আর্টিজানে জঙ্গি হামলার একমাস

শুধু বেকারির মানুষকেই না আমাদেরও হত্যা করেছে

জাকিয়া আহমেদ
০১ আগস্ট ২০১৬, ২২:০২আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৬, ২২:৪২




গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহতদের স্মরণে ব্যানার ‘জঙ্গিরা শুধু বেকারির ভেতরের মানুষকেই হত্যা করেনি, আমাদেরও হত্যা করেছে’ বলেন পীর আলী। প্রায় ১৫ বছর ধরে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের মধ্যে ফুটপাতে বসে চা, বিস্কুট, কলা, রুটি, কেক বিক্রি করছেন তিনি।

১ জুলাইয়ের জঙ্গি হামলার কথা স্মরণ করে আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বলেন, গুলশানের এসব রাস্তায় আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একেবারে হত্যা করেছে জঙ্গিরা।

ঠিক একমাস আগে আজকের এই দিনে (১ জুলাই) গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডে পা ফেলার জায়গা ছিল না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, মিডিয়াকর্মী, জঙ্গি হামলায় আটক জিম্মিদের পরিবারসহ আশেপাশের মানুষ এখানে ভিড় করেছিলেন এখানে।

আর আজ ঠিক একমাস পরের চিত্রটা ঠিক একেবারেই উল্টো।কেবল সংবাদকর্মীরা ছাড়া আর কেউ পা রাখেননি এখানে। গুলশান হামলায় নিহতদের স্মরণে নেই কেউ! নেই কোনও মোমবাতি কিংবা ফুলের তোড়াও। পুরো এলাকাটাই নীরব-নিস্তব্ধ! বন্ধ রয়েছে সামনের লেকভিউ ক্লিনিকও।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ৭৯ নম্বর রোডের প্রধান ব্যারিকেড স্থলে দায়িত্ব পালন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। ব্যারিকেডের সামনে কাঁটাতারের সঙ্গে লাগানো রয়েছে হামলার পর নিহতদের স্মরণ করে দুটো ব্যানার। ডানপাশে আরেকটি কালো কাপড়ে স্মরণ করা হয়েছে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহতদের। তাদের ছবিও টানানো আছে এখানে। তবে এগুলোর সব কিছুই পুরনো। হলি আর্টিজানে হামলার পর পুলিশি ব্যারিকেডের সামনেই জমা হয়েছিল ফুলের স্তূপ। নিহতদের স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এ সব ফুল দিয়ে তাদের স্মরণ করেছেন। স্মরণ করেছেন অতীত স্মৃতি। নিহতদের স্মরণ করে তারা এখানে প্রজ্জ্বলন করেছিলেন মোমবাতি। মোমবাতির আলো জ্বেলে স্বজনেরা নীরবে চোখের জল ফেলেছেন এখানে! বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে নিহতদের মঙ্গল কামনা করেছেন। ফুলের স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনাও করেছেন কেউ কেউ।

মাঝখানে পার হয়ে গেছে একমাস। আজ সেখানে একটি নতুন ফুলও জমা হয়নি! নিহতদের স্মরণ করে কেউ একটি মোমবাতিও জ্বালাননি! বরং যা ছিল পাশের বাড়ির পরিচ্ছন্নকর্মীরা তা ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। এ সবের পরেও হলি আর্টিজান বেকারির সড়কে আজও বিরাজ করছে একরকম নীরবতা! কেমন যেন মনভার করা পরিবেশ। বুকের ভেতরে কেমন যেন কষ্ট জেগে ওঠে এখানে এলে। স্বাভাবিক পরিবেশকে কেমন করে যেন উল্টেপাল্টে তছনছ করে দিয়ে গেছে ১ জুলাইয়ের জঙ্গি হামলা। তা কেউই ভুলতে পারছেন না। ভুলতে পারছেন না সেদিনের উৎকণ্ঠার কথা।  

গিয়ে দেখা গেল, হলি আর্টিজান বেকারির পাশের ভবনগুলো থেকে বাসিন্দাদের ঢুকতে এবং বের হতে এখনও তল্লাশি করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে বাসিন্দারা খুবই আন্তরিক জানালেন গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আজাদুজ্জামান।

নীরব হলি আর্টিজান বেকারির সড়ক আজ সকাল ৮টা থেকে দায়িত্বে থাকা আজাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাসিন্দাদের এখনও তল্লাশি করা হচ্ছে। তারা কি কখনও বিরক্ত হচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা খুবই আন্তরিক। ব্যারিকেডের সামনে এসেই গাড়ির গ্লাস নামিয়ে দিচ্ছেন। গাড়ির গতি স্লো করে দিয়ে পরিচয় দিচ্ছেন। সামনের গাড়ি আগানোর জন্য পেছনের গাড়ি অপেক্ষা করছে, হর্ন দিচ্ছে না। সবাই ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশ বজায় রেখে চলছেন।

যথেষ্ট আন্তরিকতা আমরা তাদের কাছ থেকে পাচ্ছি বলে জানালেন এসআই আজাদুজ্জামান।

হলি আর্টিজানের পাশের এক বাড়ির একজন নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিকেলের দিকে যখন অনেক পুলিশ আসে, তখন তাদের সঙ্গে কয়েকদিন গেছি আর্টিজানের সামনে। সবকিছু তেমনই আছে। শুধু মাঠের ভেতরে থাকা সিমেন্টের বসার জায়গাটা ভেঙে গেছে। ভেতরে পাঁচ থেকে ছয়টির মতো গাড়ি রয়েছে।

রক্ত ধুয়ে ফেলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তবে জায়গাটায় খুব দুর্গন্ধ। নাকে হাত চেপে সেখানে যেতে হয়। ভেতরের আসবাবপত্রে হাত দেওয়া হয়নি। যেটা যেখানে ছিল, সেটা সেখানেই আছে এখনও।

প্রায় ১৫ বছর ধরে ৭৯ নম্বর সড়কের মধ্যে ফুটপাতে বসে চা, বিস্কুট, কলা, রুটি, কেক বিক্রি করছেন  গোপালগঞ্জের পীর আলী শেখ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গুলশানের এসব রাস্তায় আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একেবারে হত্যা করেছে জঙ্গিরা।

হলি আর্টিজান বেকারিতে নিহতদের স্মরণে টানানো ব্যানার
তিনি বলেন, সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে বাসায় গেলাম। তারপর খুলেছি ১৫ রোজায়। আমি তবুও সাহস করে একটু বসি কিন্তু আশেপাশে অন্য যারা ছিল তারা কেউ এখানে বসতে সাহস পাচ্ছে না। কী করে চলছে তাদের, সেটা কেবল আমরাই জানি! জঙ্গিরা শুধু বেকারির ভেতরের মানুষকেই হত্যা করেনি, আমাদেরও হত্যা করেছে!

নোয়াখালী থেকে আসা পলাশ এবং মোরশেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শুধু বাংলাদেশই না, পুরো বিশ্বের জন্যই এই সন্ত্রাসবাদ হুমকি। বাংলাদেশে আগে সেটা না থাকলেও এখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবার থেকে কেন এসব তরুণরা এই ঘৃণ্য কাজে নিজেদের জীবন দিচ্ছে, সেটা বের করতে হবে। নইলে তো আমাদের মুক্তি নেই! 
/জেএ/এবি/

আরও পড়ুন

‘সেই জিম্মি দশা থেকে এখনও মুক্তি পাইনি’

গুলশান হামলায় স্বজনহারাদের কথা
‘এ শূন্যতা অস্থির করে বেশি’

নীরব হয়ে গেছেন অবিন্তার মা

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
জিয়াউর রহমানের আদর্শ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়: আইনমন্ত্রী
জিয়াউর রহমানের আদর্শ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়: আইনমন্ত্রী
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে:  প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের