প্রতিবছর রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় পৌনে ৫ লাখ পশু কোরবানি দেওয়া হয়। ঈদের আগে কোরবানির হাটে আসা এসব পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য ১৫ থেকে ২০ জন চিকিৎসকের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি দল গঠন করে দেয় সিটি করপোরেশন। কিন্তু কোরবানির হাটে আসা পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা টাকা ছাড়া মেলে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করছেন না দায়িত্বপ্রাপ্তরা। ফলে ৯৫ ভাগ পশুরই স্বাস্থ্যপরীক্ষা ছাড়া কোরবানি দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এ অবস্থায় কোরবানির হাটের ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, সিটি করপোরেশনের এ উদ্যোগ কি শুধুই লোক দেখানো?
দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবছর কোরবানির দিনসহ আগের চারদিন ও পরের দেই দিন মিলে মোট ছয় দিনের জন্য পশুর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যপরীক্ষার করতে রাজধানীর হাটগুলোয় ভ্রাম্যমাণ দল গঠন করে দেওয়া হয়। এ বছর রাজধানীর ২৩ হাটের জন্য দুই সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও নিরাপদ খাদ্য অধিদফতরের সমন্বয়ে ১৭টি চিকিৎসক টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমে ৪০ জনের মতো জনবল রয়েছে। কিন্তু ভেটেরিনারি ইনস্পেক্টর, ভেটেনারি সার্জন ও চিকিৎসক রয়েছেন ২৫ জনের মতো। সে হিসাবে প্রতিটি হাটের বিপরীতে একজন করে পশু চিকিৎসক রয়েছেন।
নিয়ম অনুযায়ী, টিমের সদস্যরা সার্বক্ষণিক হাটের পশুর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। পশুতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কোনও দিক রয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখবেন। কিন্তু হাটের লাখ লাখ পশুর জন্য এ কয়টি টিম কোনোভাবেই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন নগরবাসী। আর পশুর হাটে লাখো মানুষ ও পশুর ভিড়ের সঙ্গে এ টিমের সদস্যদের খুঁজে পাওয়াও যায় না। এছাড়া এই চিকিৎসকদের কাছ থেকে টাকা ছাড়া সেবা মেলেনা। এক্ষেত্রে পরীক্ষা ও ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়াই পশু কেনা হচ্ছে।
হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪ লাখ ৭৫ হাজারের মতো কোরবানির পশু জবাই হয়। স্বাভাবিক কারণেই কোরবানির হাটে ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষ থাকে মোটাতাজা ও সুন্দর পশু। কিন্তু তাদের ধর্মীয় এ অনুষঙ্গকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা লাভের আশায় অসদুপায়ে পশুকে মোটাতাজা করে তোলেন। এ জন্য তারা পশুকে স্টেরয়েড, কোর্টিসল, ডেক্রামিথাসন, হাইড্রোকর্টিসন, বিটামিথাসন ও প্রেডনিসোলনের মতো মারাত্মক ওষুধ ব্যবহার করেন। যদিও এ বছর দেশের কোথাও পশুকে এ জাতীয় ওষুধ খাওয়ানোর তেমন একটা খবর পাওয়া যায়নি। এরপরও কোনও পশু জবাই দেওয়ার আগে তার স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে নেওয়া আবশ্যক।
জানতে চাইলে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. এমদাদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে রাজধানীতে যে পরিমাণ পশু ওঠে, সব পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। যদিও জবাইয়ের আগে প্রতিটি পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। এ অবস্থায় আমাদের চোখে যেসব পশুকে সন্দেহ লাগে আমরা সেগুলোরই পরীক্ষা করি। এছাড়া কারও চাহিদার ভিত্তিতে আমরা পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে দেই। আমাদের যে জনবল রয়েছে, তা দিয়ে সব মিলিয়ে ৪-৫ শতাংশ পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করতে পারি।’
একই কথা জানান, ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. মো. আজমত আলীও। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে পরিমাণ সম্ভব, আমরা সে পরিমাণ করছি। আমাদের কোনও টিম বসে নেই। সবাই মাঠে। প্রতিটি টিম গাড়িতে করে ভ্রম্যমাণ কাজ করে যাচ্ছে।’
এদিকে, সিটি করপোরেশনের এসব টিমের কোনও সদস্যকে প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ তুলেছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। তারা বলছেন, সময়মতো ডাক্তাদের কাউকে পাওয়া যায় না। এছাড়া পাওয়া গেলেও তারা টাকা ছাড়া কাজ করেন না।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. এমদাদুল হক বলেন, কোরবানির হাটে মনিটরিং ও চিকিৎসার জন্য আমাদের কয়েকটি টিমে কাজ করছে। এই চিকিৎসকরা হাটগুলোয় সার্বক্ষণিক বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছেন। কিন্তু কেউ যদি টাকা নিয়ে চিকিৎসা দেন, অভিযোগ পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেব।’
আরও পড়ুন: কোরবানির হাটে পশু: বিনামূল্যের স্বাস্থ্যপরীক্ষা মিলছে টাকার বিনিময়ে








