(বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারি কর্মকাণ্ড ও তার শাসনামল নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বাংলা ট্রিবিউন। আজ পড়ুন ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনা।)
১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন যে, আগামী বছরের (১৯৭৩) প্রথম দিকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, সেটি তিনি চান। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহল জানায়, বঙ্গবন্ধু আইনমন্ত্রীর প্রতি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপূরক একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দেন, যাতে করে আগামী বছরের প্রথমদিকে দেশের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
জেনেভা থেকে অপর এক খবরে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শাসনতান্ত্রিক বিষয়ে আলোচনার জন্য আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে ইতালি থেকে জেনেভা ডেকে পাঠান। ডাক পেয়ে আইনমন্ত্রী তার সঙ্গী বাংলাদেশের দুজন সিনিয়র আইনজীবী এস আর পাল ও সিরাজুল হককে সঙ্গে নিয়ে জেনেভায় পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই আইনমন্ত্রী হোটেলে চলে যান ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। আইনমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শাসনতন্ত্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আইনমন্ত্রী সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। এনা পরিবেশিত খবরে বলা হয়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান এদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন।
অক্টোবর থেকে ন্যায্যমূল্যের দোকান
স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও সমবায় দফতরের মন্ত্রী শামসুল হক জানান যে, পহেলা অক্টোবর থেকে প্রতি ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু হবে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘মে মাসে ন্যায্যমূল্যের দোকান স্থাপন সম্পর্কে মন্ত্রী পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর মাত্র তিন মাসের মধ্যে করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করে এর অধীনে দোকান চালু করা হয়।’ সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে এই দোকানগুলো সমবায় ভিত্তিতে পরিচালনা করা হবে। তবে তা সম্পূর্ণভাবে সরকারের পরিচালনায় থাকবে। মন্ত্রী জানান যে, তিনি প্রতি ইউনিয়নে একটি করে চার হাজার ৭২৩টি ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রত্যেক থানায় একটি করে পাইকারি দোকান থাকবে।
চোরাচালান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সরকার বদ্ধপরিকর
একদিকে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়ে চলেছে, আরেকদিকে চোরাচালান মজুতদারদের দৌরাত্ম্য। এ পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণির কিছু লোক চোরাচালানে লিপ্ত রয়েছে। সরকার সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘দেশে চোরাচালান সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে সরকার দৃঢ় সংকল্প।’ তিনি বলেন, ‘যারা চোরাচালান, মজুতদারি ও কালোবাজারির তৎপরতায় লিপ্ত তাদের কঠোর শাস্তি প্রদানে এবং দেশ থেকে এসব সমাজবিরোধী তৎপরতা নির্মূল করতে সরকার বদ্ধপরিকর।’ ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। চোরাচালান সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার জন্য সংকল্পের কথা ঘোষণা করে মান্নান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বন্ধ করার জন্য ভারতীয় প্রস্তাবেরও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘যদি দেখা যায় চোরাচালান বন্ধের জন্য এবং উভয় দেশের কল্যাণে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বন্ধের প্রয়োজন, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বন্ধ করার কথা বিবেচনা করা হবে।’
আটক বাঙালিদের উদ্ধারে ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদম মালিক এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেন যে, পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা করার জন্য তিনি জাতিসংঘে তার প্রভাব প্রয়োগ করবেন এবং পাকিস্তানসহ সব দেশের প্রতি আবেদন জানাবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মালিক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। ৬ সেপ্টেম্বর অপরাহ্নে মেঘনা মেহমানখানায় পাকিস্তানি আটক বাঙালিদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আলাপকালে ইন্দোনেশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিমত প্রকাশ করেন যে, রাজনৈতিক সমস্যা যা-ই থাকুক না কেন তা বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে মীমাংসার ব্যাপার। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে আটক বাঙালিদের অবিলম্বে ফেরত পাঠানো উচিত। আটক ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজনের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি জ্ঞাপন করেন মালিক প্রকাশ করেন যে, ইতোপূর্বে তিনি আটক বাঙালিদের মুক্তিদানের জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় পাকিস্তান তার অনুরোধ রক্ষা করেননি। মালিক বলেন, ‘আটক বাঙালিদের মুক্তিদানের জন্য তিনি পুনরায় আবেদন জানাবেন।’








