পারস্পরিক সহানুভূতিশীলতাই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বন্ধনকে সুদৃঢ় করবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের সীমান্তরক্ষী এই বাহিনীর বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিজিবির সদস্য হিসেবে আপনাদের পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ, শৃঙ্খলাবোধ, মানবিকতা এবং সর্বোপরি পারস্পরিক সহানুভূতিশীলতাই এই বাহিনীর বন্ধন দৃঢ় করবে। কাজেই ভবিষ্যতে সবাই বাহিনীর নিজস্ব শৃঙ্খলার বিষয়টি ভালোভাবে জেনে নেবেন, চর্চা করবেন এবং দেশের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করবেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিজিবির সদস্য হিসেবে আপনাদের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা প্রশ্নাতীত। সীমান্ত রক্ষা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রাকৃতিক কিংবা সামাজিক যেকোনও দুর্যোগে বিজিবি জাতির আস্থার ঠিকানা। বিজিবি’র উন্নয়নে সরকারের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই বাহিনীর ঐতিহ্য ২২২ বছরের। ১৭৯৫ সালে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন নামে প্রথম গড়ে তোলা হয় এই বাহিনী। সময়ের ব্যবধান ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে এই বাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এখন তারা বিজিবি নামে সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসাবে কাজ করছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম প্রহরেই এই বাহিনীর সদস্যরা পাকসেনাদের প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পিলখানা থেকে তৎকালীন ইপিআরের বেতারকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেন।’
স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজিবির ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা ২৩ বছরের সংগ্রামে বাঙালি জাতিকে মুক্তির চেতনায় প্রস্তুত করে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণা তৎকালীন ইপিআর প্রচার করায় পাকবাহিনীর হাতে প্রাণ দেন ইপিআরের সুবেদার মেজর শওকত আলী। ইপিআরের প্রায় সাড়ে ১২ হাজার বাঙালি সৈনিক সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং ৮১৭ জন শাহাদাত বরণ করেন। এই বাহিনীর দু’জন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নুর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ আমাদের গর্বের প্রতীক।’
তিনি বলেন, ‘ইপিআরের আট জন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম ও ৭৭ জন বীরপ্রতীক মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করে বিজিবি’র ইতিহাস সমৃদ্ধ করেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৮ জানুয়ারি পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) প্রথম ব্যাচের শিক্ষা সমাপনী কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করেন। তিনি এ বাহিনীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে অনেক কার্যক্রম হাতে নেন।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আমরা সরকার গঠনের এক মাস ১৯ দিনের মাথায়, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। দ্রুত এর সমাধান করে আমরা নতুন আইন করি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পুনর্গঠন করি। তৎকালীন বিডিআরের ট্র্যাজিক ঘটনায় শহীদ ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।’ এসময় গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় বিজিবি সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসরদের পরিকল্পিত টানা অবরোধে গাড়ি ভাঙচুর এবং চলন্ত গাড়িতে পেট্রোল বোমায় জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যাসহ দেশ অচল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল। আপনারা অক্লান্ত পরিশ্রমে তা বানচালে সক্ষম হন। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সমস্যা, মায়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা, রামুর বৌদ্ধ পল্লীর নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন, পার্বত্য এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, ছিটমহলবাসীকে পুনর্বাসনে আপনাদের পদক্ষেপ বিজিবি’র সুনাম ও মর্যাদাকে বৃদ্ধি করছে।’
এর আগে, বিজিবি সদর দফতরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন ও বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। পরে, তাকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী বিজিবি সদর দফতরের বীরউত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজিবি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং সালাম গ্রহণ করেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন প্যারেড কমান্ডার ও বিজিবির উপ-মহাপরিচালক মো. জুলফিকার আলী।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, বিদেশি কূটনীতিক ও পদস্থ সামরিক-বেসমারিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বীরত্বপূর্ণ ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ৫১ জন বিজিবি সদস্যের মাঝে পদক বিতরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী পরে বিজিবি সদস্যদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ ডিসপ্লে ‘উৎস থেকে মোহনা’ উপভোগ করেন। প্রধানমন্ত্রী বিজিবির উন্নয়নে তার সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে ভাষণে বলেন, ‘ভারত ও মিয়ানমারের মতো সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অংশেও মোট তিন হাজার ১৬৭ কিলোমিটার রিং রোড নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে বিজিবির নতুন রিজিয়ন গঠনসহ অতিরিক্ত ২৫ প্লাটুন জনবল বাড়ানো হয়েছে। দ্রুত টহলের লক্ষ্যে প্রতিটি বিওপিতে চারটি মোটরসাইকেলের প্রাধিকার নির্ধারিত হয়। এর জন্য এক হাজার ৪শ মোটরসাইকেল সরবরাহ করাও হয়েছে। অধিক দূরত্বের বিওপি’র মধ্যবর্তী স্থানে ১২৮টি বর্ডার সেন্ট্রি পোস্ট (বিএসপি) নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় নারী সংক্রান্ত বিষয়ে দেখাশোনা ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বিজিবিতে নারী সৈনিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।’
সূত্র: বাসস
আরও পড়ুন:
‘বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক মজবুত ও শক্তিশালী’








