বাড্ডার বিটিআই প্রিমিয়ার প্লাজায় অগ্নিকাণ্ড

ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রধারী ভবনেই ঢুকলো না পানির গাড়ি

আমানুর রহমান রনি
২৯ জুন ২০১৬, ১৯:৪২আপডেট : ২৯ জুন ২০১৬, ১৯:৪২

বাড্ডায় অগ্নিকাণ্ড ১ উত্তর বাড্ডার রিয়েল এস্টেট কোম্পানি বিটিআই’র  প্রিমিয়ার প্লাজায় পাঁচটি বহুতল ভবন দমকল বাহিনীর ছাড়পত্র নিয়েই তৈরি করা হয়েছে। তবে পাঁচটি ভবনে প্রবেশের জন্য রাখা সরুপথ দিয়ে বুধবারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সময় ভবনগুলোর নিচে পানির গাড়ি নিয়ে যেতে পারেনি দমকল বাহিনী। পানির গাড়ি ঢুকতে না পারায় ঘটনাস্থলে পৌঁছেও আগুন নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছে দমকল বাহিনী।

তবে বিটিআই দাবি করেছে, ইমারত নির্মাণ আইন মেনেই ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনে বিভিন্ন ধরণের অসঙ্গতি থাকায় ওই পাঁচভবনে বসবাসরত ১১৭টি ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভবনে ফাটল ধরায় এবং পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় বাসিন্দারা সবাই অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। কবে ফিরতে পারবেন তাও তারা জানেন না। এদিকে ঘটনা তদন্তে দমকল বাহিনী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বাড্ডায় অগ্নিকাণ্ড ২

বুধবার ভোররাত আড়াইটার দিকে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার বিটিআই প্রিমিয়ার প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দমকল বাহিনীর ২৮টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে ছয় ঘন্টা পর সকাল ৯টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। পাঁচটি ভবনের প্রতিটিতেই চতুর্থ তলা পযন্ত বিভিন্ন ফার্নিচার ও গৃহসামগ্রীর দোকান, শিশুদের খেলার স্থান ছিল। সব পুড়ে গেছে। প্রতিটি ভবনই ১৪ তলা।

বুধবার সকালে উত্তর বাড্ডার বিটিআই প্রিমিয়ার প্লাজার ওই ভবনগুলোতে সরেজমিনে দেখা গেছে, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলার ফার্নিচারের দোকানগুলোর আসবাবপত্র ও ফার্নিচার পুড়ে ছাই হয়ে পানিতে ভাসছে। সেই ছাইয়ের ভেতরেই ব্যবসায়ীরা খুঁজে পেতে দেখছেন কিছু বাকি আছে কিনা। তবে ছাই ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট পাচ্ছেন না তারা। বাড্ডায় অগ্নিকাণ্ড ৩

প্রিমিয়ার প্লাজার ১ নম্বর টাওয়ারের পেছনের অংশের তৃতীয় তলায় ছিল গ্রিল ওয়াল ফার্নিচার। কয়েক ব্যক্তি যৌথভাবে এই ফার্নিচারের শো’রুমটি গত মাস থেকে শুরু করেছেন। গ্রিল ওয়ালে ফার্নিচারের মালিক পক্ষের একজন হলেন রবিউল আউয়াল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ভোররাতে খবর পেয়েছি। তখনই ছুটে আসি। কিন্তু কিন্তু ভেতরে প্রবেশের কোনও সুযোগ ছিল না। চেয়ে চেয়ে দেখছি সব পুড়ে যাচ্ছে।’

দমকল বাহিনীর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘তারা আর একটু তৎপর হলে এতো ক্ষতি হতো না। তারা প্রথমে আসলো, তখন পাইপ ফাটা, এরপর আসলো পানি নেই। ভবনের রিজার্ভ পানি দিয়ে তারা কাজ শুরু করলো। ওপরে পানি দিল সকালে। ততক্ষণে পুড়ে সব ছাই।’

রবিউল আউয়াল বলেন, ‘আমরা নিজেদের জমানো টাকা, ব্যাংক ঋণ ও পরিচিত জনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন আমাদের আছে ছাই। এই মাসে আমরা এটা কেবল শুরু করছি। তার মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল।’

আগুন কিভাবে লাগল? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনই কিছু বলতে পারব না। আল্লাহ জানেন কিভাবে আগুন লাগল।’

ভবনগুলো আবাসিক কাম বাণিজ্যিক বলে দাবি করেছে বিটিআই। পাঁচটি টাওয়ারের নিচেই বেজমেন্ট রয়েছে।  ভবনগুলোর দ্বিতীয় তলায় ছিল- হোম ডেকর, হোম অ্যাসেনশিয়াল, কিচেন অ্যাণ্ড ডাইনিং, স্মল অ্যাপ্লায়েন্স, বেড অ্যাণ্ড বাথ, দ্য এটম, সভেন পিক, বেবি চেইঞ্জির রুম। তৃতীয় তলায় লিভিং রুম, ডাইনিং রুম, বেডরুম, কিডস রুম, ইন্টরিয়র ম্যাটারিয়ালস, মডেল অ্যাপার্টমেন্ট ও বেবি চেইঞ্জিং রুম। চতুর্থ তলায় রয়েছে, হাতিল, কনসেপ্ট, গ্রিন ফার্নিচার, উডেন পার্ল, প্রান্টাম কাস্টমার সার্ভিস, কিডস ড্রপ অফ ও ম্যানেজমেন্ট অফিস। বাড্ডায় অগ্নিকাণ্ড ৪

ভবনে হোম ডেকর নামে ফার্নিচারের শোরুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে কেউ কেউ দাবি করেছেন। তবে তা নিশ্চিত না।

ওই ভবনের ১২/বি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা নাসিমা আকবর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাশের বাসার এক ভাবি আমাদের ডাক দিয়েছিল। এরপর বাসা থেকে বের হয়ে দ্রুত ছেলে মেয়ে নিয়ে ছাদে চলে যাই। এর কিছুক্ষণ পর ছাদ থেকে নিচের দিকে নেমে আসি।’

১২/ই নম্বর ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। ছোট ছোট ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে ওই ভবন থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলের। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এখানে ভাড়া থাকি। রাত আড়াইটার দিকে আগুন টের পাই। সেহেরি খাওয়ার জন্য উঠেছিলাম। ভাগ্য ভালো তাই বেঁচে গেছি। পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রথমে ছাদে উঠছিলাম। পরে নিচে নেমে আসি। আগুন লাগার এক ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে আসে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।’ বাড্ডায় অগ্নিকাণ্ড ৫

এখন কোথায় যাচ্ছেন? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘আত্মীয় স্বজনের বাসায় চলে যাচ্ছি। এখানে তো আর থাকা যাচ্ছে না। তাই চলে যাচ্ছি। আমরা না খেয়ে সবাই রোজা রেখেছি।’

ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সদস্য মঈন উদ্দিন আকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি যখন ফ্ল্যাট কিনি সবকিছু দেখেই কিনেছি। কারণ ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার সময় ওরা এসব কাগজপত্র দেখতে চায়। তবে বিশেষজ্ঞরা আসলে ত্রুটির কথা বলতে পারবেন। আমি বলতে পারবো না। আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি।’

টাওয়ার ৫ এর ডি/সি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হায়াতে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। কী ক্ষতি হয়েছে তা জানার দরকার নাই। বেঁচে থাকলে সম্পত্তি হবে।’

টাওয়ার ৫ এর বাসিন্দা ডা. কানিজ ফাতিমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরাদুইবছর হলো ফ্ল্যাট বুঝে পেয়েছি। ঘটনার সময় কোনোমতে আমি বের হয়েছি। ফ্ল্যাটের দরজাও আটকাতে পারিনি। সন্তান নিয়ে নিচে চলে আসি। হাতে শুধু মোবাইল ছিল।’

তিনি বলেন, ‘এখন আমি মগবাজারে আমার স্বজনের বাসায় চলে যাচ্ছি। এখানে থাকার মত কোনও সুযোগ নেই। বিটিআই কর্তৃপক্ষও কিছু আমাদের এখনও বলেনি।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘আগুন নেভানোর জন্য ভবনের কোথাও পানি রিজার্ভের ব্যবস্থা নেই। ফায়ার অ্যালার্ম নেই। আগুন নেভানোর যন্ত্রগুলো নিরাপত্তাকর্মীরা ব্যবহার করতে জানে না। এতো সব আমরা এখন জানতে পারছি।’

দমকল বাহিনীর পরিচালক (অপারেশন ও তত্ত্বাবধান) মেজর শাকিল নেওয়াজ সাংবাদিকদের বুধবার সকালে জানান, ‘পেছনের চারটি টাওয়ারের দিকে পানির গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না। তাই প্রধান সড়কেই গাড়ি রেখে পাইপ দিয়ে পানি দিতে হয়েছে। ২৬টি ইউনিট কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে নেয়। এখন আগুন পুরোপুরি নিভে গেছে।’ বাড্ডায় অগ্নিকাণ্ড ৬

দমকল বাহিনীর উপ-পরিচালক মোজাম্মেল হক জানান, ভবনটি অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতো বড় ভবনে আগুন নেভানোর জন্য তাদের নিজেদের কোনও ব্যবস্থা নেই। ভবনে ফায়ার সার্ভিসের গা‌ড়ি প্রবেশেরও কোনও ব্যবস্থা ছিল না। নেই পানি সরবরাহের ব্যবস্থা। ফলে আশপাশের বাড়ি, পাশের ঝিল, খাল থেকে পানি সরবরাহ করতে হয়েছে। ফার্নিচার থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

দমকল বাহিনীর অভিযোগ অস্বীকার করে বিটিআই’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রকৌশলী এফআর খান জানান, ‘১১৯৬ সালের ইমারত আইন মেনেই এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী রাস্তার জন্য জায়গা রাখা হয়েছে।’

বাসিন্দারা কবে নাগাদ এখানে বসবাস করতে পারবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গ্যাস, পানি বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এখন এখানে বসবাসের অনুপযোগী। আমরা চেষ্টা করছি যাতে শিগগিরই তারা ফিরতে পারেন।’

কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিনা? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবো। এখনই এই বিষয়ে বলতে পারছি না।’

এদিকে ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা গেছে। এ বিষয়ে বিটিআই’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর বলেন, ‘ফাটল মেইন স্ট্রাকচারে না। এই ফাটলটি দেয়ালে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ না।

পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে দমকল বাহিনী একটি কমিটি গঠন করেছে। বাহিনীর উপ-পরিচালক মোজাম্মেল হক এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, আগুন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণের পর তদন্ত করে আগুনের সূত্রপাত জানা যাবে। এর পর কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম।

আরও পড়ুন- 

পাসপোর্ট খাত দুর্নীতির শীর্ষে: টিআইবি


ভারত ফিরছে সনু

/এআরআর/এফএস/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম