হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতি জানিয়ে পুলিশ সদর দফতরে একটি বিশেষ ফ্যাক্স বার্তা দিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মিজানুর রহমান। ওই ফ্যাক্স বার্তায় হামলার সূত্রপাত, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, পুলিশের পদক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে। এদিকে যে ছবিটি নিয়ে গুজব হয়েছে, সেটিও তদন্ত করে দেখছে, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
সোমবার পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো ওই ফ্যাক্স বার্তায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার জানান, ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্টের প্রতিবাদে সমাবেশকালীন মন্দির ও বাড়িঘর ভাঙচুর চলাকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও ছয়জনকে আটক করা হয়েছে।
ওই বার্তায় এসপি জানান, গত ২৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাস (৩০) ফেসবুকে তার নিজের আইডিতে একটি আপত্তিকর পোস্ট দেয়। ওই ঘটনায় নাসিরনগর থানায় তথ্য প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মূলহোতা রসরাজ দাসকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও জানান, ৩০ অক্টোবর সকাল ১০ টায় থেকে আড়াইটা পযন্ত নাসিরনগর ও পার্শ্ববর্তী সরাইল থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে আহলে সুন্নাতুল জামায়াত, বাংলাদেশি ইসলামী ফ্রন্ট এবং গাউছিয়া যুব সংগঠনসহ আনুমানিক আড়াই থেকে তিনহাজার সর্বদলীয় মুসলিম জনতা নারিসনগর কলেজ মোড়ে সমাবেশ করে। অপরদিকে নাসিরনগর আশুতোষ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আনুমানিক একহাজার থেকে ১২শ’ উশৃঙ্খল জনতা নসিরনগর সদর এলাকায় দুপুর ১২টার থেকে ১টা পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে গৌরমন্দির, ঘোষপাড়ার মন্টু ঘোষের দুর্গামন্দির, জগন্নাথ মন্দির, কাশিপাড়া কালিমন্দির, দত্তবাড়ির দুর্গামন্দিরে গুপ্ত হামলা চালিয়ে প্রতিমা এবং মন্দিরের দরজা জানালা ভাঙচুর করে। প্রায় ২০টি বসতঘর, ভাঙচুর করে। প্রায় ১২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। হামলার সময় জনগণের ও মন্দিরের নিরাপত্তায় ৪০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি করা হয়েছে। ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নারিসরনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও জনমনে আতঙ্ক রয়েছে।
এদিকে, যে ছবিটি নিয়ে এই ঘটনার সূত্রপাত সেটিও তদন্ত করে দেখছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার ক্রাইম। সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং করি, এই বিষয়টিও করব। কেন কিভাবে এই ঘটনা ঘটলো তা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাচ্ছি।’
মাঠে নেমেছে তদন্ত কমিটি
এদিকে, জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গঠন করা তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি এরই মধ্যে ঘটনার তদন্তে মাঠে নেমেছে। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ ইকবাল হোসাইন জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার নেপথ্যের কারণ অনুন্ধানে মাঠে নেমেছে পুলিশের একাধিক টিম। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য থেকে জানা যায়, শুক্রবার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের এক যুবক ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করে, যে ছবিতে মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনার পর স্থানীয়রা গতকাল ওই যুবককে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে রবিবার সকাল থেকে নাসিরনগর উপজেলা সদরের কলেজ মোড় এবং খেলার মাঠে একাধিক ইসলামি দলের নেতারা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে।
সমাবেশ চলাকালে হঠাৎ তিন থেকে ৪শ’ লোক সংঘবদ্ধ হয়ে এ ঘটনার জন্য হিন্দু পরিবারগুলোর ওপর চড়াও হয়। এসময় পুরো উপজেলা সদরের হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার এবং তাদের মন্দিরের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় তারা।
অভিযোগ রয়েছে, তাদের থামাতে পুলিশ, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। পরে রাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কাজল দত্ত এবং নির্মল চৌধুরী বাদি হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। এসব মামলায় অজ্ঞাত ১২শ’ জনকে আসামি করা হয়েছে।
/এআরআর/এমও/








