ইংরেজিতে কবিতা লিখলেও বাংলাদেশি কবি হিসেবে পরিচিত ও প্রশংসিত কায়সার হক। তার প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা ৯টি। কবিতা ছাড়াও ফিকশন ও নন-ফিকশনাল কিছু বইয়ের অনুবাদও করেছেন তিনি। ‘পাবলিশড ইন দ্য স্ট্রিটস অব ঢাকা’ নামে তার কবিতার বইয়ের একটি বর্ধিত সংকলন এবারের ঢাকা লিট ফেস্টে প্রদর্শিত হবে। সম্প্রতি ঢাকা ট্রিবিউনের মীর আরিফের সঙ্গে কথা হয় কায়সার হকের। এতে কাজ ও ক্যারিয়ারের পাশপাশি ঢাকা লিট ফেস্ট নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। যা বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
মীর আরিফ : পাঁচ দশক আগে থেকে আপনি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। একজন কবি হিসেবে আপনার গল্পটা শুনতে চাই।
কায়সার হক : অনেকটা দৈবক্রমে আমি কবিতা লেখা শুরু করি। এ নিয়ে আমার একটা নিবন্ধও আছে, যার নাম ‘অ্যান অ্যাপোলজি ফর বাংলাদেশি পোয়েট্রি ইন ইংলিশ’। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত কবিতায় আমার আগ্রহটা ছিল না। ওই বয়স পর্যন্ত আমি কবিতা পড়া উপভোগ করতাম, যদিও তা পরীক্ষার জন্য। কিন্তু দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ব্রাদার হোবার্ট নামে একজন চমৎকার শিক্ষককে পাই, যিনি কবিতার ঐশ্বর্যের ব্যাপারে আমার উপলব্ধির দরজাটা খুলে দেন। ডিএইচ লরেন্সের মতো মুক্ত ছন্দ ব্যবহার করে কবিতা লেখার সম্ভাবনাটাও আমার মধ্যে জাগিয়ে তোলেন তিনি। তার কারণে আমি আধুনিক কবিতার সংকলনগুলোর ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি এবং প্রচুর পড়তে থাকি। এরই এক পর্যায়ে আমি নিজে কবিতা লেখার চেষ্টা করি। ওই সময়েই আমি চিন্তা করি, গল্প লেখাটাকেও সিরিয়াসলি নেওয়া যায়। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও বুঝতে পারি, ফিকশন লেখক হওয়ার মানসিক প্রকৃতিটা আমার মাঝে নেই। তবে কবিতার প্রতি আমার ব্যাপক ভালোবাসা রয়েছে। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত এই কবিতার সঙ্গেই আছি।
মীর আরিফ : সমসাময়িক কবিদের চেয়ে আপনার কবিতা আলাদা কোথায়?
কায়সার হক : এ ব্যাপারে আমি কখনও ভাবিনি। এই প্রশ্নের উত্তর আমার পাঠকদের কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে। কারণ, তারা আমার কবিতার পাশাপাশি সমসাময়িক অন্য কবিদের কবিতাও পড়ে থাকেন। তারাই ভালো জানেন, অন্যান্যদের চেয়ে আমি আলাদা কোথায়। আপনি যদি কবিতার ধারার প্রশ্নে আমাকে শনাক্ত করতে বলেন, তবে আমার উত্তর হবে, ইংরেজি ভাষায় দক্ষিণ এশীয় কবিতার ধারাকে আমি ধারণ করি। যার শুরুটা হয়েছিল হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডি’রোজিও’র হাত ধরে এবং যা আমাদের সময় পর্যন্ত এসেছে। বিশের দশকে আমরা ডম মরায়েস, একে রামানুজান, অরুণ কলাৎকার, নাসিম ইজেকিয়েল-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কবিদের পেয়েছি। এদের মাঝেই আমি আমাকে খুঁজে পাই। একইসঙ্গে আমি বাংলাদেশি কবি, যদিও ইংরেজিতেই লিখি। আমার কবিতা বাংলাদেশি সাহিত্যেরই একটা অংশ। একইসঙ্গে আমার কবিতা পূর্ব-উপনিবেশিক কবিতার বৃহৎ ধারাকেও ধারণ করে আছে। কবিতার এই ধারা ক্যারিবিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কবিতাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
মীর আরিফ: আপনার কবিতা (Ode on the lungi) ‘ওয়েড অন দ্য লুঙ্গি’তে আপনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষ লুঙ্গি পরেন’/‘দেয়ার আর মোর পিপল ইন লুঙ্গি’স দ্যান দ্য পপুলেশন অফ দ্য ইউএসএ’। এই কবিতা পোশাক সম্পর্কিত হেজিমনি নিয়ে কথা বলে এবং এক্ষেত্রে সাম্যের দাবি জানায়। আমার প্রশ্ন হলো, এমন একটা দুর্দান্ত বিষয়ে কবিতা লেখার আইডিয়াটা আপনার মাঝে আসলো কিভাবে?
কায়সার হক : এটা ব্যাখ্যা করাটা সত্যিই কষ্টকর যে, কিভাবে এই কবিতার শব্দ, বাক্যাংশ, দৃশ্যকল্প আমার মাঝে এলো। প্রথমে আমার মাথায় লুঙ্গি নিয়ে কিছু একটা লেখার চিন্তা আসে। অন্যান্য পোশাক নিয়ে আরও অনেকেরই কবিতা আছে। এর মধ্যে (Ferlinghetti) ফারলিংহেতি’র কবিতা ‘আন্ডারওয়্যার’ আমাকে প্রভাবিত করে। এ নিয়ে পাবলো নেরুদারও কবিতা আছে, ওইসব কবিতাও আমাকে প্রভাবিত করে। যাই হোক, আমি ভেবে দেখলাম, লুঙ্গি আমরা সবাই পরি, কিন্তু জন সমাগমপূর্ণ জায়গায় পরি না। এটা এমন পোশাক, যা আমরা শোয়ার ঘরে পরি। এমনকি ড্রয়িংরুমে কোনও অতিথির সঙ্গে দেখা করতে গেলেও অনেকেই লুঙ্গি পাল্টে পাজামা বা ট্রাউজার পরে যায়। এই জায়গা থেকে আমি ওই কবিতাটা লেখা শুরু হয়। এতে অবচেতনভাবেই উঠে আসে হুইটম্যানের কথা, যাকে গণতন্ত্রের কবি বলা হয়। আপনি যদি লুঙ্গি পরা অবস্থায় থাকেন, তবে হোয়াইট হাউসে প্রবেশের অনুমতি পাবেন না। এই ভাবনা থেকে আমি ভাবি, হুইটম্যানকে তবে এবার বাংলাদেশে নিয়ে আসি, কারণ তার একটা কবিতা আছে ‘প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া...প্যাসেজ টু মোর দ্যান ইন্ডিয়া’। এখানে আমি ‘মোর দ্যান ইন্ডিয়া’ কথাটা নেই, যার মানে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা।
মীর আরিফ : আপনার কবিতার বর্ধিত সংস্করণ ‘পাবলিশড ইন দ্য স্ট্রিটস অব ঢাকা’ ঢাকা লিট ফেস্ট-এ প্রদর্শিত হবে বলে শুনলাম। এ নিয়ে কিছু বলুন।
কায়সার হক : এটা আপডেট করা সংস্করণ। এতে আমার লেখা প্রায় সব কবিতাই থাকবে। থাকবে নতুন কিছু কবিতাও। তবে এ সংস্করণে কেবল শুরুর দিককার কিছু কবিতা থাকবে না।
মীর আরিফ : ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৭’-এর অংশ হতে পেরে কেমন লাগছে?
কায়সার হক : ঢাকা লিট ফেস্ট ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ হিসেবে শুরু হয়। এর সঙ্গে আমি শুরু থেকেই জড়িত। প্রথম আসরেও আমি অংশ নিয়েছিলাম। এটি বাংলা একাডেমিতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকে প্রতিটি লিট ফেস্টে আমি অংশ নিয়েছি। এটা খুবই আকর্ষণীয় এবং সুন্দর ব্যাপার যে, এ উৎসব উপলক্ষে অনেক মানুষ সমবেত হয়। তারা লেখকদের কথা শোনে, কাজ নিয়ে কথা বলে। এমন একটা ফেস্টিভ্যাল লেখক-পাঠককে কাছাকাছি নিয়ে আসে। এটা পাঠকদের প্রচুর বইয়ের সন্ধান দেয়। যার প্রতি তাদের আগে থেকেই আগ্রহ রয়েছে। এখানে প্রচুর বই বিক্রেতারা স্টল দেন। সাহিত্যের নানান কাজ প্রদর্শিত হয়, যা অন্য কোথাও হয় না সাধারণত। এর সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, লেখক-পাঠককে মিথষ্ক্রিয়া করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।








