এমবিবিএস, বিডিএস, নার্সিং, ফিজিওথেরাপি, ফার্মেসিসহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রায় সব বিষয়ই পড়ানো হয় প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে। বিশ্ববিদ্যালয়টি বলছে, এখান থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোর্সগুলো সম্পন্ন করলে পাওয়া যাবে বেসরকারি সনদ। সরকারি চাকরি না পাওয়া গেলেও নামের সঙ্গে ডাক্তার লেখা যাবে, চেম্বারে প্র্যাকটিস করা যাবে, ক্লিনিকও দেওয়া যাবে। তাদের দাবি, তারা বৈধ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ‘বেসরকারিভাবে’ ডাক্তার গড়ে জনসেবা করছেন। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে স্রেফ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। এমনকি যে কাউন্সিলের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে, আদতে সেই নামে স্বীকৃত কোনও কাউন্সিলেরই অস্তিত্ব নেই।
ঢাকার মালিবাগ মোড়ের প্যারামাউন্ট টাওয়ারে অবস্থিত প্রিমিয়ার ইউনির্ভাসিটি অব টেকনোলজি। এখানেই পড়ানো হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রায় সব বিষয়। প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে কথা হয় সহকারী পরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ বৈধ প্রতিষ্ঠান। যদি কেউ মানুষের সেবা করতে চায় তাতে তো কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।’ আর প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য ড. শেখ গনির বক্তব্য, ‘টাকা দিলেই এখান থেকে ডাক্তারি পড়া যাবে।’ সময়মতো টাকা দিলে ওয়ার্ডবয়, নার্স, পল্লী চিকিৎসকরাও চাইলে ডাক্তার হতে পারবেন বলে জানান তিনি।
হাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘যেকোনও বয়সের যে কেউ চিকিৎসক হতে চাইলে এখানে ভর্তি হতে পারে। কে কোন বিষয়ে পড়ালেখা করেছে বা কী ডিগ্রি নিয়েছে, তাতে কিছু যায় আসে না। এই সুবিধা বাংলাদেশে কেবল আমরাই দিয়ে থাকি।’ এভাবে যে কাউকে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ানো যায় না জানালে হাফিজুর পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘এখানে যারা আসেন তারা চিকিৎসক হয়ে মানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করার ব্রত নিয়েই আসেন। তাহলে অসুবিধা কোথায়?’
প্যারামাউন্ট টাওয়ারে প্রতিষ্ঠানটির অফিস মাত্র এক কক্ষের। হোসাফ টাওয়ারে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করানো হয় বলে দাবি করা হলেও সেই দাবির সতত্য খুঁজে পাননি এ প্রতিবেদক। ভর্তির আগে এখানকার শিক্ষকদের নামও প্রকাশ করা যাবে না বলে জানান হাফিজুর রহমান।
এখানকার শিক্ষার্থীরাও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এখানে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হই ২০০৪-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে। ২০০৯ সালে পড়ালেখা শেষ হয়েছে। এখনও আমি মার্কশিটসহ অনেক কাগজপত্র পাইনি।’
মুন্সিগঞ্জের আরেক শিক্ষার্থী নাম না জানিয়ে বলেন, ‘এরা কেবল টাকা কামানোর ধান্ধায় থাকে। এখানে লেখাপড়া করে কারও কোনও লাভ হচ্ছে না, বোকার মতো টাকা ঢেলেছি। ৮ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। সব টাকা জলে গেছে।’ এ প্রতিবেদকের সামনেই এক শিক্ষার্থী ভারতে আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। জবাবে হাফিজুর বলেন, ‘তুমিলাইন পাওনি। আমাদের স্যারের মাধ্যমে লাইন করতে হবে।’
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ কম্বাইন্ড মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিসিএমডিসি) অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির। অথচ বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) বলছে, বাংলাদেশে বিসিএমডিসি নামের কোনও স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানই নেই।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠান মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যারা এসব প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য তাদের। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক মহাসচিব ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই লাইসেন্স যারা দিয়েছেন তারা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ করেছেন। এমন চলতে থাকলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ধসে পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএমডিসির অনুমোদন ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠান এভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে না। তারা মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। বিএমডিসির সঙ্গে মিলিয়ে বিসিএমডিসি নাম নিয়ে তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।’
এ প্রতিবেদকের কাছে প্রিমিয়ার ইউনির্ভাসিটি অব টেকনোলজির ডাক্তার তৈরির তথ্য শুনে আঁতকে ওঠেন বিএমডিসির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বিসিএমডিসি নামের কোনও স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান মেডিক্যাল সেক্টরে নেই। এ বিষয়ে সরকার ও বিএমডিসির অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (চিকিৎসা শিক্ষা) অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু বিসিএমডিসি নামের কোনও প্রতিষ্ঠানের কথা আমার জানা নেই। এই নাম ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।’ সরকার দ্রুতই প্রিমিয়ার ইউনির্ভাসিটি অব টেকনোলজি ও বিসিএমডিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বলে জানান হাবিবুর রহমান।
আরও পড়ুন:
মোহাম্মদপুরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নব্য জেএমবির সামরিক কমান্ডার মারজান নিহত!
/জেএ/টিআর/আপ-বিটি/








