রাজধানীসহ সারা দেশে পুলিশের ৩২টি হাসপাতাল রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে এসব হাসপাতালে পুলিশ সদস্যরা জটিল কোনও রোগের চিকিৎসা পান না। এমনকি সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও তাদের ছুটতে হয় অন্য কোনও সরকারি হাসপাতালে। জনবল সংকট, যন্ত্রপাতির অভাব ও অনুন্নত অবকাঠামোসহ নানা সমস্যার কারণে পুলিশ হাসপাতালে মিলছে না মানসম্মত চিকিৎসা সেবা। এসব সমস্যা দূর করতে ইতোমধ্যে অন্তত ১৩টি হাসপাতালকে আধুনিকায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এমনকি ঢাকার কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নেই কোনও আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি। গত সোমবার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন কাউন্টারে পুলিশ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের লম্বা লাইন।কেউ লাইন দিয়ে ওষুধ নিচ্ছেন।কেউবা চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে প্রায় দুই লাখ পুলিশ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্য মিলিয়ে অন্তত ১০ লাখ মানুষের চিকিৎসার জন্য ৩২টি পুলিশ হাসপাতালই ভরসা।
ঢাকার কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালটি আড়াইশ শয্যার। এখানে নেই এমআরআই, সিটি স্ক্যান মেশিন। সেখানে হয় না দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। এ কারণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেতে হয় অন্য হাসপাতালে।
জানা গেছে,পুলিশ হাসপাতালগুলোর এই বেহাল অবস্থা দূর করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পুরনো ১৩টি পুলিশ হাসপাতাল আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।এতে জনবলও বাড়ানো হবে।
পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, সারাদেশে ১৩টি হাসপাতালকে আধুনিকায়ন করতে একনেকে একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে। প্রথমে আটটি ও পরবর্তীতে আরও পাঁচটি হাসপাতালকে দ্রুত আধুনিকায়ন করা হবে। এ কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮০ কোটি টাকা।
জেলা পুলিশ হাসপাতালগুলো প্রতিটি মাত্র ২০ শয্যার। অথচ একেকটি জেলায় কাজ করে কয়েক হাজার পুলিশ।এনিয়েও পুলিশের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
পুলিশ হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কিডনি রোগ, পেপটিক আলসার, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীর সংখ্যাই বেশি। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন যথাক্রমে ছয় জন ও নয় জন পুলিশ সদস্য। আরও পাঁচজন মারা গেছেন কিডনি রোগে, ক্যান্সারে ও হাইপারটেনশনে। এসব রোগের কোনোটারই চিকিৎসা হয় না পুলিশ হাসপাতালে।
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়নের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ডা. মো. এমদাদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘আমাদের জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সাধ্য অনুযায়ী আমরা চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে দূরারোগ্য রোগের চিকিৎসা এখানে দেওয়া যায় না। সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া হয়। জরুরি চিকিৎসারও ব্যবস্থাও করা হয়।’
কেন্দ্রীয় হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছরই কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৪ সালে এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮৬ জন রোগী। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার ১৭১ জনে। ২০১৬ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল সোয়া ৩ লাখ প্রায়।
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সূত্র মতে, পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৫৪ সালে রাজারবাগে পাঁচ একর জায়গায় স্থাপন করা হয় কেন্দ্রীয় হাসপাতাল। তৎকালীন পুলিশের জনবল সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে আড়াইশ শয্যার হাসপাতালটিতে ৪০ জন চিকিৎসকের একটি অর্গানোগ্রাম তৈরি করা হয়। এরপর একবার কেবল ১৯৮৫ সালে জনবল বৃদ্ধি করা হয়। ফের ৩২ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এসময় পুলিশের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে তাদের চিকিৎসক বাড়ছে না। বর্তমানে পুলিশের কেন্দ্রীয় হাসপাতালে ৫৫ জন চিকিৎসক ও ৩০ জন নার্স রয়েছে। তবে নেই আইসিইউ ও সিসিইউ। একারণে সংকটাপন্ন রোগীদের সেখানে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না। পুলিশ সদস্যরা এই অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন করে নতুন করে জনবল নিয়োগেরও দাবি করেছেন।
হাসপাতালে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানান,১৯৮৫ সালে কেবল এই হাসপাতালের ডাক্তারের পদ ৪০ জন থেকে বৃদ্ধি করে ৬০ জন করা হয়েছে। কিন্তু ৬০ জন চিকিৎসকের কোটা এখনও পূরণ করা যায়নি। বর্তমানে হাসপাতালটিতে কাজ করছেন ৫০ জন চিকিৎসক।চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় কেবলমাত্র সকালের শিফটে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সাতটি বিভাগীয় হাসপাতালকেও আধুনিক করার চেষ্টা করছি। তবে ধীরগতিতে হচ্ছে সব। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মাত্র ৩১/৩২ জন চিকিৎসক আছেন। তাদের মধ্যে প্রতিদিন চারজন চিকিৎসক আটশ থেকে এক হাজার রোগী দেখেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বহুদিন ধরে অর্গানোগ্রাম পরিবর্তনের কথা বলছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় তা করছে না।’
তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় হাসপাতালটিকে আমরা ২৫০ বেড থেকে ৫শ বেড করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এখানে আইসিউ, সিসিইউ, কিডনি ডায়লোসিস করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কার্ডিয়াক ক্লিনিক বড় করা ও ডেন্টাল বিভাগ সংযোজন করা হবে। আমরা এজন্য ডিপিপি প্রস্তুত করছি। একমাসের মধ্যে আমরা ডিপিপি করে মন্ত্রণালয় পাঠাবো।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘চিকিৎসকের পদ খালি আছে ৫৫০টি। কিন্তু নিয়োগ দিতে পারছি না। কারণ আমাদের নিয়োগ বিধিমালা নেই। নিয়োগ বিধিমালাটা হলে এসব সমস্যার সমাধান হতো।
এ বিষয়ে এআইজি (উন্নয়ন) গাজী মোজাম্মেল হক জানান, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ৩২ জন চিকিৎসকে প্রেষণে দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ করছেন। সকল হাসপাতালের উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া আছে। সরকারের পক্ষ থেকেও পুলিশ হাসপাতালগুলোকে উন্নত করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে অগ্রগতি হচ্ছে।
/এআরআর/ এপিএইচ/








