‘সব শেষ করেছি, কিছু আর বাকি নাই’

জাকিয়া আহমেদ
২২ আগস্ট ২০১৬, ০৭:৪৩ আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৬, ০৭:৪৩

‘রাস্তার ধারে বসে জুতা সেলাইয়ের কাজ করি। জমি-জমা যা ছিল সব শেষ করেছি, এখন আর কিছুই বাকি নাই! কেমন করে এই ছেলের চিকিৎসা করাবো আমরা, সেটা কেবল ভগবানই জানেন!’ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের পঞ্চমতলায় অবস্থিত শিশু ওয়ার্ডে ছেলের পাশে বসে এ সব কথা বলছিলেন আর কাঁদছিলেন মহেন্দ্র রায়। ঢামেক-বার্ন-ইউনিটে- শিশু-রিপন

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ থেকে আট বছরের ছেলে রিপনকে নিয়ে ২১ আগস্ট সকালেই ঢাকায় এসেছেন বাবা মহেন্দ্র রায় ও মা গোলাপী রানী। ‘জীবনে এই প্রথম ঢাকায়   আসা ছেলেটার চিকিৎসার জন্য’ বলেই কাঁদতে থাকেন মহেন্দ্র রায়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দেখা যায়, আট বছরের রিপনের দুই হাত ও দুই পায়ে গাছের শেকড়ের মতো হয়েছে; যা ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজানদারের বেলাতেও দেখা গেছে। শিশুটিকে এরই মধ্যে ‘শিশু বৃক্ষ-মানব’ বলেও ডাকতে শুরু করেছেন হাসপাতালের অনেক রোগী ও তাদের স্বজনেরা। তবে রিপনকে এ নামে না ডাকতেই অনুরোধ করেন বার্ন ইউনিটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক।

রিপনের মা গোলাপী রানী জানান, জন্মের তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই রিপনের হাতে-পায়ে ঘামাচির মতো উঠতে থাকে। পরে সেগুলো বড় ও মোটা হয়ে ফেটে যায়। পরে দেখি, তার নখ কাটা যায় না। নখ কাটতে গেলেই ব্যথা পায় রিপন। রক্ত বের হয়। তখন থেকেই নখ কাটা বন্ধ করে দিয়েছি।

এরপর ধীরে ধীরে রিপনের হাতে-পায়ে গাছের শেকড়ের মতো অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড ওঠে, যা দেখতে গাছের শেকড়ের মতোই। তখন থেকে জীবনে যা আয় ছিল, তা দিয়ে চিকিৎসা শুরু করি ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও রংপুরে। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করানোর পরেও দেখি, ছেলে আমার সুস্থ হয় না। তারপর এলাকাবাসীর কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে আবার চিকিৎসা শুরু করি। এরপরও রিপনকে সুস্থ করতে পারিনি। চিকিৎসা বন্ধ করে দিই। কারণ, আর কেউ ছিল না আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার। ‘সব শেষ করেছি, কিছু আর বাকি নাই’

মহেন্দ্র রায় জানান, এরপর একজন সাংবাদিক আমার সন্ধান পান। তিনি আমাকে নিয়ে যান ঠাকুরগাঁওয়ের হাসপাতালে সিভিল সার্জনের কাছে। সিভিল সার্জন আমাকে ডিসি সাহেবের কাছে পাঠান। তিনি আমাকে সাহস দেন। ডিসি সাহেব বলেন, তুমি চিন্তা করো না। আমরা চেষ্টা করে দেখবো কতদূর কী করতে পারি। তখন ডিসি সাহেবকে বললাম, বাবা, আমার তো কেউ নাই। হাতে করি, পেটে খাই। আপনাদের সহযোগিতায় যদি ছেলেটাকে সুস্থ করতে পারি, সেটাই আমার ভরসা। দেশের সবার ও সরকারের কাছেও সেই আশা রইলো। সবার সহযোগিতায় যদি আমার ছেলেটাকে সুস্থ করতে পারি, তাহলে আমাদের আর কিছু লাগবে না।

বার্ন ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক আমাকে একটি চিঠি দিয়ে ছেলেটিকে পাঠিয়েছেন। শিশুটিকে দেখেই মনে হচ্ছে, সে অপুষ্টিতে ভুগছে। তার খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হয়নি। রক্তশূন্যতায় ভুগছে সে। মনে হচ্ছে, চর্মরোগ ক্যারাটোসিসে ভুগছে সে। যত তাড়াতাড়ি পারি, তার চিকিৎসা শুরু করবো আমরা। আজ সকালে তারা  এসেছে মাত্র। আগামীকাল সকালে ওর চিকিৎসার জন্য একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হবে। তারপর নানান রকমের পরীক্ষাও করতে হবে। সবকিছু হয়ে গেলে শেষে চিকিৎসা শুরু হবে। এরপরে অপারেশন করবো আমরা।

এর আগে ‘বৃক্ষ মানব’ নামে পরিচিতি পাওয়া আবুল বাজানদারও একই রকম অসুস্থতা নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন। তার নয়টি অপারেশন করতে হয়েছে। তার দু’হাত এখন শেকড়মুক্ত। আবুল বাজানদারের অসুস্থতার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় সেই একই মেডিক্যাল বোর্ড রিপনের চিকিৎসাতেও কাজ করবে বলে জানান সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, শিশুটি আজ সকালে মাত্র এসেছে। সব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত নিয়ে খুব শিগগিরই তার চিকিৎসা শুরু করতে পারবো বলে আশা করছি।

ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা মনে করছি, রিপনের অসুখটাও বাজানদারের মতো একই অসুখ। তারটাও বাজানদারের মতো বড় পর্যায়ে যেতো যদি-না এখন ধরা পড়তো।

মা গোলাপী রানী বলেন, রিপনের দু’হাতে শেকড়ের মতো গজায়। ফলে, সে নিজের হাতে কখনোই খেতে পারেনি। বড় দুই মেয়ে, ওর বাবা এবং আমি তাকে খাইয়ে দিয়েছি। কখনও কখনও রিপন নিজেই চামচ দিয়ে খেয়েছে।

গোলাপী রানী বলেন, তার তিন সন্তান। দুই মেয়ের পর এই ছেলে। বড় দুই মেয়ের কারও হাতে-পায়ে এমন কিছু নেই। ছেলেটার এমন কেন হলো, সেটাই ভগবানের কাছে প্রশ্ন।

রিপনের চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করবে কিনা জানতে চাইলে ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, অবশ্যই সরকার বহন করবে। আর এটা সরকারি হাসপাতাল। তারপর রিপন বিরল রোগে ভুগছে। আবুল বাজানদারের চিকিৎসা খরচসহ খাওয়া-দাওয়া সব কিছু সরকার দিচ্ছে। এই ছেলেটির বেলাতেও তেমনটা হবে বলেই আমার বিশ্বাস। ছেলেটি যখন এসেছে এখানে, তখন সরকারের দায়িত্ব এর সমস্ত খরচ মেটানো।

রিপনের কতগুলো অপারেশন করা লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন জানতে চাইলে ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, যেহেতু ছেলেটি ছোট এবং অল্পতেই সে এই হাসপাতালে এসেছে, তাই মনে হয় আবুল বাজানদারের মতো ৯/১০টা অপারেশন করতে হবে না। আর তার আঙুলগুলো এখনও দেখা যাচ্ছে। আবুল বাজানদারের এটি ছিল না। তাই, রিপনের চিকিৎসা একটু সহজ হবে আমাদের জন্য এবং নিরাময় করা যাবে বলে বিশ্বাস।

 আরও পড়ুন: রামপাল ইস্যুতে সংবাদ সম্মেলন করবেন খালেদা জিয়া

/জেএ/এবি/এমএসএম/ আপ-এআর/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধ থেকে সংঘর্ষ , টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ
বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধ থেকে সংঘর্ষ , টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ
প্রাথমিক শিক্ষার নতুন কারিকুলামে পরিবর্তন আসছে
প্রাথমিক শিক্ষার নতুন কারিকুলামে পরিবর্তন আসছে
আন্দোলন-উত্তেজনা পেরিয়ে কর্মচঞ্চল সাভার-আশুলিয়া
আন্দোলন-উত্তেজনা পেরিয়ে কর্মচঞ্চল সাভার-আশুলিয়া
‘আমরা সবজির ওপরই নির্ভরশীল, মাছ-মাংস জোটে কালেভদ্রে’
‘আমরা সবজির ওপরই নির্ভরশীল, মাছ-মাংস জোটে কালেভদ্রে’
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে: বিজেপি এমপি নিশিকান্ত
চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে: বিজেপি এমপি নিশিকান্ত
আ.লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ওসিসহ ৬ সদস্য আহত
আ.লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ওসিসহ ৬ সদস্য আহত
পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ১৫ টাকা
পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ১৫ টাকা
সুন্দরবনের জলদস্যু জোনাব বাহিনীর প্রধানকে যেভাবে গ্রেফতার করলো এসআরবি
সুন্দরবনের জলদস্যু জোনাব বাহিনীর প্রধানকে যেভাবে গ্রেফতার করলো এসআরবি
বিমানযাত্রীর ব্যাগে ১৩০০ গৌরী ক্রিম, পাকিস্তান থেকে দুবাই হয়ে এলো বাংলাদেশে
বিমানযাত্রীর ব্যাগে ১৩০০ গৌরী ক্রিম, পাকিস্তান থেকে দুবাই হয়ে এলো বাংলাদেশে