রোহিঙ্গাদের মধ্যে কে নতুন আর কে পুরনো বোঝা বেশ কঠিন। এ সুযোগে নতুনদের জন্য দেওয়া ত্রাণে পুরনো রোহিঙ্গারাও ভাগ বসাচ্ছে। নতুনদের সঙ্গে মিশে পুরনোরাও রাস্তায় এসে ত্রাণ সংগ্রহ করছে সারাদিন। ফলে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করছেন নতুন করে আসা রোহিঙ্গা।
উখিয়ার বালুখালী থেকে কুতুপালং পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার সড়কের দুই ধারে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ত্রাণের জন্য বসে থাকেন। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ও তাদের সন্তানরা বিভিন্ন স্থানে বসে থাকেন। যাতে বেশি বেশি ত্রাণ সংগ্রহ করা যায়। কিছুক্ষণ কোনও সড়কে দাঁড়ালেই যে কারও চোখে এই দৃশ্য ধরা পড়বে। এই কথা জানিয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনও বারবার সমন্বয় করে ত্রাণ দেওয়ার কথা বলছে।
উখিয়ার বালুখালী, থ্যাংখালী, পালংখালী এবং টেকনাফের উনছিপ্রাং, নয়াবাড়ি এলাকার রাস্তার দু’ধারে এখন কেবল রোহিঙ্গাই চোখে পড়ে। সব নারী আর শিশু। নারীরা বোরকা পরে সারাদিন ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে রাস্তার পাশেই বসে থাকেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা গাড়ি সাধারণত তাদের ত্রাণ দিয়ে থাকে। গাড়ি থেকে দেওয়া ত্রাণ নিতে রীতিমত যুদ্ধে নেমে পড়েন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। কারণ মানুষের তুলনায় ত্রাণের সংখ্যা খুবই কম। গায়ে শক্তি যার বেশি তিনিই ‘ত্রাণ যুদ্ধে’ জিতে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, শাহ পরীর দ্বীপে রোহিঙ্গাদের নৌকা ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের হাতে খাদ্য সামগ্রী ও নগদ টাকা দিচ্ছেন অনেকেই। এই সাহায্যের হাত পাশে থাকছে উখিয়া পর্যন্ত। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশের মানুষ। তবে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের কাছে গিয়ে আর ক্যাম্পে প্রবেশ করেন না। রাস্তাতেই থাকেন। কারণ ত্রাণ। কোনোভাবেই তাদের রাস্তা থেকে সড়ানো যাচ্ছে না। এতে টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার সড়কপথে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এখন নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পুরনো রোহিঙ্গারাও ত্রাণ নিতে রাস্তায় বসে গিয়েছেন। কুতুপালংয়ের নিবন্ধিত ক্যাম্পের রোহিঙ্গারাও এখন ত্রাণের জন্য রাস্তায় চলে এসেছেন।
কুতুপালং ক্যাম্পে জন্ম হয়েছে ইকবাল নামে এক রোহিঙ্গা ছেলের। তার বয়স এখন ১৪। এই কিশোর কুতুপালং আমতলা বস্তির সামনে এসে ত্রাণ সংগ্রহ করছে। তাকে বেশ খবরদারি করতে দেখা যায়। তার সঙ্গে কথা হলে সে তার বিষয় নিজেই সব বলে দেয়। সে কেন ত্রাণ নিতে এসেছে- জানতে চাইলে ইকবাল বলে, ‘আমাদের সবার জন্যই এই ত্রাণ।’
বালুখালী ঢাল থেকে নেমে একটু সামনে গিয়েই দেখা যায় রাস্তার পাশেই পলিথিন দিয়ে সারি সারি টং ঘর তুলেছেন রোহিঙ্গারা। এই ঘরের ভেতরে তারা থাকেন শুধু ত্রাণের জন্য। যত বেশি রাস্তার পাশে থাকা যাবে ততবেশি ত্রাণ। এই ঘরের একজন হামিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা পাহাড়ে জায়গা পাইনি। তাই রাস্তার পাশেই ঘর করে থাকছি।’
বস্তি সংলগ্ন এলাকায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত দুই বেলা রোহিঙ্গাদের ভাষায় বস্তি সংলগ্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়। মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের সড়ক থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে রোহিঙ্গারা তা পাত্তাই দিচ্ছে না। তারা কোনও গাড়ি দেখলেই ছুটে আসেন। যারা ত্রাণ দেন তারাও রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ত্রাণ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। এভাবে ত্রাণ নিতে গিয়েও অনেক রোহিঙ্গা আহতও হচ্ছেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. মাহিদুর রহামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তাদের (রোহিঙ্গা) এক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। সমন্বয় করে ত্রাণ দেওয়ার কাজও চলছে। ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকই রাস্তায় রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিচ্ছেন। তারা যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে ত্রাণ দিচ্ছেন। তাদেরও নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ একারণে রোহিঙ্গারা রাস্তাতেই থাকছে।’
আরও পড়ুন-
রোহিঙ্গাদের এক স্থানে আনতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন








