‘ওইদিনের ঘটনা ছিল নারকীয়, বিভৎস। কোনও সভ্য সমাজে এ ধরনের বর্বরতা হতে পারে তা ছিল কল্পনাতীত। ছোপ-ছোপ রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউর পিচ ঢালা কালো পথ। চারিদিকে শোনা যাচ্ছিল শুধু আর্তনাদ। মনে হয়েছিল লাশের স্তূপ পড়ে আছে। জুতো-স্যান্ডেল-চশমা-ব্যাগ ছড়িয়ে-ছিটে ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যলয় প্রাঙ্গণে। সেই দিনের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ, বিভৎসতার কথা মনে হলে এখনও বুক কেঁপে ওঠে।’ একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ওই দিনের ঘটনা এভাবেই বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তুলে ধরেছেন।
ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশে সুপরিকল্পিতভাবে নিরস্ত্র জনতার ওপর সমরাস্ত্র দিয়ে জঙ্গি হামলা করা হয়েছিল। এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গণহত্যা। এ ধরনের ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল বলেও জানান তারা।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রাষ্ট্রপক্ষের একজন সাক্ষীও। গত বছরের শেষ দিকে তিনি আদালতে সাক্ষ্যও দিয়েছেন। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা তুলে ধরে সুরঞ্জিত সেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল জলিল, আমির হোসেন আমু, মোহাম্মদ হানিফ, মতিয়া চৌধুরীসহ আমরা ওই ঘটনার সময় মঞ্চে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পাশেই বসা ছিলাম। আমাদের বক্তব্য শেখ হওয়ার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিকাল ৫টার দিকে বক্তব্য রাখেন। বক্তব্য শেষে শেখ হাসিনা মঞ্চ থেকে নামার সময় একজন ফটো সাংবাদিক ছবি নেওয়ার অনুমতি চান। এ সময়ই আর্জেস গ্রেনেডের বিস্ফোরণ শুরু হয়। গ্রেনেড হামলার পরপরই ঢাকার প্রয়াত মেয়র হানিফের নেতৃত্বে মানব ঢাল তৈরি করে দেশনেত্রী শেখ হাসিনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এ সময় আমি আহত হয়ে জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরে পেয়ে যুবলীগ কার্যালয়ে ঢুকে সেখানে সাবের হোসেন চৌধুরীসহ কয়েকজনকে দেখতে পাই। তারা আমাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
ঘটনার বর্ণনা করে সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ওটা ছিল অত্যন্ত বীভৎস। সেদিন অসহায় মানুষের চিৎকার দেখেছি। যারা ওই বীভৎস ঘটনার শিকার হয়েছিলেন, তাদের কারও শরীর থেকে পা চলে গেছে, হাত চলে গেছে। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি। যা ছিল নজিরবিহীন। এমন বর্বরোচিত আক্রমণ করতে পারে, এটা আমার কল্পনাই ছিল না।
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাকে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশে সুপরিকল্পিতভাবে নিরস্ত্র জনতার ওপর সমরাস্ত্র দিয়ে জঙ্গি হামলা করা হয়েছিল। এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গণহত্যা। যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
গ্রেনেড হামলা আহত আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেত্রী উম্মে রাজিয়া কাজল বলেন, ওইটা ছিল বিভৎস দৃশ্য ও বর্ণনাতীত। আগে-পরে অনেক সভা সমাবেশে গিয়েছি। কিন্তু এ রকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়নি। কখনও যেন কারও এ ধরনের পরিস্থিতি পড়তে হয় সেটা কল্পনাও করতে চাই না। গ্রেনেডের তো তখন নামও শুনিনি। শুনেছি বোমার কথা। ওই রকম হামলা। দেখি লাশ আর লাশ রক্ত আর রক্ত। জীবনে প্রথম এ অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলাম ওই দিন। ঘটনার পর আমার কী অবস্থা হয়েছিল তা মনে নেই। পরে জ্ঞান ফিরে দেখি আমি হাসপাতালের বেডে। ওই ঘটনার পর আতঙ্ক ও ভয়ে অনেক রাতে ঘুম হয়নি বলেও জানান ৩ শ’র বেশি স্প্লিন্টার শরীরের নিয়ে জীবন যাপনকারী এই নারী নেত্রী। তিনি বলেন, গ্রেনেড হামলার পর সুস্থ হয়েও অনেক রাতে দুঃস্বপে জেগে গেছি। ভয়ে অনেক দিন একা ঘুমাতে পারতাম না। ওই দিনের ঘটনা মনে পড়লে এখনও মাঝে মাঝে বুক কেঁপে ওঠে।
জনকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি উত্তম চক্রবর্তী সেদিন গিয়েছিলেন ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের সেই সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ ও মিছিলের খবর সংগ্রহ করতে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ প্রাঙ্গণে জায়গা না থাকায় তিনিসহ অন্য সাংবাদিকেরা আশ্রয় নিয়েছিলেন উল্টো দিকের রমনা ভবনের প্রধান গেটের সিঁড়িতে। ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা করে উত্তম চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আপার (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার) বক্তব্য শেষ হওয়ার পর আমরা আওয়ামী লীগের মিছিল অনুসরণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ বিকট আওয়াজ। প্রথমে কিছু বুঝে ওঠার আগে চারিদিকে ধোঁয়া দেখে মনে করি এটা বোমা হবে। চিন্তা করতে না করতে মুহূর্তেই বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। তখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। অনেকেই ভয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করলো। আমাদের সাংবাদিকদেরও কেউ কেউ দৌড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেল। আমার চোখ ছিল মঞ্চের দিকে। আবছা আবছা দেখতে পেলাম শেখ হাসিনাকে অনেকে ঘিরে রেখেছে। পরে তাকে দ্রুত গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ সময় গুলির আওয়াজও পাই। হুড়োহুড়িতে আমিও পড়ে গেলাম। আবার উঠে দাঁড়ালাম। সামনে গিয়ে দেখি লাশ আর লাশ। বিভৎস দৃশ্য। এটা বর্ণনা করা যাবে না। দুই যুগের সাংবাদিক জীবনে এই রকম নৃশংসতা এর আগে কখনও দেখিনি। আমার সব চেনা জানা মানুষ একজনের ওপর আরেকজন পড়ে আছে। কেউ কেউ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। কেউ কেউ ছিল নির্বাক। আমাদের প্রিয় আদা চাচা যিনি ওইদিনও আমাদের আদা খাইয়েছিলেন, দেখলাম পড়ে আছেন। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছেন। তাকে আমরা তুললাম। কিন্তু তাকে বাঁচানো গেল না। এ সময় পুলিশ চারিদিক থেকে লাঠিচার্জ করছিল। টিয়ারশেল মারছিল। এতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। আমরা অন্য আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে মিশে আহত অনেককে গাড়িতে বা রিকশাভ্যান যা পাই তাতে তুলে দিচ্ছিলাম হাসপাতালে নেওয়ার জন্য। এ সময় রিকশাভ্যানও ঠিকমত পাওয়া যাচ্ছিল না।
সরকারের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হারুন অর রশিদ তুলে ধরলেন সেই দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি হাসপাতালের বিভৎস দৃশ্য। তিনি বলেন, কর্মসূচিতে যোগ দিতে আমার একটু দেরি হয়ে যায়। সচিবালয় রাস্তা হয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দিকে যেতে যেতে কয়েক দফা বোমার আওয়াজ পাই। জিরো পয়েন্টে গিয়ে দেখি নেত্রীকে নিয়ে সুধাসদনের দিকে চলে যাচ্ছে। নেত্রীর গাড়ি চলে যাওয়ার পরপরই পুলিশ ব্যাপকহারে লাঠিচার্জ করছিল। আমাদের সামনের দিতে যেতে দিল না। পরে চিন্তা করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে গেলাম। গিয়ে দেখি বিভৎস অবস্থা। ফ্লোরে অনেককে ফেলে রাখা হয়েছে। কাতরাইতেছে তারা। এখানে আমরা যারা সুস্থ ছিলাম সাধ্যমতো আহতদের সেবা করার চেষ্টা করলাম। পরে গ্রিন রোডের আরেকটি হাসপাতালে গেলাম যেখানেও অনেক আহত ছিল। ওই হাসপাতালে আহতদের তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থা সীমিত থাকায় আমরা দুই-একজনকে ধরে ভ্যানে করে আশপাশের অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। আহতের রক্তের জন্য সম্ভাব্য সব জায়গায় যোগাযোগ করি। যতদূর সম্ভব সাহায্য সহযোগিতা করে ওইদিন রাত ৪টার দিকে বাসায় ফিরি।
/এমএনএইচ/আপ-এআরএল/
আরও পড়ুন:







