দীর্ঘ ৫৩ বছর পর ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তে চিলাহাটি ও ভারতের সীমান্তে হলদিবাড়ীর মধ্যকার পুরানো রেল সংযোগ স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে নির্মিত হচ্ছে নতুন রেললাইন। নতুন এই রেললাইন নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের মোংলা বন্দর হয়ে ভারতে উত্তর-পূর্ব অংশ, নেপাল এবং ভুটানের মধ্যে যাত্রী চলাচলসহ আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে। এর ফলে যোগাযোগ অবকাঠামো মানোন্নয়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম জোরদার এবং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নতুন ট্রেনের মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ হবে। এতে চার দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ও বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়বে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার ভোগডাবুড়ী ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়ার ভারতীয় সীমান্তের ৭৮২ মেইন পিলার এলাকায় চিলাহাটি-ভারত সীমান্তে রেলপথ পরিদর্শন করে গেছেন ভারতীয় হাইকমিশনের সেই সময়কার সচিব দিব্বাঞ্জন রায় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর কালিকান্ত ঘোষ।
এ সময় ভারতের হলদিবাড়ী সীমান্তে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসেন ভারতীয় রেল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার দেব এবং সেকশন ইঞ্জিনিয়ার আর কে সিং। উভয় দেশের প্রতিনিধিরা চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথটি পুনরায় সংস্কারের মাধ্যমে চালুর বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
ভারতীয় রেল বিভাগের দুই কর্মকর্তা ভারতীয় হাইকমিশনের সচিব দিব্বাঞ্জন রায়কে জানান, তারা ২০১৭ সালের জুন মাসের মধ্যেই এ রেলপথটি পুনরায় চালু করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। অপরদিকে ভারতীয় সীমান্ত থেকে চিলাহাটি রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার রেলপথ দ্রুত সংস্কার করে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় রেল যোগাযোগ চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে।
জানা গেছে, ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে চিলাহাটি ও হলদিবাড়ি হয়ে রেলওয়ে সংযোগ চালু ছিল। ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর এ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যদিও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগের ইতিহাস অনেক দিনের পুরনো। ১৮৬২ সালে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা হতে জগতি পর্যন্ত ৫৩ দশমিক ১১ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে রেলওয়ের যাত্রা শুরু হয়।
সূত্র জানায়, ১৮৭৪ হতে ১৮৭৯ সালের মধ্যে সাড়া (পাকশীর কাছে) হতে চিলাহাটি পর্যন্ত মিটার গেজ এবং দামুকদিয়া (সাড়ার উল্টো দিকে) হতে পোড়াদহ পর্যন্ত ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয়। ১৯০৯ সালে পোড়াদহ হতে ভেড়ামাড়া পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইনকে দ্বৈত লাইনে রূপান্তর করা হয়। ১৯১৫ সালের ১লা জানুয়ারি হার্ডিঞ্জ ব্রিজ চালুর মধ্য দিয়ে দর্শনা হতে চিলাহাটি পর্যন্ত সরাসরি রেলওয়ে সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৪ সালে সান্তাহার হতে পার্বতীপুর পর্যন্ত এবং ১৯২৬ সালে পার্বতীপুর হতে চিলাহাটি পর্যন্ত মিটারগেজ রেলওয়ে লাইন ব্রডগেজে রূপান্তর করা হয়।
এ সময় শিয়ালদহ ও শিলিগুড়ির মধ্যে সান্তাহার-পার্বতীপুর হয়ে দার্জিলিং এক্সপ্রেস ও নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেস নামে দ্রুতগতির ট্রেন চালু হয়। রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই রুটটি তখন ব্যাকবোন হিসেবে বিবেচিত হতো। এতদিন রেলপথের এই লিংকটি চালু না থাকায় দুই দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী রেলওয়ে সেবা হতে বঞ্চিত হয়েছে এবং দুদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, “ভারতের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে চিলাহাটি এবং চিলাহাটি বর্ডারের মধ্যে রেলপথ নির্মাণ” নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো অর্থ জোগান দেওয়া হবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটি ২০২১ সালের ৩০ জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে।
সূত্র জানায়, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতের হলদিবাড়ী অংশে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার রেলপথ ভারতের অর্থায়নে নির্মাণ করা হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদারকরণের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৭টি ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টের মধ্যে ৩টিতে রেলওয়ে সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৫ মে থেকে ২৭ মে পর্যন্ত ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারত- বাংলাদেশ আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠকে চিলাহাটি এবং হলদিবাড়ীর মধ্যে রেললাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে লক্ষ্যেই প্রকল্প প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটি গত ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৭ কিলোমিটার ট্র্যাক ও ২২ মিটার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এটি দীর্ঘদিনের পুরনো রেলপথ। কিন্তু নানা জটিলতায় এই রেলপথটি বন্ধ ছিল। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়ন ও দুদেশের মধ্যকার ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণে এ প্রকল্পটি খুবই উপকারে আসবে। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
রেলপথমন্ত্রী জানান, এই রেলপথের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ ভারত, নেপাল ও ভুটানের জনগণ উপকৃত হবেন। এতে চার দেশের সঙ্গে বাণিজ্যসহ বন্ধুত্বের সম্পর্ক বাড়বে।








