বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে উদযাপিত হলো পহেলা বৈশাখ। সর্বজনীন এই উৎসবে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ নির্মূলের প্রত্যয় ছিল সবার মধ্যে। বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ বরণ করে নিতে ঢাকাসহ দেশব্যাপী ছিল নানা আয়োজন। মঙ্গল শোভাযাত্রা, গান, নাচ, বৈশাখী মেলাসহ এসব অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন বিভিন্নান শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শুক্রবার সকালে গণভবনের সামনের মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নতুন বছরে দেশ আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। মানুষ বাস করবে আনন্দলোকে। দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকুক। দেশে শান্তি বিরাজ করুক, আজকের দিনে এটাই প্রত্যাশা করি।’
এ দিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এই বর্ণিল আয়োজন। এখানে মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে কোনও গোষ্ঠীর হুমকিতে বাঙালি দমে যাবে না।’
দিনভর প্রখর রোদের উত্তাপ থাকলেও ঘর থেকে বেরিয়ে গল্প-আড্ডা, সেলফি ও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেন নগরবাসী।
শুক্রবার সকাল থেকেই পথে নেমেছিল মানুষের ঢল। লাল-সাদা রঙের শাড়িতে সেজেছিলেন নারীরা। অনেকের হাতে আঁকা ছিল ‘স্বাগত ১৪২৪’, ‘শুভ নববর্ষ’। শিশু-কিশোরদের হাতে রেখেছিল নানান খেলনা।
রমনার বটমূলে শুক্রবার ভোর সাড়ে ছয়টায় ছিল ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী প্রভাতি গানের আসর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে সকালে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এছাড়া বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসি এলাকা, শিশুপার্কের নারকেল বীথি চত্বর, রমনা উদ্যান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর, ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চ, লেকের পাড়, ধানমন্ডি মাঠ, গুলশান মাঠ, পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বাহাদুর শাহ পার্কে ছিল নববর্ষের আয়োজন।
এবার পয়লা বৈশাখ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে হওয়ায় অনেকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যান প্রিয়জনদের সঙ্গে নববর্ষের আনন্দ-উৎসব উপভোগ করতে। পহেলা বৈশাখে দেশজুড়ে ছিল সাজ সাজ রব আর লাল-সাদা পোশাকের সমাহার। বেজেছে ঢোল, ডুগডুগি, পথে পথে ভেঁপু। সারাবাংলা ভেসেছে বিপুল উচ্ছ্বাসে। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিনিধিদের খবরে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে সর্বজনীন এ উৎসব। অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে বিভিন্ন জায়গায় নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি।
রাজশাহী প্রতিনিধির পাঠানো খবরে বলা হয়েছে, জেলায় বর্ণিল আয়োজনে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করা হয়। বিভিন্ন আয়োজনে নেচে-গেয়ে প্রাণের উৎসবে মেতে ওঠেন শহরবাসী। সর্বজনীন এই উৎসবে সবার মধ্যেই ছিল সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে রুখে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
বাংলা ট্রিবিউনের নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, উৎসব আর আনন্দ আয়োজনে পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিয়েছে জেলাবাসী। জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দফতর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করে নানান অনুষ্ঠানের। সকালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সদর উপজেলা মাঠে প্রভাতী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণ। দুপুর ১২টায় বের হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। এতে জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, পুলিশ সুপার আমেনা বেগমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
বাংলা ট্রিবিউনের মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বাংলা নববর্ষ বরণে উৎসবের নগরীতে পরিণত হয় মানিকগঞ্জ। পুরাতন গ্লানি মুছে ফেলে নতুনকে বরণ করে নিতেই উৎসবের আমেজ দেখা যায় চারদিকে। বাঙালির প্রাণের এই উৎসবে বর্ণিল সাজে অংশ নেন সববয়সী মানুষ। মানিকগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের।
নববর্ষ উপলক্ষে মানিকগঞ্জ পৌরসভার আয়োজনে এবারই প্রথম বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এতে মূল আকর্ষণ ছিল হাতির প্রতিকৃতি। এছাড়া বাঘ, পেঁচা, ময়ূর, হাতপাখা ও মুখোশের প্রতিকৃতিও রাখা হয়। সকালে পৌরসভার সামনে থেকে মেয়র গাজী কামরুল হুদা সেলিমের নেতৃত্বে বের হওয়া এই শোভাযাত্রা শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে নগর ভবনে এসে থামে। এরপর এখানে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের পান্তা ও বিভিন্ন রকমের ভর্তা দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়।
জামালপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে পহেলা বৈশাখ। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শহরের বৈশাখীমেলা মাঠে শুরু হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সাড়ে ৯টার দিকে এখান থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এতে নেতৃত্ব দেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম, সাবেক ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, জেলা প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ চৌধুরী, পৌর মেয়র মির্জা সাখাওয়াতুল আলম মনি। শোভাযাত্রায় উদীচী, মনিমেলা খেলাঘর ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও অংশ নেয়। পরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বাংলা ট্রিবিউনের বেনাপোল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বেনাপোল ও শার্শায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়েছে। বৈশাখের প্রথম প্রহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এতে শার্শার সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন ও বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটনের নেতৃত্বে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা অংশ নেন।
বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, পঞ্চগড়, শেরপুর, রাঙামাটি, খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের অন্যান্য জেলায়ও আনন্দ শোভাযাত্রাসহ নানান বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে পহেলা বৈশাখ। মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে সুর ওঠেছে, ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো...’।
/জেএইচ/এমএনএইচ/








