হলি আর্টিজানের সেই ভয়াবহ রাত

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
০১ আগস্ট ২০১৬, ১৩:৩৬আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৬, ১৪:৪৩

হলি আর্টিজান বেকারি

রাত  তখন আনুমানিক ৮টা ৩৫ মিনিটি। নারী ও পুরুষসহ ৯ ইতালীয় রাতের খাবারের জন্যে ‘ও কিচেনে’ ঢোকেন (ও কিচেন আর হলি আর্টিজান মূলত একই ভবন)। এদেরই একজন সিমোনা মন্টি। তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনজন বসলেন বাইরের পেতে রাখা চেয়ারে। বাকি ছয়জন বসলেন ভেতরে ৯ নম্বর টেবিলে। ওখানে তাদের জন্য সংরক্ষিতই থাকে জায়গা।

ওদিকে আট জাপানির দলটি ছিল ৮ নম্বর টেবিলে। তারা রাতের খাবার শেষ করেছেন বেশিক্ষণ হয়নি। কফির অর্ডার দিয়েছেন। বাইরের চত্বরে আগে থেকেই বসেছিলেন শ্রীলঙ্কার নাগরিক হরিকেশ বিজেসেকারা। কথা বলছিলেন বন্ধু ইশরাত আকন্দের সঙ্গে। তারা বিকালে এসেছেন। রাতের খাবারের সময় হলে হরিকেশের স্ত্রী পাপেতা শ্যামা তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

চত্বরের এক ছাউনির নিচে ছিলেন তাহমিদ খান, মালিহা ফাইরুজ আর তাহানা তাসমিয়া। আইসক্রিম পর্ব চলছিল তাদের। সেদিনের ওই মৃত্যুপুরীতে সর্বশেষ প্রবেশ করেন তিনজন। ফারাজ হোসাইন, অবিন্তা কবীর ও তারিশি জৈন।  বসলেন দরজার একদম পাশে, ১ নম্বর টেবিলে। ৭ নম্বর টেবিলে ছিলেন হাসনাত করিম, তার স্ত্রী শারমিনা করিম, দুই সন্তান শেফা ও রায়হান।

আনুমানিক রাত ৮টা ৪০ মিনিট: কালো কুর্তা পাজামা পরা পাঁচজন ও কিচেন/হলি আর্টিজানের চত্বরে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে গুলি করতে শুরু করলো। চাপাতি ও বন্দুকধারী ওই আক্রমণকারীদের তাণ্ডবে মুহূর্তে নরক হয়ে উঠলো হলি আর্টিজান। প্রথম নিহত হন পিৎজা শেফ সাইফুল চৌকিদার। ফোনে কথা বলছিলেন তিনি। পরদিন লনে তার গুলিবিদ্ধ মরদেহ আবিষ্কার করা হয়।

গোলাগুলির মুহূর্তে  চত্বর বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। ইসরাত আখন্দ আহত হন। পেছন থেকে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। ইতালীয়দের বেশিরভাগ মারা পড়েন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা গুলিবিদ্ধ ও ধারালো অস্ত্রে জখম হয়েছিলেন। ইতালীয়দের একজন পালাতে পারেন। সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তির নাম জিয়ানি বোশ্চেনি।

ভেতর থেকে আত্মরক্ষার জন্যে বেরিয়ে পড়েন জাপানি নাগরিক তামাওকি ওয়াতানাবে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ওখানেই পড়ে যান তিনি। সৌভাগ্যবান তিনিও। পড়ে যাওয়ার পর কোনও রকমে উঠে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে লনের শেষ মাথায় পুরনো পিৎজা ওভেনের দিকে যেতে সক্ষম হন। তামাওকিকে অনুসরণ করেন হরিকেশ দম্পতি ও সত্যপ্রকাশ। তামাওকিসহ শ্রীলঙ্কান হরিকেশ দম্পতি লুকিয়ে পড়তে সক্ষম হন। ধরা পড়েন সত্যপ্রকাশ। রেস্তোরাঁয় তিন বন্দুকধারীর প্রবেশ।   

রাত আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিট: জঙ্গিরা গুলি করতে করতে প্রবেশ করে। বিভিন্ন টেবিলের কাছে অবস্থান নেয়। জাপানি ও ইতালীয়রা পালাতে চেষ্টা করতে থাকেন। এরপর থেকে টানা ১০-১২ মিনিট একটুর জন্যেও থামেনি গুলির শব্দ। এ পর্যায়ে আর্জেন্টিনার শেফ দিয়েগো রসিনি, ইতালীয় শেফ জ্যাকোপো বিয়োনি এবং রেস্তোরাঁর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মচারী ছাদের ওপর দিয়ে পাশের বাড়ির চত্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ রক্ষা করে। ৯ কর্মচারী একটা জানালা ছাড়া বাথরুম ভেতর থেকে আটকে আত্মগোপন করে।

আনুমানিক রাত টা ৫৭ মিনিট: ভেতর ও বাইরের ডাইনিং অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে অনেকগুলো মরদেহ। কফি রুমে আশ্রয় নেওয়া চারজনের মধ্য থেকে একজন জাপানিকে বের করে গুলি করে হত্যা করে জঙ্গি রোহান ইমতিয়াজ। এর আগে দরজায় লাথি দিতে দিতে বলতে থাকে, ‘তোমরা কি মুসলিম? মুসলিম হলে সে মারবো না।’

আনুমানিক রাত ৯টা: হাসনাত করিম তার ৭ নম্বর টেবিলে বসে আছে। সত্যপ্রকাশকে ধরে এনে টেবিলে বসানো হয়েছে। তাহমিদদের তিনজনকে ছাউনি থেকে ধরে নিয়ে এসে ৬ নম্বর টেবিলে বসানো হয়েছে। ওরা ভয়ে কাঁপছিল। সবাইকে মাথা নামিয়ে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হলো। এসময় নিবরাস ইসলাম কথা বলে উঠলো। তাকেই দলনেতা বলে মনে হচ্ছিল। আরবি, ইংরেজি ও বাংলায় নিবরাস বলে যাচ্ছিল, মদ পরিবেশন গুনাহ।

এ সময় জঙ্গি শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল বাথরুম থেকে বেরিয়ে পালানোর সময় ইতালীয় এক নারীকে গুলি করে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

আনুমানিক রাত ১০টা ৩০ মিনিট: দোতলায় দুজন অবস্থান নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ও গ্রেনেড ছুড়তে থাকে। এ সময় বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন আহমেদ ও গোয়েন্দা বিভাগের (উত্তরের) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম গুরুতর আহত হন। আহত হন আরও ৩৩ জন পুলিশ সদস্য।

এ সময় হাসনাম করিমের স্ত্রী শারমিন করিমের ফোন ৭ নম্বর টেবিল থেকে বেজে ওঠে। ফোনের ওপাশে তার মা। লাউড স্পিকারে বলা হয়, ‘আমি ভালো আছি।’ এখানে উল্লেখ্য সবার ফোনই সাত নম্বর টেবিলে জড়ো করা হয়েছিল। আরও অনেকের ফোনেই কল আসছিল। কিন্তু আর কাউকে ফোন ধরতে দেওয়া হয়নি। একজন বাংলাদেশি কর্মচারীর বাড়ি থেকে ফোন এলে তাকে ধরতে না দিয়ে জঙ্গিদের একজনই ওই কর্মচারীর হয়ে বার্তা পাঠিয়ে দেয়, ‘চিন্তার কিছু নেই।’

ভারতীয় সময় রাত দেড়টায়, অর্থাৎ বাংলাদেশি সময় রাত ১টায় তারিশির পরিবার হুমকি দেওয়া একটা বার্তা পায়। কিন্তু বাংলা ট্রিবিউন সূত্রের জানা মতে, এর আগেই মেরে ফেলা হয়েছে তারিশি জৈনকে।

এ সময় চিলার রুম থেকে একজন জাপানি ও একজন বাংলাদেশিকে বের করে জাপানের নাগরিককে গুলি করা হয়।

জঙ্গি রোহান কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করে, কী কী ‘হালাল’ খাবার এখানে আছে।

আনুমানিক রাত ১১টা: নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডটি এ সময় ঘটে। অন্তত ৩০টি কোপ দিয়ে লাল জামা পরিহিতা এক নারীর মৃত্যু নিশ্চিত করে পর পর দু’জঙ্গি।

আনুমানিক রাত ১১টা ২০ মিনিট: ওসি সালাউদ্দিনের মৃত্যুতে উল্লাস করে জঙ্গিরা। বলে, বাইরে ওসি মৃত, আর আমরা এখানে জীবিত। পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব তোমাদের উদ্ধার করতে এসেছে। কিন্তু ওরা পিছু হটবে।

আনুমানিক মধ্যরাত: জঙ্গিরা বাইরের খবরা-খবর নেয়। জানতে চায়, কত জন মারা গেছে। এ সময় রেস্তোরাঁর ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড জানতে চাওয়া হয়। ওয়াইফাই ব্যবহার করে ভেতরকার ছবিগুলো বাইরে প্রকাশ করা হয়। জঙ্গিরা জানতে পারে বেরোনোর সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের ভেতর বেরোনোর কোনও তাড়া তেমন একটা দেখা যায় না।

এ সময় কফি খেতে খেতে বেঁচে থাকা কর্মচারীদের জঙ্গিরা জিজ্ঞেস করে, আইএস-এর ব্যাপারে ওরা শুনেছে কিনা। আরও বলে, দেশি মানুষকে মারার নির্দেশ ওদের ওপর নেই। শুধু বিদেশিদের মারতে ওরা এসেছে। ইসলামকে যারা ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে।

জঙ্গি রোহান বলছিল, ‘সব মুসলমান ভাই-ভাই। যখন ইউরোপ-আমেরিকায় মুসলমান মারা যায় তোমাদের খারাপ লাগে না?’

আনুমানিক রাত ২টা-পৌনে ৪টা: ক্লিনিকের দিকের কলাপসিবল দরজা আটকে দিতে বলা হয় হাসনাত করিমকে। স্টাফদের বলা হয় গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে আসতে। সিলিন্ডারগুলো ওপর তলাসহ জানালাগুলোর পাশে রাখতে বলা হয়।

আনুমানিক রাত ৩টা: স্টাফদের ‘প্রফেশনালি’ সেহেরি সার্ভ করতে বলা হয়। জিম্মিদের সেহরি খেতে দেওয়া হয়। শুধু জঙ্গি পায়েলের জন্যে আসে চিংড়ি। ভোর হয়ে আসতে থাকলে দরজার কাছে কর্মচারীদের একজনকে বসতে বাধ্য করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণ ঠেকাকে মানব-প্রতিরোধ হিসেব ব্যবহার করা হয় ওই কর্মচারীকে। কর্মচারী জাকির হোসেন শাওন গুরুতর আহত অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। পরে পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যু হয়।

ভোর: হাসনাত করিমসহ তিনজন (অন্তত একজন জঙ্গি) ছাদের ওপর ওঠে। নেমে আসার পর হাসনাতকে প্রধান ফটক খুলতে বলা হয়। কিন্তু চাবি কাজ করছিল না। এরপর তাকে কলাপসিবল দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে বলা হয়। ৭ নম্বর টেবিলে জড়ো করা মোবাইল ফোনগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এসময় নিবরাস বলে, ‘আমরা মারা যাবো। তবে এটা নিশ্চিত, আমারা বেহেশতে চলেছি।’

আনুমানিক পৌনে ৮টা: অপারেশন থান্ডার বোল্টে পাঁচ জঙ্গির মৃত্যু ঘটে। ১৩ জনকে উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন:

জঙ্গিদের বাসা ভাড়া নেওয়ার মূল হোতা করিম কোথায়?

গুলশান হামলার ১মাস: মূল হোতারা কোথায়?

গুলশান হামলা: একমাস ধরে জঙ্গিদের লাশ মর্গে

/এইচকে/এসটি/এপিএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম