মানুষের ভিড়ের এই ছবি দেখে প্রথমেই মনে হতে পারে এটি কোনও স্টেডিয়ামের দৃশ্য। কিন্তু না, এটি কোনও খেলার মাঠের ছবি নয়। ঘরমুখো জনস্রোতের এই দৃশ্যটি বিমানবন্দর রেলস্টেশনের।
এদিকে বুধবার (৩১ আগস্ট) সকাল থেকেই রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন হাজার হাজার মানুষ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভিড়। সকাল থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনই ছিল লোকে লোকারণ্য।
যাত্রীদের কেউ ট্রেনে সিট পেয়ে বসে যাচ্ছেন। কেউ না পেয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। ভেতরে যাদের জায়গা হয়নি, তারা উঠে বসেছেন ট্রেনের ছাদে। সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেকেই প্রথমে রেলস্টেশনের ছাদের উঠে সেখান থেকে ট্রেনের ছাদে গিয়ে উপচেপড়া ভিড়ের মাঝেও নিজের জায়গাটুকু করে নিয়েছেন। এত মানুষের ভিড়ে তাদের বহনকারী বিশাল ট্রেনও প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে।
এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল ও সদরঘাটে লঞ্চ টার্মিনালেও ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।
বিকাল ৪টার ট্রেন ধরার জন্য সকাল থেকেই কমলাপুরে অপেক্ষা করেন ময়মনসিংহ-জামালপুরগামী যাত্রীরা। কেউবা অপেক্ষা করছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ট্রেনের জন্য। আবার কেউ উত্তরাঞ্চলের যাত্রী। পরিবার ও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ-আনন্দ উদযাপনে যেতে সবখানেই ছিল অপেক্ষার জনস্রোত। শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালগুলো।
ছাদে জায়গা পাওয়ার জন্যই তারা দাঁড়িয়েছিলেন। এটি ছিল ঈদযাত্রায় বুধবার (৩১ আগস্ট) শেষবেলার যাত্রীদের বাড়ির টানে ছুটে চলা।
তাদের সারিবদ্ধ অপেক্ষার দৃশ্যই বলে দিচ্ছে স্বজনের কাছে বাড়ি ফেরার আকুলতা। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কোনও কষ্ট থাকবে না, যদি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন তারা।
এ
মন একজন যাত্রী শামসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যেভাবেই যাই, নিরাপদে বাড়ি পৌঁছতে পারলেই কোনও বালাই নাই।
অনেকেই রাতের ট্রেনের যাত্রী হলেও ট্রেনের অপেক্ষায় দুপুর থেকেই বসে আছেন কমলাপুরে। আশ-পাশের ফাঁকা জায়গায় পরিবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন অনেকে। আবার কেউ ঘুমিয়ে পড়েছেন নিজের বহন করা ব্যাগের ওপর মাথা দিয়ে।
দেখা গেছে, বোন ঘুমিয়েছেন, তো ভাই লাগেজ পাহারা দিচ্ছেন । বাংলা ট্রিবিউনক শামসুর রহমান জানালেন, তারা যাবেন রাত ৮ টার ট্রেনে পার্বতীপুরে। পুরনো ঢাকার বাসা থেকে আসতেই তার বোন অসুস্থ হয়ে গেছেন। এখন ট্রেন আসার অপেক্ষায় আছেন। রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্মীদের বেশ তৎপর দেখা গেছে। তবে সেটি প্ল্যাট ফরমে প্রবেশ মুখের সামনেই বেশি। ট্রেনের ভেতরে টিকিটবিহীন যাত্রী খুঁজতে দেখা গেছে সাদা অ্যাপ্রন পড়া রেলওয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।
বিকাল সাড়ে চারটার দিকে হঠাৎ একজন যাত্রীকে দেখা গেল প্ল্যাটফরমের প্রবেশ মুখের সামনে রেলওয়ের একজন কর্মকর্তার পা জড়িয়ে ধরেছেন। আরেকজন যাত্রীকে আটকানোর নির্দেশ দিলেন সাদা অ্যাপ্রন পড়া রেলের ওই কর্মকর্তা।
তাদের হয়রানি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জামালপুরগামী যাত্রী শাকিল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কাউন্টারে টিকিট পাই নাই। তাই আনসার সদস্যের কথামতো ৫০ টাকা দিয়ে গেট পার হতেই ওই স্যার আটকে দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাদা অ্যাপ্রন পড়া ওই কর্মকর্তারা তাদের নাম পরিচয় জানাননি। তবে রকিবুল নামে একজন আনসার সদস্য বলেন, ‘সাদা অ্যাপ্রন পড়া ওই স্যারেরা যাদের কাছে টিকিট নাই, তাদের ধরে ধরে জরিমানা আদায় করেন। সবাইকে ধরেন না। নিরীহ যাত্রীরা বেশি ধরা পড়েন।’
হয়রানির শিকার কিশোর শাকিল বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, ‘আমি দিনাজপুরের বিরলে যাবো। আনসারের কথামতো ৫০ টাকা দেওয়ার পরপরই তারা আমাদের দু’জনকে ধরেছে।’
শাকিল আরও জানায়, ‘এখন ট্রেনও মিস করবো। তাই স্যারের পা ধরে ক্ষমা চেয়েছি।’ তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট সে। যাবে মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করতে। কিন্তু ধরা পড়ার পর অজানা আতঙ্ক কাজ করছিল বলে জানায় শাকিল। তার সঙ্গে ছিলেন সুমন। বয়স ২২। তিনিও বার বার রেল কর্মকর্তার পা জড়িয়ে ধরে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আকুতি করেন।
সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনি ঢাকার একটি মেকানিক ওয়ার্কশপের হেলপার। যাবেন জামালপুরে । কিন্তু তাকে ছাড়া হচ্ছে না।
এদিকে বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনের ৬ নম্বর প্ল্যাটফরমের ফ্লোরে অচেতন এক মহিলাকে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
আশপাশের যাত্রীরা তার সেবা করছিলেন। তার পরিচয় জানতে চাইলে একজন নারীযাত্রী জানান, তিনি দুপুর থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। যাওয়ার কথা ছিল জয়দেবপুরে। এরমধ্যে ওইপাশ থেকে তিনি কিছু খেয়ে এসে এখানে অচেতন হয়ে পড়ে যান। এই নারীর সঙ্গে আর কেউ আছেন কিনা তাও জানেন না আশপাশের মানুষেরা।
রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মাকছুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজকেই (বুধবার) সবচেয়ে ভিড় বেশি। এই সুযোগে নানা ধরনের প্রতারক সক্রিয় থাকে।’
তিনি বলেন, ‘গতকালও (৩০ আগস্ট) এক গ্রুপকে পিটিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ এসময় তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ওই অচেতন মহিলাকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য ওসি ইয়াসিনকে নির্দেশ দেন।
কেন ছাদে যাচ্ছেন এমন প্রশ্ন শুনে খুবই বিরক্ত হলেন জামালপুরগামী শাহিনুর। তিনি বলেন, ‘টিকিট না পাইলে কোথায় যাবো? ট্রেনের ছাদে জায়গা পাইছি তাইতো বেশি। এখন নিরাপদে পৌঁছাতে পারলে কোনও কষ্টই আর থাকবে না।’
আরও পড়ুন: দৌলতদিয়া ঘাটে ঘরমুখো মানুষের ঢল, সময় লাগলেও নেই জট








