রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর আরও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার উদ্যোগের অংশ হিসাবে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে একটি বিশেষ সেশন আহ্বান এবং জাতিসংঘের থার্ড কমিটিতে একটি রেজ্যুলেশন আনার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এ দু’টি উদ্দেশ্য সফল করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব দেশের সহায়তাও চাওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আজকে (বুধবার) আমরা উন্নত বিশ্বের দেশগুলি এবং ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) এর রাষ্ট্রদূতদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেছি এবং তাদের সমর্থন চেয়েছি।’ নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে মানবাধিকার কাউন্সিলে একদিনের সেশন আহ্বানের জন্য সবার সঙ্গে বাংলাদেশ আলোচনা করছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘মার্চ, জুন ও সেপ্টেম্বরে মানবাধিকার কাউন্সিলে নিয়মিত সেশন বসে। যেহেতু রোহিঙ্গা ইস্যুটির গুরুত্ব অনেক বেশি, সেজন্য আমরা মার্চের জন্য অপেক্ষা না করে আগামী মাসেই শুধুমাত্র এই বিষয়ের ওপর আলোচনার জন্য একটি বিশেষ সেশন আহ্বান করতে চাচ্ছি।’
প্রসঙ্গত যে, বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য। কাউন্সিলের ৪৫ সদস্য দেশের যে কেউই এই বিশেষ সেশনের জন্য আহ্বান করতে পারে, কিন্তু এর জন্য অন্তত ১৬টি দেশের সমর্থন প্রয়োজন।
এই সেশন থেকে বাংলাদেশ কী অর্জন করতে চায় সেটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, শুধুমাত্র একটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ সভা হওয়াটা সেই দেশটির জন্য নিন্দার সামিল। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ চায় সেখানে একটি রেজ্যুলেশন গৃহীত হোক।’ সভার ফলাফল কি হবে সেটি এখন না বলা গেলেও বাংলাদেশ সবার সঙ্গে রেজ্যুলেশন গ্রহণের বিষয়ে আগ্রাসী আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
ওই কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সভায় সদস্যরা তাদের বক্তব্য দেবে এবং সর্বশেষ একটি সিদ্ধান্ত নেবে। সেটি রেজ্যুলেশন হতে পারে, সেটি একটি যৌথ প্রেস বিবৃতি হতে পারে বা সেটি হতে পারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রিপোর্ট করা। এর কোনটি হবে বা অন্য কি হবে এটি এখন বলা যাবে না। কারণ প্রতিটি দেশ একেক ভাবে এই সমস্যাটিকে বিবেচনা করে।’
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের থার্ড কমিটিতে একটি রেজ্যুলেশন আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ইসলামিক দেশগুলির মাধ্যমে এই রেজ্যুলেশন আনার চেষ্টা করছি। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের আলোচনায় আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং এখনও এ বিষয়টি নিয়ে অন্যদের সঙ্গে কাজ করছি।’
থার্ড কমিটির রেজ্যুলেশন কবে হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘থার্ড কমিটির সভা অক্টোবর এবং নভেম্বর এই দুই মাস চলে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব এটি আনার চেষ্টা করছি।’
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা
আজ রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে কয়েকজন রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমরা স্বল্পমেয়াদি চিন্তা করছি এবং আমরা এর দ্রুত সমাধানের জন্য সবার সহযোগিতা চেয়েছি।’
এ বিষয়ে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা তাদের বলেছি এর মধ্যমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদের পরিকল্পনা চিন্তা করা মানে মিয়ানমারকে সুযোগ দেওয়া এবং জাতিসংঘ নিজেই ছয়মাসের সহযোগিতার জন্য গত ২৩ অক্টোবর অর্থ সংগ্রহ করেছে। আমরা তাদের একটিই বার্তা দেবার চেষ্টা করেছি যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো এবং তারা যেন এ ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা করে। কারণ এটি দীর্ঘায়িত হলে এ অঞ্চল অস্থিতিশীল হতে পারে এবং নিরাপত্তা সংকট দেখা দিতে পারে।’
রোহিঙ্গা ইস্যুর আন্তর্জাতিকীকরণ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘গত তিন দশক ধরে আমরা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য দ্বিপক্ষীয়ভাবে চেষ্টা করেছি কিন্তু সফল হয়নি। শুধু তাই নয় মিয়ানমার যে মানবাধিকার লংঘন করছে, সেটিও লুকানোর জন্য আমরা একসময় তাদের সহায়তা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বা মানবাধিকার কাউন্সিলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যখনই কোনও রেজ্যুলেশনের ভোটাভুটি হতো বাংলাদেশ সবসময় মিয়ানমারকে সমর্থন দিত। কিন্তু সম্প্রতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রয়াস নিয়েছে।’
উদাহারণ হিসাবে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের একটি প্রকৃত চিত্র পাওয়ার জন্য গত মার্চে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল একটি স্বাধীন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠন করে এবং তাদের সদস্যদের মিয়ানমারে সফর করার জন্য ভিসা দেওয়া হয়নি। সেই মিশন গঠনের সময়ে বাংলাদেশ একটি ভূমিকা রাখে এবং সেই সময়ে মিয়ানমারের দুইজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিল, আমরা বিস্মিত কারণ আমরা সবসময়ে বাংলাদেশকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসাবে মনে করেছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় দরজা বন্ধ রাখিনি, কিন্তু একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখার জন্য আমরা আগ্রাসী কূটনীতি চালাচ্ছি।’







