ঈদের জামাতে জঙ্গিবিরোধী বক্তব্য ইমামদের

জামাল উদ্দিন ও চৌধুরী আকবর হোসেন
০৭ জুলাই ২০১৬, ১২:৫০আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৬, ১৪:৪৭

বায়তুল মোকাররম, জাতীয় ঈদগাহ এবং রাজধানীর অন্যান্য মসজিদসহ সারাদেশের মসজিদ ও ঈদগাহগুলোতে বৃহস্পতিবার ঈদ জামাতের আগে দেওয়া বক্তব্যে কোরআন ও হাদীসের আলোকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন ইমামরা। বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি এবং জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের হেদায়েত কামনায় মোনাজাত করেছেন তারা।

বায়তুল মোকাররমে ঈদের জামাত শেষে মোনাজাত ইমামরা বলেছেন, ইসলামের নামে, আল্লাহর নামে ও জিহাদের নামে কোনও নিরীহ মানুষ হত্যা করা কখনও ইসলাম সমর্থন করেনা। যুদ্ধেও প্রতিপক্ষের ওপর আগে আঘাত করা ইসলাম সমর্থন করেনা। সর্বশেষ আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিতেও জিহাদ ও ইসলামের নামে নিরীহ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। যারা এসব করছে তারা কখনও মুসলমান হতে পারেনা। ইহুদিদের সৃষ্টি এসব জঙ্গি ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ঈদগাহে। প্রধান জামাতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। নামাজের আগে বয়ানে মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান ইসলামে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জামাতের আগে দেওয়া বক্তব্যে মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে ভালোবাসাবোধ বজায় রেখে একে অপরের প্রতি মানুষ সহানুভূতিশীল থাকবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
ঈদের জামাতে মোনাজাত রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের মিনার মসজিদের খতিব মাওলানা আসআদ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় ঈদ জামাতের আগে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, আইএস নামধারী জঙ্গিরা ইসলামের নামে, আল্লাহর নামে মানুষ হত্যা করছে, যা কখনও ইসলাম সমর্থন করেনা। আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিতেও এখন নিরীহ মানুষকে নামাজের সময়ে ইসলামের নামে হত্যা করা হচ্ছে। যারা এসব করে তারা কখনও মুসলমান হতে পারেনা, তারা ইসলাম ও মুসলমানের শত্রু।
মহানবী (সা.) এর সময়ে খন্দকের যুদ্ধের একটি কাহিনী উল্লেখ করে মাওলানা আসআদ বলেন, ইহুদি ও বিধর্মীদের সৃষ্ট জঙ্গিরা ইসলাম ও জিহাদের নামে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে। না হয় মদিনার মতো পবিত্র নগরীতে কিভাবে বোমা ফাটায়, যেখানে আল্লাহর রাসুল স্বয়ং জীবিত শুয়ে আছেন।
বায়তুল মোকাররমে ঈদের জামাত তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসুলের রওজায় গিয়ে দরুদ পড়লে তিনি নিজে শুনেন। যারা দূর থেকে আল্লাহর রাসুলকে সালাম দেন, সেটা তাকে পৌঁছে দেওয়া হয়। অথচ সেখানে বোমা ফাটানো হয়েছে। মাওলানা আসআদ বলেন, এসব করে জান্নাতে যাওয়া যাবেনা। এটা জান্নাতের পথ নয়, জাহান্নামের পথ। জান্নাতের পথ হচ্ছে কোরআন ও রাসুলের পথ। যারা এসব হামলা করেছে তারা কোনও মাদ্রাসার ছাত্র নয়, আলেমও নয়। তাদের ভুল বুঝিয়ে ও বিভ্রান্ত করে ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছে।
জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের সুপথে ফিরে আসা ও হেদায়েতের জন্য দোয়া করে অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, নিজেদের সন্তানদের প্রতি নজর রাখুন। তাদেরকে বিজ্ঞ আলেমদের কাছে নিয়ে যান।
এছাড়াও রাজারবাগ পুলিশ লাইন মাঠ, মোহাম্মদপুরের জামে মসজিদ, আলফালাহ মসজিদ, আজিমপুর জামে মসজিদ, সোবহানবাগ জামে মসজিদ, গণভবন মসজিদ, বনানী জামে মসজিদ, গুলশান আজাদ মসজিদ, শুক্রাবাদ জামে মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা তাদের বক্তব্যে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কোরআন ও হাদীসের আলোকে যুক্তিনির্ভর বক্তব্য তুলে ধরেন। তারা বলেন, কোনও কারণ ছাড়া নিরীহ মানুষদের ওপর অন্যায়ভাবে হামলা চালানো কখনও ইসলাম সমর্থন করেনা। অন্য ধর্মের মানুষের ওপরও হামলা করা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে ৫টি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জামাত সকাল ৭টায়, দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টায়, তৃতীয় জামাত সকাল ৯টায়, চতুর্থ জামাত সকাল ১০টায় এবং সর্বশেষ জামাত সকাল পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠিত হয়। এসব ঈদ জামাতে ইমামতি করেন, মুফতি মুহিবুল্লাহিল বাকী নদভী, ড. মাওলানা মুশতাক আহমাদ, মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালিয়ুর রহমান খান, মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রব মিয়া আল বাগদাদী ও মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।
জাতীয় ঈদগাহে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ঈদ জামাতে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এসময় রাষ্ট্রপতির পাশে বসে ঈদ জামাতে অংশ নেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন, ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদগণ। এছাড়াও সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ঈদের এই প্রধান জামাতে অংশ নেন।
আলাদা ব্যবস্থায় ঈদের জামাতে অংশ নিয়েছেন নারীরাও। ঈদ জামাত উপলক্ষে এবার বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। মেটাল ডিটেক্টর ছাড়াও জাতীয় ঈদগাহ মাঠের পুরো অংশ ডগ স্কোয়াড দিয়ে তল্লাশি করা হয়েছে। মাঠ ও এর আশেপাশে স্থাপন করা হয় সিসিটিভি। সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেছেন র্যা ব, সোয়াত, এপিবিএনসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নামাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ৮টা ৩৬ মিনিটে। নামাজের মোনাজাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয়। পাশাপাশি দেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের জন্য দোয়া চাওয়া হয়। এসময় রাষ্ট্রপতিসহ দেশের জনগণ ও মুসলিম উম্মাহর দীর্ঘায়ু ও উন্নতির জন্যও দোয়া করা হয়।
রাজধানির লালবাগ থেকে সন্তানসহ জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নামাজ পড়েছেন রফিকুল আলম। তিনি বলেন,এখানে প্রধান জামাত হয় অনেক মানুষ এক সঙ্গে নামাজ পড়া যায়, তাই এখানে নামাজ পড়তে আসি। দোয়া করেছি নিজের ও দেশের শান্তির জন্য।
অন্যবারের চেয়ে অনেক বেশি লোক সমাগম হয়েছে ঈদগাহে। ভেতরে জায়গা না পেয়ে বাইরের রাস্তার ওপরেই জামাতে অংশ নেন অসংখ্য মানুষ। দক্ষিণে শিক্ষাভবন, উত্তরে মৎস্য ভবন ও পূর্বে প্রেসক্লাবের গেট পর্যন্ত এই ঈদ জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের আশেপাশে ছিলেন অনেক বিদেশি ফটো সাংবাদিকসহ অনেক বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। যা আগের ঈদ জামাতগুলোতে কখনও দেখা যায়নি।
এদিকে পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন। একইসঙ্গে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের প্রধানরা, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা, পুলিশ সদস্যরা এবং বিপুল সংখ্যক মুসল্লিও সেখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/সিএ/জেইউ/এপিএইচ/আপ-এমও

আরও পড়ুন: শোলাকিয়ায় বোমা হামলায় পুলিশসহ নিহত ২, আহত ১২


সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম