ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের অভিমত: সেদেশে অরণ্যের এত কাছে কিছুতেই অনুমতি পেতো না রামপালের মতো প্রকল্প

রঞ্জন বসু, দিল্লি
২২ আগস্ট ২০১৬, ১৬:১০আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৬, ১৮:০৪

ড. কল্যাণ রুদ্র ও গৌরী মাওলেখি

বাংলাদেশে সুন্দরবনের এত কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্তে অনেক ভারতীয় বিশেষজ্ঞই রীতিমতো অবাক হয়েছেন। তারা সবাই প্রায় একবাক্যে বলেছেন, ভারতে হলে সংরক্ষিত অরণ্যের এত কাছে এমন একটি প্ল্যান্ট কিছুতেই অনুমতি পেতো না এবং এতে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী, বনভূমি ও নদনদীর বিপন্ন হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থেকেই যেতো।

রামপালে বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার করপোরেশন লিমিটেডের উদ্যোগে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে যখন বাংলাদেশে প্রতিবাদ তুঙ্গে উঠছে, তখন ভারতেও একাধিক পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউন বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে। এ ব্যাপারে দু’দেশের সরকারের অবস্থান যাই হোক না কেন, এই বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত রায় হলো, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সুন্দরবনের জন্য একটা বড়সড় ঝুঁকি কিন্তু রয়েই যাবে।

এদেরই একজন হলেন পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রধান ড. কল্যাণ রুদ্র। বিশিষ্ট এই পরিবেশবিদ ও নদীবিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বা ভারতের কোথাও সংরক্ষিত অরণ্যের এত কাছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার কোনও নজির নেই। ভারতে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ীই এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ‘রেড ক্যাটাগরি ইন্ডাস্ট্রি’-র গোত্রে পড়ে; অর্থাৎ এই শিল্প পরিবেশের জন্য অতি বিপজ্জনক, এটা ‘এফ্লুয়েন্ট’ ও ‘এমিশন’ দুটোই করে। সেখানে কোনও অভয়ারণ্যের খুব কাছে এ ধরনের প্ল্যান্ট স্থাপনের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।’’

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, শুধু সুন্দরবনই নয়, ভারতে কিন্তু ওড়িশার ‘ভিতরকণিকা’, অন্ধ্রের ‘কৃষ্ণা-গোদাবরী মোহনা’, তামিলনাড়ুর ‘পিচাভরম’সহ অনেক ম্যানগ্রোভ অরণ্যই আছে। এর কোনোটির ধারেকাছেও কখনও কোনও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ভারতে সর্ববৃহৎ তাপবিদ্যুৎ সংস্থা এনটিপিসি দেশের মাটিতে যেখানে কোনও ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের কাছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেনি, সেখানে সেই একই কাজ তারা কেন বাংলাদেশে গিয়ে করছে, সে বিষয়টা ভারতের অনেক বিশেষজ্ঞকেই বিস্মিত করেছে।

নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প

 

ড. কল্যাণ রুদ্র সতর্ক করে দিয়েছেন আরও একটি বিষয়ে। সেটি হলো, নদীর পানির দূষণ। তিনি বলেন, ‘‘বছর দুয়েক আগে পশ্চিমবঙ্গের বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জমা হওয়া ছাই বর্ষার জলে ‘অ্যাশ পন্ড’ থেকে উপচে পড়েছিল কাছেই চন্দ্রভাগা বলে একটি নদীতে। ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে তখন সেই নদীতে পরীক্ষা চালিয়ে দেখতে পাই, দূষণের মাত্রা এতটাই যে, চন্দ্রভাগা নদীতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কোনও বায়োডাইভার্সিটির অস্তিত্ব নেই! অর্থাৎ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য ছাই সেই নদীতে সব মাছ-পোকামাকড়-অ্যালগি-কাঁকড়া পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলেছে।’’

রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি কয়লা আসবে এবং বর্জ্য নিয়ে যাওয়া হবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদী দিয়ে। এই নদীর জীববৈচিত্র্য অসাধারণ। বিভিন্ন ধরনের মাছ ছাড়াও সেখানে গাঙ্গেয় ডলফিন বা বিপন্ন প্রজাতির শুশুকেরও বসবাস। ফলে, সেই নদীপথকে যেহেতু কয়লা ও ছাই পরিবহনে ব্যবহার করা হবে, তাই পশুর নদীতে দূষণের সম্ভাবনা কিন্তু কিছুতেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জের সুন্দরবনের গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে সেটা ভেবেও ভারতের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা চিন্তিত। ভারতে বন্যপ্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করে যে সব সংস্থা, সেসবের মধ্যে অন্যতম ‘পিপল ফর অ্যানিম্যালস’ সংস্থার ট্রাস্টি ও বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ গৌরী মাওলেখি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকাণ্ড সুন্দরবনে বাঘের ন্যাচারাল হ্যাবিট্যাটকে (প্রাকৃতিক আবাসস্থল) নষ্ট করবে তাতে প্রায় কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, এই ধরনের প্ল্যান্টের এত কাছে দূষণ ঠেকানো প্রায় এক রকম অসম্ভব।

সুন্দরবন

 

গৌরী মাওলেখি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বছর কয়েক আগে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে যখন ‘কালাগড় ড্যাম’ তৈরি করা হয়, তখন করবেট ন্যাশনাল পার্কের অনেক বাঘকে ভিটেছাড়া হতে হয়েছিল। তাও সেটা ছিল একটা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেখানে দূষণের পরিমাণ অনেক কম। আমার আশঙ্কা, সুন্দরবনের এত কাছে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প হলে অনেক রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য সেটা বিপদ সংকেত বয়ে আনবে।’’

মাওলেখি আরও বলেন, ‘‘আসলে রামপাল নিয়ে একটা সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কারণ হলো, সেখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে কয়লা, যার দূষণ ঘটানোর ক্ষমতা মারাত্মক। সারা পৃথিবীতে যখন কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তীব্র হচ্ছে, তখন এই ২০১৬ সালে এসে বাংলাদেশ কী করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লাকে বেছে নিচ্ছে, তাও আবার সুন্দরবনের এত কাছে, সেটাই ভারতের বহু পরিবেশবিদ বা অ্যাক্টিভিস্টকে বিস্মিত করেছে।’’

আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রিনপিসে’র সঙ্গে বহুদিন যুক্ত ছিলেন কে সি আয়াপ্পা। কয়লা-দূষণের প্রভাব নিয়েও দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন তিনি। সেই কে সি আয়াপ্পা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সুন্দরবন এমনিতেই অত্যন্ত ভালনারেবল (স্পর্শকাতর) একটা টেরেইন (বিপদপ্রবণ প্রকৃতি), সেখানকার এত কাছে কয়লা দিয়ে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, সেটা ভেবে আমি রীতিমতো শিউরে উঠছি!’

কথা প্রসঙ্গে কে সি আয়াপ্পা আরও বলেন, ‘‘অনেকে বলেন উইন্ড টার্বাইন (যার সাহায্যে ক্লিন বা দূষণমুক্ত বায়ুশক্তি তৈরি করা যায়) পর্যন্ত পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ, টার্বাইনের আঘাতে অনেক পাখি মারা যায়। কিন্তু একের পর এক গবেষণা প্রমাণ করে দিয়েছে, আজও উইন্ড টার্বাইনের তুলনায় অনেক বেশি পাখি মারা পড়ে কয়লা-ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে। ফলে, বন্যপ্রাণীর জন্য ঝুঁকির বিচারে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রই নিঃসন্দেহে এক নম্বরে!’’

তবে রামপাল নিয়ে ভারতে এই বিশেষজ্ঞরা যতই উদ্বিগ্ন হন না কেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাতা সংস্থা এনটিপিসি দাবি করছে, তাদের এই প্রকল্পে সুন্দরবনের কোনও ক্ষতি প্রায় হবে না বললেই চলে।

এনটিপিসি-র এক মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কোনও সাক্ষাৎকার দিতে রাজি নন। কিন্তু তিনি বলেন, রামপাল প্রকল্পের ‘এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট রিপোর্ট’ দেখলেই বোঝা যাবে, তারা পরিবেশ বাঁচানোর জন্য কী ধরনের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আধুনিক ব্যবস্থা নিয়ে এগুচ্ছেন।   

/এবি/

আরও পড়ুন: মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনককে নিয়ে কটূক্তি করলে যাবজ্জীবন

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম