আসন্ন ঈদ উপলক্ষে বর্ষা মৌসুমের অশান্ত নৌপথে ঝুঁকি, বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি মাথায় নিয়েই যারা ঘরে ফিরছেন, তাদের জন্য কর্তৃপক্ষের গাল ভরা আশ্বাস থাকলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। একদিকে রোজ নদীর পানি বাড়ছে, অন্যদিকে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী পরিবহনে মালিকদের প্রবণতা- এ দুয়ের মধ্যে শঙ্কা নিয়েই রওনা হতে হচ্ছে বরিশাল, ভোলাসহ দক্ষিণালের লাখ লাখ মানুষকে।
সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশের মানুষের ৩৫ ভাগ যাতায়াতই সম্পন্ন হয় নৌপথে। আর এই নৌপথেই লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রতিবছর মারা যায় শত-শত মানুষ। এ ধরনের দুর্ঘটনা নিয়মিতভাবে হলেও, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে খুব সামান্যই। এখনও প্রচুর লঞ্চ রয়েছে ফিটনেসবিহীন, জীবন রক্ষাকারী যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই অধিকাংশ লঞ্চে।
ঈদের বাড়ি ফিরছেন হোসনে আরা। সঙ্গে দুই সন্তান। স্বামী যাবেন ৫ জুলাই ঈদের আগের দিন। সদরঘাটে তার কাছে লাইফজ্যাকেট কোথায় পাওয়া যায় জানতে চাইলে বলেন, ‘জানি না। এই জ্যাকেট লঞ্চে থাকে নাকি।’ উল্টো তার করা প্রশ্নে, পথে নৌদুর্ঘটনা ঘটলে এটা কাজে লাগে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ভরসা। বিপদে কেউ কেউরে বাঁচায় না।’
২০১৪ সালের ৪ আগস্ট ঈদের পর ধারণ ক্ষমতার আড়াইগুণের বেশি যাত্রী নিয়ে মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি থেকে ছেড়ে আসা এমএল পিনাক-৬ নামের লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের মাওয়া লঞ্চঘাট থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে ডুবে যায়। নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা ছিল শতাধিক। ২০০৪ সালের ৮ জুলাই ঢাকা টু লালমোহন রুটে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে মেঘনার ডাকাতিয়া মোহনায় ডুবে যায় এমভি নাসরিন। ওই দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাবে ৮শ’ যাত্রীর প্রাণহানির কথা বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ২ হাজার। ২০০৯ সালের ২৮ অক্টোবর ঈদুল আজহার একদিন আগে একই রুটের ফিটনেসবিহীন লঞ্চ এমভি কোকো-৪ অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে লালমোহনের নাজিরপুর ঘাটে কাত হয়ে পড়ে। সবগুলো ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার পর ফিটনেস ছিল না বলে জানানো হয়।
তাহলে এ ধরনের লঞ্চ ছাড়া হয় কি করে- প্রশ্ন তুলে ভোলার যাত্রী রাশেদুল হাসান বলেন, ‘একটা করে ঘটনা হয় আমরা কয়দিন শোক করি, নানা উদ্যোগ নেওয়ার ভান করি। শেষ। এরপর আমরা মনেও রাখি না। অনেকসময় মালিকরা বলার চেষ্টা করেন যাত্রীরা ধারণক্ষমতা বিষয়টা বোঝে না তাই জোর করে উঠে পড়েন লঞ্চে। এটা একেবারেই সত্য কথা নয়। যাত্রীদের ডাকাডাকি করে জোর করে লঞ্চে ওঠানো হয়।’
গত ২০ বছরে (১৯৯৪-২০১৪) নৌকা ডুবি আর দুর্ঘটনায় প্রাণহানী ঘটেছে প্রায় ২৯০০ মানুষের। বছরে গড়ে ১৪৫ জন। এটা সরকারি তথ্য। আর দুর্যোগ ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, দশ বছরে প্রাণহানির সংখ্যা ৬ হাজার ৭শ’ ৫৮। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে ঈদের আগে আগে যাত্রী ধারণের চেয়ে চারগুন বেশি যাত্রী নিয়ে লঞ্চগুলো রওনা হয়।
শেষ সময় পর্যন্ত কাজ করে শ্রমিক ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা যে কোনওভাবেই হোক ঈদে বাড়ি ফিরতে চায়। এই সুযোগ নেয় অসাধু লঞ্চ মালিকরা। অন্যান্য বারের মতো এবার ভিড় না থাকলেও ৩ জুলাই থেকে একদফা ভিড় হবে।
বিআইডব্লিউটিএ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ছোট-বড় লঞ্চের সংখ্যা প্রায় ৮৫০টি। এর মধ্যে বড় আকারের লঞ্চ ২৫০টি। বাকি ৬০০ লঞ্চ ছোট আকারের। বড় লঞ্চের বয়স ১০ বছর ও ছোট লঞ্চের বয়স ২০ বছর। সম্প্রতি বড় ১৬টিসহ কিছু ছোট লঞ্চ নেমেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশে ৮৫০টি লঞ্চের ফিটনেস সার্ভে করেন হাতে গোনা কয়েকজন সার্ভেয়ার যাদের পক্ষে আসলে সঠিক মনিটরিং সম্ভব না।
নৌমন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে লঞ্চ ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লঞ্চগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইফ জ্যাকেট ও বয়া রাখতে বলা হয়েছে। এজন্য নদীবন্দরে বিআইডব্লিউটিএ, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড সদস্য মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা নদীবন্দর থেকে লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পর পথে যাত্রী তুলতে দেওয়া হবে না।’
যদিও এর কোনটিই মানা হয় না বলে অভিযোগ যাত্রীদের। তারা বলছেন, প্রতিবছর আমরা টেলিভিশনে এসব নির্দেশের কথা শুনে আসি এবং তারপর যা ভোগান্তি হয় সেটা হয়ই। আবহাওয়া খারাপের জন্য লঞ্চ দুর্ঘটনার চেয়ে অনিয়মের কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে সেটা সাধারণ মানুষ জানে। কেউ চাইবে না খারাপ আবহাওয়ায় লঞ্চ ছাড়ুক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন রুটে নামানো হয়েছে রঙচঙ ও জোড়াতালি দেওয়া ত্রুটিপূর্ণ ফিটনেসের অসংখ্য নৌযান। লঞ্চগুলোতে নেই পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম। যদিও নৌ পরিবহনমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, সব লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম পর্যাপ্ত থাকতে হবে। সেই নির্দেশ পালনে কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। ফলে যাত্রীদের এবারও ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে, হবে।
যাত্রী দুর্ভোগ কমাতে ও দুর্ঘটনা এড়াতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর এম মোজাম্মেল হক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এবারই প্রথম টিকেট কাউন্টার করে দিয়েছি, একাধিক টার্মিনাল বাড়িয়েছি যাতে যাত্রীদের দুর্ভোগ না হয় এবং ফিটনেসবিহীন লঞ্চ যাতে নামতে না পারে সেজন্য মামলা করতে ম্যাজিস্ট্রেট রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
ভরা নদীতে যাত্রী সুরক্ষার কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘লাইসেন্সধারী ছাড়া কেউ যেন লঞ্চ চালাতে না পারে সে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।’
এসবই কমবেশি প্রতিবারই নেওয়া হয় কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেষ্ট।’
আরও পড়ুন: রমজানে বাজার মনিটরিংয়ের নামে যা হচ্ছে
/এজে/আপ-এআর/








