজ শুরু করে দুর্বৃত্তরা। এই হুমকি প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কেও জানে না র্যাব-পুলিশ। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তারা নিয়মিত স্ক্যানিং করে। যোগাযোগ মাধ্যমের কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া এই অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের হাতে লাঞ্ছিত শিক্ষক শ্যামল কান্তি ধরকে হত্যার হুমকি দিয়ে সর্বশেষ ফেসবুকে একটি পেজ খোলা হয়েছিল। ওই পেজটি প্রায় দুই দিন সচল ছিল। তবে এরপর দেশের গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর পেজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হুমকিদাতারা আবার বিকল্প পেজ খুলেছে।
ফেসবুক টুইটারে পেজ খুলে হুমকি প্রসঙ্গে র্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এভাবে আসলে সম্ভব না। কোটি কোটি আইডি, কোটি কোটি পেজ নজরে রাখা সম্ভব না। তারপরও আমরা মনিটরিং করছি। কোথায় বসে কোন আইডি ব্যবহার হচ্ছে তাও জানা সম্ভব না। এটা খুবই কঠিন কাজ। এটা বুঝেই এই সুযোগটা নিচ্ছে অপরাধীরা।’
আরও পড়ুন: কূটনৈতিক পাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার, বিজিবির টহল অব্যাহত
র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে দেশের মধ্যেও এই অপরাধ বাড়ছে। সাইবার অপরাধের মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। ব্যক্তির আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ছড়ানোর ঘটনা দেশে ক্রমেই বাড়ছে। এ ছাড়া ঘটছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার ঘটনা। আছে ইউটিউব, টুইটার এবং ব্লগও। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে হুমকি, চাঁদাবাজি, জালিয়াতি, মুক্তিপণ, মোবাইল ব্যাংকিং, প্রতারণা যেমন উপহার পাওয়ার কথা বলে টাকা হাতানো, ভয়-ভীতি দেখিয়ে সুবিধা আদায়, জিনের বাদশা পরিচয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে টাকা আদায় ও বিপদে পড়ার কথা বলে আর্থিক সহায়তা চেয়ে ই-মেইল করা, অশালীন কথাবার্তা, সাধারণ ছবি, অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ও নগ্ন ছবি-ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করা।’
তবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দাবি করেছে, বর্তমানে ফেসবুককেন্দ্রিক অপরাধই বেশি হচ্ছে। তাদের কাছে যেসব অভিযোগ আসে তার ৭৫ শতাংশই সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুককেন্দ্রিক। এগুলো রিপোর্ট করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ বছর পহেলা বৈশাখে রমনাপার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঘুরে দেখে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির জন্য আলাদা একটি সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের কোনও সেল এখনও গঠন করা হয়নি। তবে তারা সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে হেফাজতের ইউটার্ন
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বেশকিছু নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মোবাইল ফোনে ধারণ করা এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল হয়ে যায়। নোয়াখালীর হাতিয়ায় পুলিশের কথিত সোর্স শাহজাহান নামে এক ব্যক্তি ওই এলাকার শাহানারা বেগম নামে এক নারীকে চাঁদার দাবিতে জনসম্মুখে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা গেছে, আইসিটি আইন সংশোধন হওয়ার পরে ২০১৩ সালে ২৫টি, ২০১৪ সালে ৬৫টি, ২০১৫ সালে ৬৫টি এবং এ বছর গত ছয়মাসে ২৩টি মামলার আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে। এর মধ্যে আইসিটি আইনে দায়ের হওয়া মামলাই বেশি। এ সময়ে এসব মামলার মধ্যে আইসিটি আইনে ৬২টি ও পর্নোগ্রাফি আইনে ৩১টি মামলা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪২টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে।
তবে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দেয় তারা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। তাদের বিষয় কোনও তথ্য কখনও পায় না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ বিষয়ে র্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মনিটরিং করছি। হুমকিদাতাদের চিহ্নিত করতে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব হুমকির ঘটনা দেশের বাইরে থেকেও হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কোটি কোটি আইডির ভেতরে অপরাধীদের খুঁজে শনাক্ত করা চ্যালেঞ্জিং। তবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অতীতে যারা হুমকি দিয়েছে, যে কোনও ধরনের সাইবার অপরাধ করেছে, তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।’
/এআরআর/এজে








