যানজট নিরসনে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অস্থায়ীভাবে কিছু জায়গা চিহ্নিত করে তাতে পার্কিং ব্যবস্থা চালু করার জন্য দুই সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ই-টোকেন সিস্টেমের মাধ্যমে এসব স্থানে পার্কিং ব্যবস্থা চালু করে রাজস্ব আয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডিএমপি’র ওই চিঠির পর ৫৫০টি স্থানে পার্কিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। আর উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনএনসি) কোনও সিদ্ধান্ত না নিলেও বিষয়টি নিয়ে ভাবছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার শপিং মল, স্কুল-কলেজ কিংবা হাসপাতালে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে রাস্তায় গাড়ি রাখতে হয় মানুষকে। এ কারণে তাদের জরিমানা যেমন গুনতে হয়, পাশাপাশি যানজট সমস্যায় ভোগান্তিও বাড়ে। তবে গাড়ি রাখার জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া সড়কগুলো ব্যবহার করা হলে যানজট কমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ২৪ জানুয়ারি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২তম বোর্ড সভায় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া যানজটের একাধিক কারণ উল্লেখ করে বলেন, “রাজধানীতে ‘উবার’সহ অনেক কারণে গাড়ির ফ্লো মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। এ জন্য আমরা পার্কিংয়ের জন্য কিছু জায়গা চিহ্নিত করেছি। এগুলোর জন্য অনলাইন টোকেনের মাধ্যমে পার্কিং ব্যবস্থা চালু করা যায়। বিশ্বের উন্নত দেশেও এমন সিস্টেম চালু রয়েছে। এতে রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি যানজট নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়ক হবে।”
সম্প্রতি ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে পার্কিংয়ের জন্য অস্থায়ীভাবে রাস্তার পাশে খোলা জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছে। কোন পার্কিংয়ে কতটি গাড়ি পার্ক করা যাবে, তাও নির্ধারণ করে দিয়েছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ।
ডিএমপি থেকে ওই চিঠি পাওয়ার পর ইজারার মাধ্যমে ওই স্থানগুলোতে পার্কিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অপরদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন কোনও সিদ্ধান্ত না নিলেও বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে।
জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কমরুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিএমপি থেকে চিঠি আসার পর আমরা বিষয়টি নিয়ে নিজস্ব জনবল দিয়ে সার্ভে করছি। ডিএমপি’র পরামর্শের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা একটা চূড়ান্ত তালিকা করবো। এরই মধ্যে ৭টি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে পার্কিং চালু করেছি। বাকি স্থানগুলোতে সার্ভে করে ফি নির্ধারণ করা হবে।’
এরই মধ্যে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে চারটি ব্লক পার্কিংয়ের জন্য ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে ডিএসসিসি।
সম্প্রতি সেবা সংস্থাগুলো নিয়ে সিটি করপোরেশনের এক সমন্বয় সভায় যানজট সংক্রান্ত আলোচনা হয়েছে। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকায় ৩৮টি বাস-বে/বাস স্টপেজ চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই সভায় ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলাল বলেন, ‘ডিএমপির সঙ্গে আলোচনা করে বাস-বে ও পুলিশ বক্স নির্মাণের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ডিএসসিসির মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে এগুলোর নির্মাণ কাজ চলমান। এরই মধ্যে ৫৫০টি পার্কিং স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি লিজ দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো ইজারা দেওয়ার কাজ চলমান আছে।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ওসমান গণি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে ডিএমপি থেকে পরামর্শমূলক একটি চিঠি এসেছে। কিন্তু এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা শিগগিরই মিটিং করে একটা সিদ্ধান্ত নেবো।’
ডিএমপি যেসব স্থানে পার্কিং করার পরামর্শ দিয়েছে সেগুলো হচ্ছে মতিঝিলের বিনিয়োগ বোর্ড থেকে পিপলস ইন্স্যুরেন্স পর্যন্ত রাস্তার একপাশে ১২০টি গাড়ি, জনতা ব্যাংক থেকে বক চত্বর রাস্তার উভয় পাশে ৩০টি, বাবে রহমত ক্রসিং থেকে এজিবি কলোনি পর্যন্ত ৬০টি, কমিশনার গলি থেকে মন্দির পর্যন্ত রাস্তার একপাশে ২৫টি, বন ও শিল্প ভবন থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে ৪০টি, ২৪ তলা ভবন থেকে অ্যালিকো ভবন পর্যন্ত রাস্তার একপাশে ৫০টি, আল-হেলাল পুলিশ বক্স থেকে বাবে রহমত পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে ২৫টি এবং আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের রাস্তার উভয় পাশে ৪০টি গাড়ি রাখা যাবে।
বায়তুল মোকাররমে স্বর্ণ মার্কেট লিংক রোডের একপাশে ৩০টি। নয়াপল্টনে পলওয়েল মার্কেটের একপাশে ১৮টি। কমলাপুর পীরজঙ্গি মাজার থেকে কমলাপুর পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে ৪০টি। দয়াগঞ্জ মোড় থেকে জুরাইন রেলগেটের (মীর হাজিরবাগ নতুন বাজার) একপাশে ১০০টি। মাতুয়াইল মাতৃসদন হাসপাতাল থেকে হাশিম রোড পর্যন্ত সার্ভিস রোডের একপাশে ১০০টি।
ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগ
হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে নেভি কল্যাণ ফাউন্ডেশন পর্যন্ত রাস্তার একপাশে ৯০টি। বেইলি রোডের উত্তর পাশে ১০০টি। এলিফ্যান্ট রোডে বাটা সিগন্যাল থেকে গাউছিয়া মার্কেট পর্যন্ত রাস্তার একপাশে ৭৫টি। পলাশী থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত রাস্তার একপাশে ১১৭টি, নিউমার্কেট ১নং গেটের সামনে রাস্তার উভয় পাশে ২৫০টি। নিউমার্কেট ২নং গেট থেকে ৪নং গেট পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে ১৫০টি। ধানমন্ডি ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮ নং রোড ও মিরপুর রোডের সঙ্গে গ্রিনরোডের সংযোগকারী রাস্তার উভয় পাশে ৭৫টি, সাত মসজিদ রোডের পশ্চিম পাশে (জিগাতলা থেকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল হাসপাতাল পর্যন্ত) ১০০টি গাড়ি রাখা যাবে।
ট্রাফিক উত্তর বিভাগ
উত্তরা: জসীমউদদীন সংলগ্ন ১নং সেক্টরের সার্ভিস লেনে হোটেল ম্যাপল লিপ থেকে সাউথ-ইস্ট ব্যাংক পর্যন্ত রাস্তার পূর্ব পাশে ৯০টি, ৩নং সেক্টরের সার্ভিস লেনে জিবিটি টাওয়ার (ব্র্যাক ব্যাংক) থেকে সিয়াম টাওয়ার পর্যন্ত রাস্তার পূর্ব পাশে ৩০টি, এবিসি টাওয়ার থেকে উত্তরা টাওয়ার (লাজ ফার্মা) পর্যন্ত রাস্তার উত্তর পাশে ২৫টি, এবিসি টাওয়ার থেকে এস্টনিস্ট শপিং সেন্টার পর্যন্ত রাস্তার পূর্ব পাশে ৩০টি। সিঙ্গাপুর প্লাজা থেকে রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে ৫০টি, লতিফ ইম্পেরিয়াল খাজানা হোটেল থেকে কুশল সেন্টার পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে ১০টি, কুশল সেন্টার থেকে বেলী কমপ্লেক্স পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে ২০টি, বেলী কমপ্লেক্স থেকে লন্ডন প্লাজা পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে ২৫টি, লন্ডন প্লাজা থেকে এস বি প্লাজা পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে ১৫টি, এস বি প্লাজা থেকে এ বি মার্কেট পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে ৩০টি, এ বি মার্কেট থেকে আমির কমপ্লেক্স পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম ও রবীন্দ্র সরণির উত্তর পাশে ২০টি, আমির কমপ্লেক্সের পশ্চিমে এইচ এম প্লাজা পর্যন্ত রাস্তার পূর্ব পাশে ৯০টি এবং ১২নং চৌরাস্তা থেকে দিয়াবাড়ি খালপাড় সড়কের দক্ষিণ পাশে ৪০টি গাড়ির পার্কিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
বনানী: ১৭নং রোডের হাউজ নং-৫ থেকে শুরু করে হাউজ নং-৩৫/এ পর্যন্ত রাস্তার উত্তর পাশে ৭৫টি, ১৭নং রোডের হাউজ নং-৮ এবিসি টাওয়ার থেকে শুরু করে হাউজ নং-৪২ ইকবাল সেন্টার পর্যন্ত রাস্তার উত্তর পাশে ৭৫টি, রোড নং-১৯/এ’র হাউজ নং-৬২ থেকে শুরু করে হাউজ নং-৯৩ পর্যন্ত সড়কের পশ্চিম পাশে ৪০টি গাড়ি পার্কিংয়ের সুযোগ রয়েছে।
গুলশান: রোড নং-১০৩-এ’র হাউজ নং-সিইএন (বি)-৫ থেকে শুরু করে হাউজ নং-১ পর্যন্ত সড়কের দক্ষিণ পাশে ৭০টি, রোড নং-১০৯-এ’র হাউজ নং-সিইএন-৪ থেকে হাউজ নং-৭ পর্যন্ত রাস্তার উত্তর পাশে ৫০টি গাড়ি রাখা যাবে।
মহাখালী: স্কয়ার ভবনের পশ্চিম পাশে স্কয়ার ভবন থেকে শুরু করে খাবার ঘর হোটেল ৭৭/১ পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিম পাশে ২৫টি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে হাউজ নং-৬৭/৮ থেকে শুরু করে মহাখালী কমিউনিটি সেন্টার ব্যায়ামাগার পর্যন্ত সড়কের পশ্চিম পাশে ২০টি, তিতুমীর কলেজের সামনে (ব্যাংক এশিয়া) থেকে শুরু করে হাউজ নং-৮২ পর্যন্ত সড়কের পশ্চিম পাশে ১৫টি, ফ্লাইওভারের নিচ থেকে সৈনিক ক্লাবগামী ফিডার রোড পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে ২৫টি গাড়ির পার্কিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল: বিএসটিআই’র পূর্ব-পশ্চিম পাশে ৫টি, বিটাকের পূর্ব-পশ্চিম পাশে ৫টি, সোনালী ব্যাংকের পূর্ব-পশ্চিম পাশে ৫টি গাড়ি পার্কিং করা যাবে।
ট্রাফিক পশ্চিম বিভাগ
মিরপুর: ১৪ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে পুলিশ স্মৃতি স্কুল ও কলেজ পর্যন্ত মূল সড়কের দক্ষিণ পাশে ২০টি, শাহ আলী মাজার থেকে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ক্রসিং পর্যন্ত রাস্তার উত্তর পাশে ২০টি, স্টেডিয়ামের পাশে মিল্কভিটা রোডের উত্তর পাশে (লাভ রোড) ১৫টি, চিড়িয়াখানা রোড (সনি সিনেমা হল থেকে চিড়িয়াখানা) ফুটপাত সংলগ্ন মূল সড়কের উভয় পাশে ২০টি, ১৪ নম্বর থেকে টেকনিক্যাল (প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম রোডের বশির উদ্দিন স্কুলের গলি থেকে র্যাব-৪ কার্যালয়ের গলি পর্যন্ত) মূল সড়কের পূর্ব পাশে ২০টি গাড়ির পার্কিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
এছাড়া ফার্মগেটের খেজুরবাগান গোলচত্বরের পূর্ব পাশে ৪০টি এবং কচুক্ষেত রোডের ইব্রাহীমপুর বাজার রোড ও কচুক্ষেত রোডের সংযোগস্থল থেকে উত্তর ও দক্ষিণ প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে ২৫টি গাড়ি পার্কিং করা যাবে।
আরও পড়ুন-
যানজট নিরসনে রাজধানীতে তৈরি হচ্ছে ৪৩ পকেট পার্কিং
‘অনস্ট্রিট পার্কিং’ শুরুতেই অনিয়ম








