বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং সাম্প্রতিক সময়ের একটি ভালো উদ্যোগ। প্রতি বছর নিয়মিত এ র্যাংকিং হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা। বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং’ শীর্ষক বৈঠকিতে বক্তারা এসব কথা বলেছেন।
বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের উদ্যোগে পরিচালনা করা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ের ব্যাপারে বক্তারা বলেন, ‘প্রথমবার বলে হয়তো কিছু জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে। তবে এই র্যাংকিং প্রতিবছর করা সম্ভব হলে সেই দুর্বলতা কেটে যাবে এবং সব স্তরের মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তাই এই র্যাংকিং প্রতিবছরই নিয়মিত করা উচিত।’
মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর শুক্রাবাদে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিওতে আয়োজিত এ বৈঠকি এটিএন নিউজে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজেও লাইভ দেখানো হয়েছে।
বৈঠকিতে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট বেনজির আহমেদ; ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) উপাচার্য ড. আব্দুর রব; ওআরজি কোয়েস্ট রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম মঞ্জুরুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল।
প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন পরিচালিত র্যাংকিংকে ইতিবাচক বলে অভিহিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘এই র্যাংকিং অবশ্যই ইতিবাচক। এতে কিছু ভুলভ্রান্তিও আছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে যত গবেষণা হয়েছে, তার কোনোটিই শতভাগ বস্তুনিষ্ঠ হয়নি। এটাই সত্য।’
তিনি বলেন, ‘এই র্যাংকিংয়ের একটি বড় দুর্বলতা হলো, ২০১৪ সালের ডেটা ব্যবহার করে ২০১৭ সালে র্যাংকিং করা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রাইভেট কোম্পানির উদ্যোগে এমন র্যাংকিং করা হয়।’ তবে র্যাংকিং করা ইউজিসির কাজ নয় বলেও জানান তিনি।
বৈঠকির শুরুতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন নিয়ে দ্বিধা কাজ করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলোর র্যাংকিং এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে প্রথমবারের মতো র্যাংকিং প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে এসময় জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘মূলত র্যাংকিং করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মনোভাব বোঝানোর জন্য। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও নিজেদের মান উন্নয়নে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এ ধরনের র্যাংকিং থেকে।’
গবেষণার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি আরও জানান, এই গবেষণার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি ছিল। সূচকগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছে কমিটি। পরে সূচকগুলো নিয়ে দু’টি মেথডের মাধ্যমে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে ওআরজি কোয়েস্টের মাধ্যমে।
এদিকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির র্যাংকিং করার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) উপাচার্য ড. আব্দুর রব। তিনি বলেছেন, ‘পারসেপচুয়াল পদ্ধতিতে কিছু দুর্বলতা রয়েছে বলে আমি মনে করি। এছাড়া র্যান্ডম স্যাম্পলিং করা সম্ভব হলে গবেষণাটির ফলাফল আরও ভালো হতো। এ র্যাংকিং নিয়ে সমালোচনা একটু হবেই কিন্তু বাংলা ট্রিবিউন খুবই সময়োপযোগী কাজ করেছে।’ আগামীতে আরও ভালোভাবে র্যাংকিংয়ের কাজ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
তবে এ র্যাংকিংয়ে সম্ভাব্য সর্বশেষ তথ্য-উপাত্তই ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওআরজি কোয়েস্ট রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম মঞ্জুরুল হক। তিনি বলেন, ‘র্যাংকিংয়ে ফ্যাকচুয়াল তথ্য হিসেবে ২০১৪ সালের ডেটা বাধ্য হয়ে নিয়েছি। কারণ যখন গবেষণা শুরু করেছি, তখন আমাদের হাতে সর্বশেষ ওই ডেটাই ছিল। এটা আমরাও স্বীকার করছি। এটা একটা লিমিটেশন।’
বৈঠকিতে মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, গবেষণাটিতে দু’টি মেথড ব্যবহার করা হয়েছে- ফ্যাকচুয়াল ও পারসেপচুয়াল। পারসেপচুয়াল মেথড মূলত ধারণাভিত্তিক। এই ধারণাভিত্তিক তথ্য আমরা নিয়েছি প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকতা ও চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। অন্যদিকে ফ্যাকচুয়াল ডাটা সংগ্রহে আমরা ব্যবহার করেছি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০১৪ সালের তথ্য।’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছিল কিন্তু অনেকেই সাড়া দেয়নি, তাই বাধ্য হয়েই তিন বছরের পুরনো ডেটা ব্যবহার করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে দেশে এই প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং করার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান। গবেষণার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘গবেষণাটি করতে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করার সময় রেসপন্ডেন্টদের কতখানি কাছাকাছি গিয়ে তথ্য নেওয়া হয়েছে তাও দেখার বিষয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় যে শক্তি সেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তথ্য নিলে হয়ত র্যাংকিংটা আরও ভালো হতে পারতো। আবার সাবজেক্ট ভিত্তিক ডাটা নিয়ে গবেষণা করতে পারলে আরও ভালো হতো বলে আমি মনে করি।’
র্যাংকিংয়ের ব্যাপারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট বেনজির আহমেদ বলেন, ‘এক সময় মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে র্যাংকিং করা হতো, স্বল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতো, স্ট্যান্ড করত অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী। কিন্তু এখন আর সেই পদ্ধতি নেই।’
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি সব সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি’কে তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু এই র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে হয়তো সেভাবে তথ্য চাওয়া হয়নি। তবে এ ধরনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।’
বৈঠকির সব সংবাদ:
‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি শুরু
শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সহায়তা করতেই র্যাংকিং: জুলফিকার রাসেল
পৃথিবীর কোনও গবেষণাই শতভাগ বস্তুনিষ্ঠ নয়: ইউজিসি চেয়ারম্যান
র্যাংকিং নিয়ে সমালোচনা হবেই কিন্তু এটি সময়োপযোগী কাজ: আইইউবিএটি উপাচার্য
‘সীমাবদ্ধতা থাকলেও সর্বশেষ ডেটা নিয়ে র্যাংকিং করা হয়েছে’
‘সাম্প্রতিক তথ্য নিয়ে র্যাংকিং করা হলে খুবই ভালো হতো’
‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে একপেশে করে দেখার কোনও সুযোগ নেই’








