এ বছর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২৪ লাখ ১২ হাজার ৭৭৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে আগের বছরের অকৃতকার্য এক লাখ ৬ হাজার ৫৫০ জন শিক্ষার্থীও রয়েছে । সেই হিসেবে ২০১৩ সালের উত্তীর্ণদের ২৩ লাখ ৬ হাজার ২২৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ।
২০১৩ সালে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২৯ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ জন শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থীরাই এ বছর জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এসব শিক্ষার্থী এবং ২০১৩ সালে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনীতে অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থীর তুলনামূলক চিত্রে দেখা যাচ্ছে- বিগত তিন বছরে বিদ্যালয় থেকে হারিয়ে গেছে ছয় লাখ ৪৩ হাজার ৯৬৮ জন শিক্ষার্থী।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, মঙ্গলবার (১ নভেম্বর) থেকে শুরু হওয়া জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২৪ লাখ ১২ হাজার ৭৭৫ জন শিক্ষার্থী। এরমধ্যে গত বছরের অকৃতকার্য ৯১ হাজার ৮৬১ জন শিক্ষার্থীও রয়েছে ।
প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ২০১৩ সালে মোট ২৯ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে প্রাথমিকে ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৬ জন। এর বাইরে ইংরেজি ভার্সনে অংশ নেয় ৬ হাজার ৪৫৭ জন।
সবার জন্য অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ২০০৯ সাল থেকে সমন্বিত এই সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়। আর এবতেদায়ীতে এ পরীক্ষা শুরু হয় ২০১০ সালে। জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা শুরু হয় সপ্তম বার ২০১০ সাল থেকে। এর পরেও প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।
গত তিন বছরের ব্যবধানে একটি ব্যাচের অনুপস্থিত এসব শিক্ষার্থীর প্রায় সবই ঝরে পড়েছে নানা কারণে। প্রধান কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টারা বলছেন, অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক না করায় অষ্টম শ্রেণিতে যাওয়ার আগেই ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এছাড়া, অসচেতনার জন্য বাল্য বিয়ে, দারিদ্র্য, নদীভাঙন, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতাও রয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রতিবেদন অনযায়ী ঝরে পড়ার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি ।’
ঝরে পড়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ টানপোড়েনের সংসারে ছেলেদের পাঠানো হচ্ছে কাজে। আর নিরাপত্তার কারণে মেয়েদের আগেই স্কুল থেকে সরিয়ে নিয়ে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতির আমুল পরিবর্তন করতে হলে নয় ক্লাস পর্যন্ত অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করতে হবে শিক্ষাকে। আর তা দ্রুত সম্ভব না হলে ঝরে পড়া কমিয়ে আনতে, নানার পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকেই। বন্ধ করতে হবে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ।’
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ভর্তির হার আশাব্যঞ্জক। তবে ঝরে পড়া রোধ করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার বাণিজ্যকরণ বন্ধ করে এখনই ঝরে পড়া কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাধ্যমিকে ভর্তির পর অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে স্বচ্ছলতা আনতে অভিভাবকরা স্কুল থেকে বাচ্চাদের সরিয়ে নিচ্ছেন। সে কারণেই বাণিজ্যকরণ বন্ধ করতে হবে। অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করতে হবে নয় ক্লাস পর্যন্ত।’
রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, ‘প্রতিবছর অকৃতকার্য শিক্ষার্থী পরবর্তীতে উত্তীর্ণ হচ্ছে। তবে প্রাথমিক সমাপনীতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার যে তফাৎ, তা আসলে ঝরে পড়ার চিত্রই। ভিন্নভাবে দেখার অবকাশ নেই। ’
মাঠ পর্যায়ে কর্মরত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (বর্তমানে অধিদফতরে কর্মরত) জিন্নাত আলী বিশ্বাস ঝরে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে। দুই বছর আগে ২৮ শতাংশ ছিল। যা বর্তমানে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে।’
পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঝরে পড়ার বর্তমান অবস্থার জন্য মাধ্যমিক শিক্ষার হারকে দায়ী করে তিনি।
প্রাথমিকে ঝরে পড়া রোধ করতে সরকার শতভাগ বৃত্তি ও স্কুল ফিডিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সে কারণেই ঝরে পড়ার হার কমেছে কমছে। মাধ্যমিকে বিকল্প কোনও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত মনে করেন জিন্নাত আলী । রাজশাহীর বাঘা উপজেলা ফতেপুর বাউসা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশীদ বলেন, ‘অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করলে ঝরে পড়া রোধ করা সম্ভব হবে। তবে এর আগে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে।’ আগের চেয়ে ঝরে পড়া কমে আসছে বলেও জানান তিনি।
এসএমএ/ এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা: প্রথম দিনে অনুপস্থিত সাড়ে ৫৯ হাজার পরীক্ষার্থী







