
নারী এবং শিশুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণীত হলেও বর্তমানে এটি প্রতিপক্ষকে (স্বামী-স্ত্রী উভয়ক্ষেত্রে) শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ খোদ আইনজীবীদের।আদালতে গত ছয়মাসের পর্যবেক্ষণ থেকে রাষ্ট্রপক্ষের এক আইনজীবী বলছেন, এ আইনে এখন নির্যাতনের চেয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা বেশি করা হচ্ছে। আর সেটা করা হচ্ছে বিচ্ছেদ পাওয়ার কৌশল হিসেবেও।
এইচএসসি পাসের পর নিম্মিকে মতের বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া হয়।এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান প্রেমিকের সঙ্গে। পুলিশের সহায়তায় নিম্মি বাবার বাসায় ফিরলেও কোনভাবেই শশুরবাড়ি পাঠানো যায়নি তাকে। মাস তিনেক পর পরিস্থিতি বুঝে নিম্মির স্বামী তাকে তালাকনামা পাঠালে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এবার নিম্মির পরিবার তাদের মেয়ের ‘ভবিষ্যত’ ভেবে জামাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করে বসে।
ঠিক তেমনই আরেকটি ঘটনায় দাম্পত্য সম্পর্কে স্ত্রী ভুক্তভোগী হন, যখন বিয়ের পরপরই রেবেকা টের পান তার স্বামী অন্য কারোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত।রেবেকা স্বামীকে ছেড়ে আসতে চাইলে শুরু হয় নানা মানসিক অত্যাচার। একসময় উল্টো রেবেকার নামে নানা কথা ছড়ানো শুরু হয় এবং শেষমেষ রেবেকাকে ‘শায়েস্তা করতে’ তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করা হয়। এমনকি তাকে পাগল সাজানোর চেষ্টাও হয়।
আইনজীবীরা বলছেন, প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ, তার পর মুক্তিপণ আদায়, বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ থেকে প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা বেশি হচ্ছে। এর সঙ্গে ‘এক চিমটি পরিমাণ’ যৌতুককে মেশানো গেলেতো কথাই নেই। নারী শিশু নির্যাতন মামলা বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো, বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষ একাধিক মামলা করে। দোষ থাকলেও করে না থাকলেও করে এবং অনেকক্ষেত্রে আইনজীবীরাই এসব মামলা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
অনুসন্ধানে প্রতারণার আরেকটি ধরণ দেখা গেছে, প্রতারণার ক্ষেত্রে এখন মামলা নতুন রূপ পেয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমেও। নারীরা নিপীড়নের শিকার হলেও মুখ খোলেন না। বিশ্বাস করে প্রতারিত হচ্ছেন কিন্তু শেষ অব্দি বিচারের মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে পাশে কাউকে পাচ্ছেন না। আর প্রতারণাগুলো নতুন নতুন রূপ পাচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, জানুয়ারি ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর আওতায় ২ হাজার ৯৫টি মামলায় নিষ্পত্তি হয়েছে ৩শ ৭৪টি। নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় আসামি ছিলেন ৪শ ১০জন। সাজা ২৭জন পেলেও ৩৮০জনই খালাস পেয়ে যান। এরমধ্যে প্রতারণা এবং ধর্ষণ মামলা বেশি।
যেসব মানবাধিকার সংগঠনে এসব মামলা পরিচালনার জন্য প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা হাজির হন তারা বলছেন, নারীদের জন্য আইনি সহায়তা কেন্দ্র থাকলেও পুরুষরা সহায়তা নিতে পারছেন কম। নারীদের সহায়তা কেন্দ্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দাম্পত্য সম্পর্কে প্রতারণা মামলার পাটাতন হিসেবে যে কারণগেুলো সামনে আসছে তা হলো, স্বামীকে বাগে রাখা, দেন মোহর আদায়, পরকীয়া প্রকাশ পাওয়ায় পর সংসার টিকিয়ে রাখার কৌশল, শশুরবাড়ির সদস্যদের শায়েস্তা করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা বেশি আকারে শুরু হয়েছে ২০১১ সালের দিক থেকে।
২০১৩ সালে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছিলেন, নারী নির্যাতন মামলার ৮০ শতাংশই মিথ্যা মামলা। অথচ এসব মিথ্যা মামলার বিচারে অনেক সময় চলে যায়। মামলা দীর্ঘ সময় ধরে চললে বিচার পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মানবাধিকা নেত্রীরা বলছেন, পরস্পরের সম্পর্কে অসহিষ্ণুতার কারণে মামলা এখনও সংখ্যায় বেড়ে যাচ্ছে এবং ন্যয়বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মানবাধিকার নেত্রী এলিনা খান বলেন, বাদী-বিবাদী প্রায় সময়ই মামলায় কোনটা বলবেন বা বলবেন না অপ্রাসঙ্গিক নানা তথ্য দিয়ে মামলাকে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত করেন। ঘটনা যা সেটা দিয়েই মামলা দায়ের করা উচিত। আর এই পরামর্শ আইনজীবীকেই দিতে হবে। তিনি বলেন, একজন মেয়ে কখন মামলা করতে আসেন, যখন তার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। তাই যেকোনোভাবেই হোক না কেন আমরা আইনি সহায়তা প্রদান করতে চেষ্টা করি, যাতে ভুক্তভোগী নারীকে কিছুটা সহায়তা করা যায়। কিন্তু ভিন্ন প্রেক্ষাপটও আছে, যেখানে নারীর পরিবারই আগে পুরুষের বিরুদ্ধে মামলা করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা আপসযোগ্য নয়। কিন্তু হামেশাই আমরা আপস হচ্ছে দেখছি, কখনও কখনও নিজেরাও জড়িয়ে পড়ি। যেকোনও কারণেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ হতে পারে। সব ক্ষেত্রেই মামলা করতে হবে, এটা ঠিক না।
আইনজীবী শাহিদুর রহমান বলেন, মামলার বাইরে সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তায় কীভাবে সমাধান করা যায়, সেটার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের এখানে বেশিরভাগ বিচ্ছেদের পর কাবিনের টাকা না দেওয়ার জন্য মেয়ের ও তার পরিবারের নামে চুরির মামলা দেওয়ার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছে সেটা দুঃখজনক। আর প্রতারণা মামলায় কেবল হেনস্তা করার উদ্দেশ্যে যা হচ্ছে, সেটাও অচিরেই বন্ধ হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: বাবুল আক্তারকে 'জিজ্ঞাসাবাদ' করছে পুলিশ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-আইজিপি বিশেষ বৈঠক
এপিএইচ/ আপ-এসটি








