২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরপরই কোনও রকম আলামত সংরক্ষণের চিন্তা না করে দ্রুত সব সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়।সিটি করপোরেশনের গাড়ি এনে সব ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেওয়ার পাঁয়তারাও করে তৎকালীন জোট সরকার। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, প্রথম থেকেই ঘটনাস্থলের সব আলামত নষ্ট করা হয়। তারপরও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আলামত সংগ্রহ করে তা গুরুত্ব সহকারে যাচাই-বাছাই করে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ জন আহত হন। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ জুড়ে নিহত ও আহতদের ছিন্নভিন্ন হাতপা, আঙুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। আহতদের চিৎকারে তখন এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন ও পরে হাসপাতালে মারা যান আরও ১২ জন।
প্রধান অতিথি হিসেবে শেখ হাসিনা সেদিন বিকেল পাঁচটায় সমাবেশ স্থলে আসেন এবং একটি খোলা ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে ২০ মিনিট বক্তৃতা করেন। এরপর বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার মুহূর্তে গ্রেনেড হামলা শুরু হয়।
‘তখন বিএনপি ক্ষমতায়। আলামত রক্ষা করা তো দূরের কথা, সিটি করপোরেশনের গাড়ি এনে আলামত দ্রুত নষ্ট করে। দুটো গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়নি। সেগুলো সংরক্ষণ না করে নষ্ট করে দেয়’, ২০১৫ সালে আয়োজিত স্মরণ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সব কথা বলেন।
অভিযোগপত্রেও এ আলামত নষ্ট করার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়। অবিস্ফোরিত গ্রেনেড ধ্বংস করা হয় যাতে গ্রেনেডে কোনও হাতের ছাপ না পাওয়া যায়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হাজার মানুষের সমাবেশে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ এসেছিলেন সারাদেশে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিতে। বক্তৃতা শেষে গণমিছিল শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই আচমকা গ্রেনেডের শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারদিক।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কোনও সমাবেশের সময় যত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকে, সে তুলনায় সমাবেশ এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। সমাবেশের আশেপাশের উঁচু ভবনগুলোতে বরাবরের মতো কোনও পুলিশি পাহারা ছিল না। আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকদেরও সেখানে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলেন, গ্রেনেড হামলার সময় থেকেই সরকার, প্রশাসন এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। পৈশাচিক এই হামলার পর সমস্ত আলামত ধ্বংস করার চেষ্টাও করে পুলিশ ও প্রশাসন। ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত দুটি গ্রেনেড আলামত হিসেবে রক্ষা না করে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এতে ঘাতকদের হাতের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়। হামলার আলামত নষ্টের জন্য হোসপাইপ দিয়ে রাতেই ঘটনাস্থল ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে ফেলা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন,গ্রেনেড হামলার পর এ মামলাটিকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়। এ ঘটনায় মোট তিন দফা তদন্ত হয়েছে। ২০০৪ সালে ঘটনার পর প্রথম তদন্ত হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। তখন ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজানো হয়। কিন্তু ওই ঘটনা ২০০৭ সালে ফাঁস হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় দফা তদন্ত করা হয়। তদন্তের পর ২০০৮ সালের ১১ জুন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু এবং সংসদ সদস্য মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার পর মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ বলেন, তদন্তের প্রথম দিকে বিভিন্ন পর্যায়ে আলামত নষ্ট করা হয়েছে। তারপরও তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে আলামত সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই করে এ মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছেন।
এআরআর/এবি/
ছবি- সংগৃহীত
আরও পড়ুন
২১ আগস্ট আশ্চর্যজনকভাবে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়: প্রধানমন্ত্রী
মনে হলে এখনও বুক কেঁপে ওঠে: প্রত্যক্ষদর্শীরা







