মিজারুল কায়েস ও তার কূটনৈতিক সাফল্য

শেখ শাহরিয়ার জামান
১১ মার্চ ২০১৭, ১৮:৩৪আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৭, ১৮:৪৪

মিজারুল কায়েস সাম্প্রতিক সময়ের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বেশকিছু সাফল্যের কৃতিত্বের দাবিদার সদ্যপ্রয়াত ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস। একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক হিসেবে তিনি দেশের জন্য বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জনে অবদান রেখেছেন।

পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে তিনি সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের কিছু সাফল্য লাভ করেন। ওই সময়েই সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ভারত ও মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যায় বাংলাদেশ। ২০১১ সালে যখন লিবিয়া থেকে প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত আনা হয়, তখনও তিনিই ছিলেন পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্বে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগও নেওয়া হয় তিনি পররাষ্ট্র সচিব থাকাকালেই। এছাড়া, গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মতবিরোধ বাড়লে মিজারুল কায়েসই তা সামাল দেন।

২০০৯ সালের জুলাই মাসে কায়েস পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। ওই সময়ই আন্তর্জাতিক সুমদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ভারত ও মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করে বাংলাদেশ। এর তিন মাস পরে অক্টোবরে মিয়ানমার ও ভারতের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। ওই সময় মিজারুল কায়েসই আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি মীমাংসা করার ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহের আনুষ্ঠানিক পত্র দুই রাষ্ট্রদূতের হাতে তুলে দেন।

এরপরের ইতিহাস সবার জানা। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তি হয়।

২০০৯ সালে মিজারুল কায়েস পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার সময়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে কাজ শুরু করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে এর নেতৃত্ব দেন কায়েস।

২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে হাসিনার ঐতিহাসিক ভারত সফরের সময় থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে এবং এর ধারাবাহিকতা এখনও বজায় আছে। মিজারুল কায়েসের আমলেই বাংলাদেশ ও ভারতের দু’টি শীর্ষ পর্যায়ের সফর হয়। ২০১০ সালে শেখ হাসিনার সফরের দেড় বছরের মাথায় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফর করেন।

গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্যোক্তা মোহাম্মাদ ইউনূস প্রসঙ্গে সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতবিরোধ তৈরি হলে সেটাও সামাল দিতে হয় মিজারুল কায়েসকেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকফা চুক্তি করার জন্য প্রধান আলোচনাকারী হিসেবেও তার ওপরই দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২০১২ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যে প্রথম রাজনৈতিক পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। মিজারুল কায়েসের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ওই উদ্যোগ এখন প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও সামরিক সংলাপের মতো অন্যান্য আনুষ্ঠানিক আলোচনাও তার সময়ে শুরু হয়। এসব আয়োজন এখন প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

২০১২ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় নিরাপত্তা সংলাপ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মিজারুল কায়েস বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মূল্যবোধ ও আকাঙ্ক্ষার মিল রয়েছে। তাই দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।’ পাশাপাশি, মার্কিন কর্মকর্তাদের সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, ‘এ ধরনের সম্পর্কে মতপার্থক্যের জন্যও জায়গা থাকতে হবে।’

ডিগ্রি পাস কোর্সে পরীক্ষা দিয়ে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন মিজারুল কায়েস। এরপর ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ডিগ্রি পরীক্ষা দেওয়ার সময়ে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু সেখানে পড়ালেখা শেষ করেননি তিনি। পরে হার্ভাড কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্ট থেকে তিনি পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

মিজারুল কায়েস যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া জেনেভা, টোকিও ও সিঙ্গাপুরেও কর্মরত ছিলেন তিনি। ২০১২ সালে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে সিঙ্গাপুরে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয় তাকে।

রবীন্দ্রপ্রেমী হিসেবে পরিচিত মিজারুল কায়েসের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল।

উল্লেখ্য, ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস শনিবার (১১ মার্চ) মারা যান। ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী

আরও পড়ুন-
সংসদে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার সচিত্র প্রতিবেদন

২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব সংসদে

/এমএ/টিআর/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
এই গ্রামে প্রাথমিক পার হলেই মেয়েদের বিয়ে হয়, বেশি গেলেই ‘কদর’ শেষ
এই গ্রামে প্রাথমিক পার হলেই মেয়েদের বিয়ে হয়, বেশি গেলেই ‘কদর’ শেষ
পুরোনো স্মার্টফোন বিক্রি করার আগে যে কাজগুলো অবশ্যই করবেন
পুরোনো স্মার্টফোন বিক্রি করার আগে যে কাজগুলো অবশ্যই করবেন
ঘরোয়া ক্রিকেটে এসজি বলের পথে বাংলাদেশ, কী সুবিধা তাতে? 
ঘরোয়া ক্রিকেটে এসজি বলের পথে বাংলাদেশ, কী সুবিধা তাতে? 
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে ‘তথ্য সংগ্রহকারী’ পদে আবেদনের সময় বেড়েছে 
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে ‘তথ্য সংগ্রহকারী’ পদে আবেদনের সময় বেড়েছে 
সর্বাধিক পঠিত
রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা হলে করণীয় কী জানালেন আইনমন্ত্রী 
রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা হলে করণীয় কী জানালেন আইনমন্ত্রী 
পদত্যাগ করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে যা বললেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী
পদত্যাগ করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে যা বললেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী
মোদির এক ভিডিও ভেঙে দিলো ইনস্টাগ্রামের সব রেকর্ড
মোদির এক ভিডিও ভেঙে দিলো ইনস্টাগ্রামের সব রেকর্ড
৩ নেতা একসাথে হলে এক সপ্তাহের মধ্যে এই সরকারের পতন: কর্নেল অলি আহমদ
৩ নেতা একসাথে হলে এক সপ্তাহের মধ্যে এই সরকারের পতন: কর্নেল অলি আহমদ
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত ২ কর্মকর্তাকে নিয়ে যা বললেন জয়সওয়াল
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত ২ কর্মকর্তাকে নিয়ে যা বললেন জয়সওয়াল